রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:২৮ অপরাহ্ন

করোনাকালে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০
  • ৪২ জন নিউজটি পড়েছেন

কৈশোর বলতে সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালের সময়টাকে ধরা হয়ে থাকে। ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সই টিনএজ কৈশোর বলা হয়। এটা এমন একটা বয়স, যেখানে ছেলেমেয়েরা শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। তাই এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেকে বুঝতে পারে না তাদের পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিতে হবে। তাই এই বয়সের ছেলেমেয়েরা নানা রকম মানসিক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে থাকে।

এই সময়ে পরিবারের পাশাপাশি কিশোরেরা তাদের সমবয়সী বন্ধুবান্ধব এবং তারা যাদের পছন্দ করে থাকে, এমন মানুষদের চিন্তা ও ব্যবহার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে; যা তাদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিশোরেরা যদি এই সময়টাতে পরিবার ও বন্ধুদের কাছে ইতিবাচক ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতা পায়, তখন তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।

বিকাশের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে করোনা মহামারি তাদের মানসিক ও শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা তৈরিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেহেতু পুরো বিশ্বব্যাপী সব বয়সীদের জীবনযাত্রায় করোনা মহামারির কারণে নানা পরিবর্তন ঘটেছে।

আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাই, কিশোরেরা অবসাদ, উৎকণ্ঠা, মৃত্যুভয়, মা-বাবাকে হারানোর ভয় এবং হাসপাতালে একা থাকার আতঙ্কে ভুগছে—এই সবকিছু শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

করোনার মহামারি প্রতিরোধ করার জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত লকডাউন সবার দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা রুটিন পরিবর্তন করে দিয়েছে, যার সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়েছে আমাদের কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাসা থেকে অনলাইনে ক্লাস করা হচ্ছে। হঠাৎ শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক মেলামেশার এই পরিবর্তন শিশুদের মানসিকতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

বর্তমানে আমাদের জীবনে খুব পরিচিত একটি শব্দ হচ্ছে স্ট্রেস। স্ট্রেসের কারণে কিশোরদের মধ্যেও অবসাদ, উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক, পিটিএসডি, মুডের সমস্যা, ঘুমের সমস্যাসহ নানা উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। বেশির ভাগ কিশোর তাদের বন্ধু হিসেবে ডিভাইস যেমন: মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব, কম্পিউটারকে বেছে নিয়েছে। দিনের অনেকটা সময় তারা পার করছে অনলাইন গেম ও ইন্টারনেট ব্যবহারে। এতে তাদের মধ্যে ডিভাইসের প্রতি আসক্তি দেখা দিয়েছে; যার প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যবহার, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর।

এ ছাড়া তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও হতাশা দেখা দিয়েছে। বর্তমান জীবনের প্রতি গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ায় কিশোরদের মাদকদ্রব্যের দিকে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। এমনকি যেসব কিশোর আগের থেকেই মানসিক রোগে আক্রান্ত, তাদের সমস্যা অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, কোন পরিস্থিতি কিশোরদের মানসিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন: পরিবারে অর্থনৈতিক সমস্যা, লম্বা সময় বাসায় থাকার কারণে মা–বাবার বাসা থেকে কাজ করা, বাবা ও মায়ের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, তাঁদের চাকরি হারানোর ভয়, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও হতাশা, পরিবারের সদস্যদের অসুস্থ হওয়া, নিজের অসুস্থ হওয়ার ভয়, মা–বাবার সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করা ইত্যাদি।

বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী টিনএজাররা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের জন্য যা করতে পারে:

উদ্বিগ্ন হওয়াকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া
মহামারির সময়ে উদ্বিগ্ন হওয়া খুব স্বাভাবিক, এ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আমরা কিছু বিষয় খেয়াল রাখব; যেমন: হাত ধোয়া, ভিড় এড়িয়ে চলা। এর মধ্য দিয়ে নিজেকে এবং অন্যকে সুস্থ রাখতে পারি।

গুজবে কান দেওয়া যাবে না। ভয় পেলে মা–বাবার সঙ্গে কথা বলতে হবে। কোভিড–১৯ কিশোরদের জন্য মারাত্মক নয় এবং চিকিৎসার মধ্য দিয়ে নিজেকে সুস্থ রাখা যায়।
গুজবে কান না দেওয়া। ভয় পেলে মা–বাবার সঙ্গে কথা বলতে হবে। কোভিড–১৯ কিশোরদের জন্য মারাত্মক নয় এবং চিকিৎসার মধ্য দিয়ে আমরা নিজেকে সুস্থ করতে পারি। এ বিষয়ে খেয়াল রাখলে ও জানলে আমাদের উৎকণ্ঠা কমাতে সাহায্য করবে।
অন্য কাজে মন দেওয়া

একই চিন্তা না করে মনকে অন্য কিছুতে ব্যস্ত রাখা; যেমন: হোম ওয়ার্ক করা, মুভি দেখা বা গল্পের বই পড়া, গান শোনা, ড্রয়িং করা, আগ্রহ তৈরি হতে পারে এমন যেকোনো কাজে অংশ নেওয়া।

বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন মাধ্যম খোঁজা
যেমন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। অভিভাবকের মতামত নিয়ে সীমিত সময় ব্যবহার করা। কারণ, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম অনেক ক্ষতির কারণ হতে পার।

নিজের প্রতি মনোযোগ দেওয়া
নতুন কিছু করা; যেমন: নতুন কোনো বই পড়া, নতুন কিছু শেখা। এই পরিবর্তিত সময়ে নতুন কিছু করে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া যেতে পারে।

