সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৫৪ অপরাহ্ন

এক বছরের মধ্যে অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরবে

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২০
  • ৬০ জন নিউজটি পড়েছেন

এক দশক ধরে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম। তিনি দেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। করোনা অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলেছে, কী শিক্ষা নিলাম, অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াল—এসব নিয়ে সঙ্গে কথা বলেন িতনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহাঙ্গীর শাহ
করোনায় অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব পড়েছে?

শামসুল আলম: গত মার্চ মাসে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এপ্রিল-মে মাসে একধরনের মানবিক লকডাউন দেওয়া হয়। মানুষের চলাচল সীমিত করা হলেও পণ্য চলাচল বন্ধ করা হয়নি। তবে ওই সময়ে দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। এই খাতের ৬৭ শতাংশ শ্রমজীবী কর্মচ্যুত হন। বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান হয় এই খাতে। এই শ্রমজীবী মানুষেরা কর্মহীন হয়ে পড়েন। মূলত গত এপ্রিল-মে মাসে অর্থনীতি থমকে দাঁড়ায়, স্থবির হয়ে যায়। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ব্যবসা-বাণিজ্যে যখন আঘাত আসে, তখন দারিদ্র্য পরিস্থিতির চাপ বাড়ে। গরিব মানুষের সংখ্যাও হু হু করে বেড়ে যায়।

পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হলো?

শামসুল আলম: এপ্রিল-মে মাসে থমকে যাওয়া অর্থনীতি দ্রুত সামাল দেওয়া গেছে। অর্থনীতি চাঙা রাখতে সরকার নানা ধরনের প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়েছে। শিল্প খাতে চাঙা করতে ৩৩ হাজার কোটি টাকার ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২৫ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা বিতরণ হয়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। করোনার কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া পোশাক খাতের ৭০ শতাংশ কার্যাদেশ ফিরে এসেছে।
তবে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য যে প্রণোদনা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যাংকের সম্পৃক্ততা ছিল না। এখন নতুন করে তাঁদের ব্যাংকের গ্রাহক হতে হচ্ছে। এ ছাড়া কৃষকদের কৃষি যন্ত্রপাতি কিনতে ২০০ কোটি টাকা ও বীজের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বড় শিল্পের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে গেছে। কিন্তু অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণসহায়তা পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি করতে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে চাহিদাও সৃষ্টি হয়েছে। দেশের ১০০টি উপজেলায় বয়স্ক ও বিধবাদের ভাতা দেওয়া হয়েছে। সরকারের এসব উদ্যোগ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াল?

শামসুল আলম: সাধারণ ছুটির আওতায় প্রায় সবকিছু বন্ধ বা এলাকাভিত্তিক লকডাউন করা হলেও পণ্য চলাচল বন্ধ হয়নি। কৃষি, তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের চলাচল অব্যাহত ছিল। সরকার প্রথাগত লকডাউনে না গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে মানবিক লকডাউনে গেছে। মে মাসের শেষের দিকে অর্থনীতি খুলতে শুরু করে। ফলে মে মাস পর্যন্ত রপ্তানি কমেছে। তবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ২ বিলিয়ন ডলার বেশি। তৈরি পোশাক, কৃষি, পাট, ওষুধসহ প্রায় সব পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে।
প্রবাসী আয়ও বেড়েছে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ৬৭১ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে ৪৫০ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল। প্রবাসী আয় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করেছে। এ ছাড়া করোনা সংকট মোকাবিলায় দাতা সংস্থার কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তাও মিলেছে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ১১৭ কোটি ডলার মিলেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে পাওয়া গেছে ৬০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে ৭৫০ কোটি ডলার বিদেশি সহায়তা পাওয়ার আশা করা হচ্ছে, যা গতবারের চেয়ে ৫০ কোটি ডলার বেশি। রপ্তানি, প্রবাসী আয়, দাতাদের সহায়তা ও সরকারের বিভিন্নমুখী প্রণোদনা অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। করোনার মধ্যেও কৃষি খাত বেশ ভালো করেছে। এবার আগেরবারের চেয়ে ১০ লাখ টন বেশি চাল উৎপাদিত হয়েছে, যা অর্থনীতিকে স্বস্তি দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এসবই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর অন্তর্নিহিত শক্তি।

করোনায় তো বেকারত্ব বেড়েছে। কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জটা কীভাবে দেখছেন?

