সুন্দর আচরণ সবারই অত্যন্ত আকাক্সক্ষার একটি বিষয়। কেউ চায় না যে অপর কোনো ব্যক্তি তার সাথে খারাপ আচরণ করুক। আর এমন সুন্দর আচরণের মধ্যে তো সেই বেশি উত্তম যার মনে কোনো রাগ কিংবা ক্ষোভ থাকে না। আর এর জন্য প্রয়োজন ক্ষমা, যা দিয়ে দিন শেষে প্রতিটি অশান্ত হৃদয়ে শান্তি বয়ে যায়। এই ক্ষমার অনুপম উপমা তো আমাদের প্রিয় নবী সা:-এর পরিপূর্ণ জীবনাদর্শেই খুঁজে পাই।
হজরত আয়শা রা: বলেছিলেনÑ ‘কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র’। এ কথাটি থেকে প্রতীয়মান হয়, উত্তম চরিত্রের সব দিক ছিল তাঁর চরিত্রে। হজরত আনাস ইবনে মালেক বলেন, তিনি সবার চেয়ে ন্যায়পরায়ণ, দানশীল ও বীর ছিলেন। সবার চেয়ে ন্যায়পরায়ণের মানে হচ্ছে, আল্লাহর নির্দেশের বাইরে কখনো কাউকে কোনো কষ্ট দেননি।
রাসূল সা: তাঁর জীবনের সবক্ষেত্রে কুরআনের অনুসরণই করেছেন। আল্লাহ তাঁকে উত্তম হিসেবে গড়ে তুলতে বলেছেন, ‘অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তুমি তাদের প্রতি কোমল চিত্ত এবং তুমি যদি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয় হতে তাহলে নিশ্চয়ই তারা তোমার সংসর্গ হতে অন্তর্হিত হতো। অতএব তুমি তাদেরকে ক্ষমা করো ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং কার্য সম্বন্ধে তাদের সাথে পরামর্শ করো।’ (সূরা আল ইমরান, আয়াত-১৫৯)
অতএব, কঠিন আচরণের মাধ্যমে লোকেরা প্রিয় নবী সা:-এর সন্নিকটে আসতে সঙ্কোচবোধ করত। আর তাই আল্লাহর নির্দেশ ছিল দয়া দেখানো এবং ক্ষমা করা। তিনি কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হলে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন ও অমনোযোগিতা প্রকাশ করতেন অথবা তাকে মাফ করে দিতেন।
তায়েফে রাসূল সা:-এর যে দুরবস্থা হয়েছিল, ইতিহাসে সেই ঘটনার সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ রয়েছে। আয়শা রা: রাসূল সা:কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ, আপনি কি উহুদের চেয়েও কঠিন দিনের সম্মুখীন কখনো হয়েছেন? তিনি জবাব দিলেনÑ ‘তোমার জাতি আমাকে আর যত কষ্টই দিয়ে থাকুক, আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টকর দিন ছিল তায়েফে যেদিন আমি আব্দ ইয়ালিলের কাছে দাওয়াত দিলাম। সে তা প্রত্যাখ্যান করল এবং এত কষ্ট দিলো যে, অতি কষ্টে কারনুস সায়ালেব নামক জায়গায় পৌঁছে কোনোরকমে রক্ষা পেলাম।’
তায়েফবাসী রাসূল সা:কে মেরে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। তাঁকে কটাক্ষ করে শহর থেকে বের করে দেয়। অথচ রাসূল সা: অনেক বড় আশায় ছিলেন যে, কুরাইশ বংশের অভিজাত লোকেরা তাঁর কথা মেনে নেবে, যারা অধিক বিলাসিতায় মত্ত ছিল। যা হওয়ার তার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সব অত্যাচারের পর প্রিয় নবী সা: অজ্ঞান হয়ে গেলে জায়েদ বিন হারেসা নিজের ঘাড়ে করে তাঁকে শহরের বাইরে নিয়ে আসেন আর আল্লাহর কাছে এদের জন্য বদদোয়া করতে বলেন। তখন রাসূল সা: বলেছিলেনÑ ‘আমি ওদের বিরুদ্ধে কেন বদদোয়া করব? ওরা যদি আল্লাহর ওপর ঈমান না-ও আনে, তবে আশা করা যায়, তাদের পরবর্তী বংশধর অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে।’
এই কঠিন সময়ে জিবরাইল আ: এসে বলেছিলেন, রাসূল সা: নির্দেশ দিলে পাহাড়ের দায়িত্বে থাকা ফেরেশতারা পাহাড় দিয়ে মক্কা ও তায়েফের জনপদ পিষ্ট করে দেবে। তখনো আমাদের প্রিয় নবী সা: মানবতার বন্ধু ক্ষমার আধার এতে সম্মতি দেননি। ঠিক তখনই রাসূল সা:কে আল্লাহ সান্ত্বনা জানিয়ে দিলেন যে, মানুষ জাতি আপনাকে প্রত্যাখ্যান করলেও আমার সৃষ্ট অন্য জীব আপনার আনুগত্য করবে। রাসূল সা:-এর তিলাওয়াত শুনে জিন জাতি ঈমান আনে।