নিজের অনুভূতিকে বোঝা
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, শখ মেটানো ইত্যাদি। আর খেলাধুলা করতে না পারলে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক, এটা মেনে নিলেই ভালো হয়। তখন বিভিন্নভাবে অনুভূতিকে প্রকাশ করা যায়। যেমন: আঁকা, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা ইত্যাদি। মনে রাখতে হবে, সবকিছু সব সময় মনের মতো না–ও হতে পারে, আমরা সুন্দর চিন্তার মধ্য দিয়ে তা মনের মতো করে নিতে পারি।

নিজের এবং অন্যের প্রতি সদয় হওয়া
করোনাকালে ও অন্যান্য সময়ে লক্ষ করলে দেখা যায়, কিছু টিনএজ স্কুলে মন্দ মন্তব্য বা বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। বিষয়টিতে তারা তাদের বন্ধুদের বা বড়দের সাহায্য নিতে পারে। পরিবারকে এই বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। সুন্দর মনের অনেক গুণাবলি আছে, সেই জায়গা থেকে আমরা অন্য কাউকে হয়রানি হতে দেখলে তাকে সাহায্য করতে পারি। আমাদের সুন্দর ব্যবহার ও সহানুভূতি অন্য কারও জীবনে অনেক পরিবর্তন আনতে পারে।

এমন কোনো কথা বলব না, যাতে অন্যের মনে আঘাত লাগে। আমরা মনের কথাটি বুঝিয়ে বলতে পারি।

এ ছাড়া টিন এজারদের বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে উৎসাহিত করা যেতে পারে; যেমন: মা–বাবাকে ঘরের কাজে সাহায্য করা এবং নিজের কাজ নিজে করা।

কিশোরদের সুস্থ মানসিক বিকাশে বাবা-মায়েরা যেভাবে সহযোগিতা করতে পারেন
মা-বাবা বা অভিভাবকেরা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিলে ভালোভাবে তাঁদের সন্তানদেরও যত্ন নিতে পারবেন। তাঁরা সন্তানদের সঙ্গে কোভিড–১৯ নিয়ে কথা বলবেন, একসঙ্গে বসে টিভি দেখবেন; তাতে কোভিড-১৯ এবং কোয়ারেন্টিন নিয়ে ওদের ভয় অনেক কমে যাবে। ওরা মা–বাবা বা অভিভাবকদের চোখে–মুখে উৎকণ্ঠা দেখলে তারাও সেভাবে আচরণ করবে। আপনার জীবনের সাফল্যের গল্পটি সন্তানকে শোনান। মনে রাখতে হবে, মা–বাবা সন্তানের অনুপ্রেরণার বড় উৎস।

করোনাকালে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন
আপনার সদ্য কৈশোরে পা রাখা সন্তান কী ধরনের মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা আপনার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে সাহস ও উৎসাহ দিন। অল্প কথা শুনে উপসংহার না টেনে মনোযোগ দিয়ে তার সম্পূর্ণ কথা শুনুন। তার বক্তব্য ও মনকে বোঝার চেষ্টা করুন। আপনার সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করুন যেন সে যেকোনো প্রয়োজনে সর্বপ্রথম আপনার কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবে এবং সাহায্যে তৃপ্তি অনুভব করে। পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ করতে আপনার সন্তানকে উৎসাহ দিন।

মা–বাবা বা অভিভাবকেরা বয়ঃসন্ধির সন্তানদের ভালো থাকার জন্য নিজেরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করতে পারেন এবং তাদের উৎসাহিত করতে পারেন। যেমন: সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, হাত ধোয়া, মাস্ক পরা ইত্যাদি।

এ ছাড়া টিভি, সামাজিক মাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় না করা। তাতে স্ট্রেস অনেক বেড়ে যায়। নিয়মিত ব্যায়াম, ইয়োগা, মেডিটেশন করা, সুষম খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুমানো। কোনোভাবে কোনো ধরনের নেশায় আক্রান্ত না হওয়া।

স্কুল এবং শিক্ষকদের ভূমিকা
এই সময়ে স্কুল এবং শিক্ষকদেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কোভিড–১৯–এর কারণে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। সব বয়সী ছেলেমেয়েদের ঘরে বন্দী জীবন যাপন করতে হচ্ছে। আমাদের নিরাপত্তার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে; ফলে ওদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তাই স্কুলের শিক্ষকেরা নানা রকম গঠনমূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁরা কোভিড ১৯ সম্পর্কে ছাত্রদের ইতিবাচক উপায়ে আলোচনা করতে পারেন, অনলাইনে ছোট ছোট দলে ভাগ করে বিভিন্ন গুণগত কাজে অংশগ্রহণ করতে সাহায্য করতে পারেন। স্কুলের কাউন্সিলররা বাচ্চাদের তাদের সমস্যার ধরন অনুযায়ী সহযোগিতা করে থাকতে পারেন।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। কাজেই মনোযোগ দিতে হবে শিশুর যথাযথ মানসিক বিকাশের ওপর। মা–বাবা যদি তাঁদের সন্তানদের মধ্যে কোনো প্রকার মানসিক সমস্যা দেখতে পান এবং সন্তান যদি তার কোনো সমস্যা আলোচনা করে থাকে, তাহলে জরুরি ভিত্তিতে মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন।
ভালো কাজ করার মধ্য দিয়ে আমরা নিজের মনের যত্ন নেব। অন্যকে মনের যত্ন নিতে সাহায্য করব। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন এবং মনের যত্ন নেবেন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English