শামসুল আলম: করোনা সংকটে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। করোনার শুরু থেকেই নতুন কর্মসংস্থান থমকে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো পুরোদমে চালু হয়নি। ৭৫ শতাংশের মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। পর্যটন ব্যবসা, রেস্তোরাঁ এখনো পুরোপুরি খোলেনি। যেসব দোকানপাট খুলেছে, তাতেও আগের মতো বেচাকেনা নেই। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বেচাকেনা আগের জায়গায় নিয়ে যেতে নতুন পুঁজির প্রয়োজন। ব্যবসা-বাণিজ্য আগের অবস্থায় গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরনও পাল্টে গেছে। এখন ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক বেশি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছে। কারণ, ডিজিটাল মাধ্যম বা যন্ত্রের মাধ্যমে কাজ করালে সময় কম লাগে। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের ফলে নতুন কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে নতুন ধরনের চাকরির সুযোগও বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর চাকরির বাজারের চাহিদা বাড়ছে। নতুন সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই চাকরির সৃষ্টি হচ্ছে। তাই কোভিডের কারণে সাময়িক কর্মচ্যুতি মেনে নিতেই হবে। নতুন সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ বাড়ছে। অনলাইনে এখন শাড়ি, কাপড়, বই—সবই বিক্রি হচ্ছে। অর্থনীতি যখন পুরোদমে চালু হবে, তখন ইস্পাত, সিমেন্টসহ বড় শিল্পে বিনিয়োগ আসবে। তখন শ্রমঘন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।

করোনাকালে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল্যায়ন কীভাবে করবেন?

শামসুল আলম: করোনাকাল আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করা। সব পরিবারের যদি একটি তথ্যভান্ডার থাকত, তাহলে আমরা এমন সংকটে কোন কোন পরিবারের আর্থিক সহায়তা লাগবে, তা জানতে পারতাম। জাতীয় তথ্যভান্ডার (ন্যাশনাল ডেটাবেইস) তৈরির কাজ ২০১৮ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো শেষ হয়নি। এই উপাত্তভিত্তি বা ডেটাবেইসটি থাকলে দরিদ্রদের খুঁজে বের করা সহজ হতো। জাতীয় প্রয়োজনে এখন ডেটাবেইসের কাজ শেষ করা উচিত। এ ছাড়া ২০১৫ সালে জাতীয় সামাজিক সুরক্ষাকৌশলের মতো জীবন চক্রভিত্তিক কর্মসূচিগুলো সাজানো হলে এই বিপদের সময় সবাইকে সুবিধা দেওয়া যেত। যেকোনো দৈবদুর্বিপাকে দারিদ্র্যের হার কিছুটা বেড়ে যায়। অনেকের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, অনেকে সম্পদ হারায়। করোনায় বহু মানুষ এমন বিপাকে পড়েছে।

করোনায় তো স্বাস্থ্য খাতের বেহাল চিত্রটিও উঠে এসেছে।

শামসুল আলম: করোনাকালে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো ফুটে উঠেছে। সরকারি বিনিয়োগে আমরা স্বাস্থ্যসেবাকে ইউনিয়ন পর্যন্ত নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছি। আবার স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকেও বিকাশের সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ কিংবা উন্নয়নশীল দেশে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে যে ধরনের কাঠামো প্রয়োজন, তা তৈরি করতে পারিনি। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির ঘাটতি আছে। এ খাতে জবাবদিহি আনতে হবে। কারণ, গত কয়েক দশকের আর্থসামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে স্বাস্থ্য খাত তাল মেলাতে পারছে না। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা স্বাস্থ্য খাতকে আরও বেশি নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে, যেন এই খাতে মনোপলি তৈরি না হয়।

এক বছরের মধ্যে অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরবে
করোনা থেকে আমরা কী শিক্ষা নিলাম?

শামসুল আলম: করোনা থেকে আমরা মোটা দাগে তিনটি বিষয়ে শিক্ষা নিয়েছি। প্রথমত, স্বাস্থ্য খাতকে দক্ষ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষাকৌশল প্রয়োজন। তৃতীয়ত, করোনা–পরবর্তী সময়ে কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।

অর্থনীতি কবে নাগাদ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারে?

শামসুল আলম: কোভিডের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে আগামী এক বছরের মধ্যে অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াবে। আমার পূর্বাভাস হলো, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি কোভিড–পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাবে, তবে শর্ত হলো যদি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। এখন করোনা পরিস্থিতি আছে, এর চেয়ে বেশি প্রকোপ না হলে আগামী এক বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পুরোপুরি হয়ে যাবে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English