আল্লাহ তাঁর হাবিবকে আবার নির্দেশ দেন, ‘আপনি ক্ষমা করতে থাকুন আর ভালো কাজের আদেশ দিতে থাকুন। আর মূর্খদের (অর্থহীন তর্কবিতর্ক) এড়িয়ে চলুন’ (সূরা আরাফ, আয়াত-১৯৯)। এই আয়াত প্রসঙ্গে একবার রাসূল সা:-এর এক প্রশ্নের জবাবে হজরত জিবরাইল আ: বলেন, যে কেউ আপনাকে অত্যাচার করলে তাকে আপনি ক্ষমা করে দিন। যে লোক আপনাকে কিছু দেয়া থেকে বিরত করে তাকে আপনি দান করুন। আর যে লোক আপনার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, আপনি তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করুন।
এখানে যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে তা হলোÑ আপনি মূর্খদের মতো আচরণ করবেন না। যে যাই বলুক, আপনি আপনার কাজ করুন আর তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। অর্থাৎ, সৎ কাজের আদেশ দিয়ে হুজ্জাত কায়েম করার পরও যদি সে না মানে, তাহলে তাদেরকে এড়িয়ে চলো এবং তাদের ঝগড়া ও মূর্খতার উত্তর দিও না। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ক্ষমা করো এবং এড়িয়ে চলো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১০৯)
সাহল ইবনে সাইদি রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, আমরা খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাথে ছিলাম। তিনি (মাটি) খনন করছিলেন এবং আমরা মাটি সরিয়ে দিচ্ছিলাম। তিনি আমাদের দেখছিলেন। তখন তিনি বলছিলেনÑ ‘হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবনই সত্যিকারের জীবন। কাজেই আপনি আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করুন।’ কি অপরূপ ক্ষমার দৃষ্টান্ত, সবার জন্য ক্ষমা চেয়ে দোয়া করছেন। তিনি তো সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর উম্মতকে না দেখতে পেয়ে জান্নাতে খুঁজবেন। তিনিই সেই মহান রাসূল যিনি তাঁর উম্মতের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চাইবেন শেষ বিচারের দিন। তাহলে তাঁকে অনুসরণের মাধ্যমেই তো মুক্তি পাবে তাঁর উম্মত শেষ বিচারের দিন। আর তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমেই মিলবে শান্তি এই অশান্ত ধরায়। কারণ, কুরআনে এসেছেÑ ‘আর আমি তোমার খ্যাতিকে করেছি সমুন্নত’ (সূরা আল ইনশিরাহ, আয়াত-০৪)। অর্থাৎ, যেখানে আল্লাহর নাম আসে সেখানে তাঁরও নাম আসে। যেমনÑ আজান, নামাজ এবং আরো অন্যান্য বহু জায়গায়। (এই হিসাবে সারা বিশ্বে প্রতি মুহূর্তেই লক্ষবার তাঁর নাম উচ্চারিত হয়ে থাকে।) পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে নবী সা:-এর নাম এবং গুণ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা হয়েছে। ফেরেশতাদের মাঝেও তাঁর সুনাম উল্লেখ করা হয়। রাসূল সা:-এর আনুগত্যকেও মহান আল্লাহ নিজের আনুগত্যরূপে শামিল করেছেন এবং নিজের আদেশ পালন করার সাথে সাথে রাসূলের আদেশও পালন করতে মানব সম্প্রদায়কে নির্দেশ দিয়েছেন।
তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরতে হলে অবশ্যই আমাদের ক্ষমা করার অভ্যাস গড়তে হবে। যার খ্যাতি আল্লাহ সবসময়ই সমুন্নত রেখেছেন, তাঁর জীবন দর্শন আর বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের জীবনে প্রতিটি বিষয়ে সবাইকে ক্ষমা করে দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। আমরা প্রতিটি উত্তম চরিত্র আয়ত্ত করতে না পারলেও সামান্য ক্ষমার মাধ্যমে ও রাসূল সা:-এর প্রেমে উত্তীর্ণ হতে পারি। আর শেষ বিচারের দিনে প্রিয় রাসূল সা:-এর শাফায়াতে পুলসিরাত পেরিয়ে যেতে পারব খুব সহজেই। অবশ্যই ক্ষমা হবে আল্লাহর আদেশের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ে। যেসব কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট থাকেন, আল্লাহর সাথে শিরকের মতো পাপ হয় সেসব বিষয় ক্ষমা করা যাবে না।