প্রায় সবার ঘরে ঘরেই কুরআন আছে। আলমারির তাকে, টেবিলের এক কোণে গিলাফবদ্ধ সাজানো কুরআন। মাঝে মধ্যে সেই কুরআন থেকে কিছু অংশ আমরা পাঠ করি, মুখস্ত আওড়াই, চুমু খাই, যতœ করে রেখে দেই আগের জায়গায়। হাফেজ সাহেবকে দাওয়াত করে ঘরে এনে কুরআন খতম করাই, আপ্যায়ন করাই, হাদিয়া দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ প্রার্থনা করি। রোগীর পাশে কুরআন তিলাওয়াত করে তার আরোগ্য কামনা করি। কবরের আজাব লাঘবে মৃতের পাশেও পাঠ করি কুরআন। তবুও কুরআন ও আমাদের মাঝে একটি দেয়াল থেকেই যায়। একটি দূরত্বের প্রাচীর ঘিরে রাখে আমাদের। প্রতিনিয়ত কুরআন পাঠ করে, বুকে জড়িয়ে ধরে, চুমু খেয়েও সেই প্রাচীর ভেদ করতে পারছি না আমরা। প্রভুর প্রদত্ত সত্য বাণীগুলো পাঠ করে আলোকিত হচ্ছে না আমাদের ভেতর ও বাহির। ‘হুদাল্লিøন্নাস’Ñমানবতার জন্য আলোর পরশ, ‘হুদাল্লিল মুত্তাকিন’Ñ স্র্রষ্টার পরিচয়প্রাপ্ত মানুষের জন্য আলোর পরশ। অথচ কোথায় সে আলো, আলোর পরশ? অন্ধকারে হাতড়ে মরছে মানবতা। ঘোর অন্ধকারময় জীবন নিয়ে গুমড়ে মরছে বিশ্বাসী মানুষেরা। হায়! বিশ্বকে আলোকিত করার চেরাগ হাতে নিয়ে মুসলমান আজ নিজেই পদে পদে উষ্ঠা খাচ্ছে। দুনিয়াজুড়ে মার খাওয়া জাতিতে পরিণত হয়েছে।
এর মূল কারণ কী? একটাই কারণ, হৃদয়ের সাথে সংযোগ নেই আল্লাহর বাণীর। তারা আজ তোতা পাখির মতো কুরআনের বাণী শুধু মুখেই আওড়াচ্ছে। না বুঝে কুরআন পড়ছে; আর হৃদয়ে চাষাবাদ করছে বর্ণহীন ফুল, ভিন্ন সুর। কুরআন কী বলছে তার কোনো চর্চাই নেই মুসলিম সমাজে। প্রতিনিয়ত কুরআনের নির্দেশনা পদদলিত করে মার খাচ্ছে বিজাতির হাতে। আল্লøাহ তায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই এই কুরআন পরিচালিত করে সুদৃঢ় পথের দিকে’ (সূরা ইসরা-০৯)। এত শক্তিশালী গ্রন্থ আমাদের কাছে আছে/ অথচ আমরা রয়েছি ঘুমের ঘোরে। আজ কুরআন মুখস্থের প্রতিষ্ঠান আছে ঢের, নেই কুরআন বোঝার প্রতিষ্ঠান। হাদিস, ফিকহের উচ্চতর গবেষণাগার থাকলেও সে হারে নেই কুরআনের গবেষণাগার। তাই দিনে দিনে আরো হতাশা, আরো অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে মুসলিম জাতি। ইজ্জতির জীবন থেকে ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে লাঞ্ছনার দিকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি যাতে আপনি মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসাতে পারেন’ (সূরা ইবরাহিম-০১)। আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্য কুরআন আমাদের আলোকিত জীবনের সন্ধান দেবে, উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে। অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানো মানবতাকে আলোকিত করবে। অথচ আমরা বস্তু কুরআনকে আমাদের বুকে টেনে নিলেও, কুরআনের বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করতে শিখিনি। কুরআনের রঙে নিজেদের জীবনের সামগ্রিক দিক সাজাতে পারিনি।
তাই মুখে মুখে উচ্চারিত কুরআন প্রতিনিয়ত আর্তনাদ করছে আর আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে। হাদিসের ভাষায়, ‘এমন অনেক পাঠক আছে কুরআনের, যারা নিয়মিত কুরআন পাঠ করে, অথচ কুরআন তাদের অভিশাপ দিতে থাকে।’ যারা কুরআনের আয়াতকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে না হাশরের মাঠে কুরআন তাদের বিপক্ষে দাঁড়াবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘রাসূল সা: বলবেন, হে আমার রব! আমার জাতি এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে’ (সূরা ফুরকান-৩০)। এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম ইবনুল কাইয়ুম র. কুরআন পরিত্যাগের পাঁচটি ধরন উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, কুরআন পরিত্যাগ হলোÑ
ক. কুরআনের প্রতি ঈমান না আনা। তিলাওয়াত পরিত্যাগ করা, শ্রবণ না করা এবং মনোযোগ না দেয়া। খ. কুরআনের আমল পরিত্যাগ করা। গ. কুরআন অনুযায়ী বিচার না করা। ঘ. কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা ছেড়ে দেয়া এবং এর মর্মার্থ বুঝতে চেষ্টা না করা। ঙ. কুরআনের মাধ্যমে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ত্রুটির চিকিৎসা গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।
প্রিয় পাঠক, আসুন! কুরআন পড়ি, কুরআন বুঝি। কুরআনের রঙে, কুরআনের ঢঙে নিজেকে সাজাই। কুরআনের আলোয় আলোকিত করি আত্মা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে। আমাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠুক আল্লøাহর বাণীতে। হৃদয় বেজে উঠুক আল্লাহর প্রেমে।