ইসলাম এমন একটি বটবৃক্ষ, যে এর নিচে আশ্রয় নেবে সে ছায়া পাবে। যে ঠেলাঠেলি করবে সে ছিটকে পড়বে। হারিয়ে যাবে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে। এটাই ইতিহাস। যারা শিক্ষা নিয়েছেন, তারা ইতিহাস গড়েছেন। যারা ভুল করেছেন, তারা ইতিহাস হয়েছে। নবী মুহাম্মদ সা: ইসলামের প্রাণ, মুসলমানদের জান। তাঁকে আঘাত করা মানে ইসলাম নামক বটবৃক্ষের সাথে ঠেলাঠেলি করা। যার পরিণতি নিজেকে ধ্বংস করা।
নবীজীর জন্ম : খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী তাঁর জন্ম তারিখ ২০ এপ্রিল। আরবি হিজরি সন অনুযায়ী তারিখটি ৯ রবিউল আউয়াল।
তবে দিন হিসেবে সোমবার সম্পর্কে মতভেদ নেই। কারণ, জীবনচরিতকাররা একমত, রবিউল আউয়াল মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে সোমবার দিন নবী মুহাম্মদ সা:-এর জন্ম হয়েছিল। এই সোমবার ৮ অথবা ৯ কিংবা ১২Ñ এটুকুতেই হিসাবের পার্থক্য রয়েছে মাত্র। (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
নবীজীর শৈশবকাল : জন্মের পর নবীজী সা: প্রথমে আপন মা আমিনা এবং কিছুদিন পর চাচা আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবার দুধ পান করেছিলেন। এরপর আরবের প্রথা অনুযায়ী দুধ পানের জন্য নবীজীকে বনু সাদ বংশের ধাত্রী হালিমার গৃহে পাঠানো হয়। পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশু নবী ধাত্রী হালিমার কাছেই ছিলেন। অবশ্য এর মাঝে দুই বছর পর কিছুদিনের জন্য একবার মায়ের কোলে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু মক্কার আবহাওয়া তখন খারাপ হয়ে পড়েছিল। অন্যপক্ষে সন্তানের অনুপম দেহকান্তি দর্শনে আমিনা ও আত্মীয়রা তাঁকে আরো কিছুদিন হালিমার গৃহে রাখা বাঞ্ছনীয় মনে করেন।
ইয়াতিম নবীর প্রতিপালন : ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাবা-মা দুই-ই হারিয়ে নবী সা: এতিম হয়ে যান। বাবাকে আগেই হারিয়েছিলেন। মা আমিনা তার স্বামী আবদুল্লাহর কবর জিয়ারত করার জন্য ছয় বছরের মুহাম্মদ সা:-কে নিয়ে মদিনার পথে রওনা দেন। ফেরার পথে হঠাৎ মা আমিনাও ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে মা আমিনার বয়স হয়েছিল মাত্র ২০ বছর।
বাবা-মাকে হারিয়ে শিশু মুহাম্মদ সা: লালিত পালিত হচ্ছিলেন দাদা আবদুল মুত্তালিবের স্নেহে। এ বছর দাদাকেও হারান। দাদার বয়স তখন ছিল ১২০ বছর।
নবীজীর কৈশোরকাল : ৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে নতুন অভিভাবক পেলেন মুহাম্মদ সা:। বয়স তখন ১২ বছর দুই মাস ১০ দিন। দাদার মৃত্যুতে চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে আসেন। চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে পশু চরানো এবং গৃহকর্মে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি স্বল্প পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কাবাসীর পশু চরাতেন।
এটাও আল্লøাহ তায়ালার একটি প্রথা ও রীতি যে, তিনি প্রায় সব নবীকেই সবর ও বিনয় শেখানোর জন্য প্রথম জীবনে রাখালের কাজ করিয়েছেন। মুহাম্মদ সা:ও প্রথম জীবনে এই রাখাল পেশায় থেকে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছিলেন।
নবীজীর দাম্পত্য জীবন : চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ব্যবসায়িক সফরে নবীজী একাধিকবার সিরিয়া যাতায়াত করেন। এতে ব্যবসা সম্পর্কে নবীজী দারুণ ধারণা লাভ করেন। কুরাইশের ধনবতী ব্যবসায়ী বিধবা নারী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ নবীজীর আমানতদারিতা এবং বিশ্বস্ততা সম্পর্কে অবগত হয়ে নিজের ব্যবসায়িক সফরে নবীজীকে সিরিয়া পাঠান। খাদিজার ক্রীতদাস মাইসারাকে সাথে করে নবীজী মালামাল নিয়ে সিরিয়ার ব্যবসায়িক সফর সফলভাবে সম্পন্ন করে ফিরে আসেন। এ সফরে অনেক বেশি লাভ হয়। খাদিজা রা: বেশ খুশি হলেন। আবার ভৃত্য মাইসারা থেকে সফরকালীন নবীজীর বিভিন্ন মুজিজার কথা শুনে নবীজীর প্রতি তার আগ্রহ বেড়ে যায়। বুদ্ধিমতী নারী ছিলেন বিধায় তিনি নবীজীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। নবীজী চাচাকে এ প্রস্তাবের কথা জানালেন।
চাচার তত্ত্বাবধানে ২৫ বছর বয়সে নবীজীর বিয়ে হয় আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী বিধবা নারী বিবি খাদিজার সাথে। হজরত খাদিজা রা:-এর ইন্তেকালের পর নবীজী আল্লøাহর নির্দেশে পর্যায়ক্রমে আরো কিছু নারীর সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। হজরত আয়শা রা: ছাড়া সবাই ছিলেন বিধবা।
নবীজীর সন্তানাদী : বিয়ের পর খাদিজা রা: তার সমুদয় সম্পদ নবীজীকে দিয়ে দেন। এরপর তাদের সাংসারিক জীবন শুরু হয়। নবীজীর মোট সাতজন ছেলেমেয়ে ছিল। ছয়জন হজরত খাদিজা রা: থেকে। আর একজন দাসী হজরত মারিয়া কিবতিয়া থেকে। তার নাম ইবরাহিম।
নবুয়ত লাভ : খাদিজা রা:-এর সাথে সাংসারিক জীবনের ১৫তম বর্ষে নবীজীর বয়স যখন ৪০ পূর্ণ হয় তখন নবুয়ত লাভ করেন। নবুয়ত লাভ করার পর দ্বীন প্রচারের মিশনে নেমে যান। দ্বীন প্রচারে মক্কার কাফেরদের কাছ থেকে নানা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হন। প্রতিকূল পরিবেশে নবীজী টানা ১৩ বছর মক্কার কাফেরদের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত দেন। এতদিনে মক্কা ও মদিনার অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন।
একপর্যায়ে আল্লøাহ তায়ালার হুকুমে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় গিয়ে স্বাধীনভাবে দ্বীন প্রচার করেন। টানা ১০ বছরের মেহনতে আল্লাহর রহমতে পৃথিবীব্যাপী ইসলামের বিজয় নিশান উড়িয়েছেন। মানবতার জীবনবিনাশী প্রকৃতিকে ঐশী ছোঁয়ায় ফিরিয়ে আনেন মানবতার জীবনসঙ্গী হিসেবে। বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে গেছেন; মাটি-মানুষ ও প্রকৃতির প্রকৃত সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি একমাত্র ইসলামেই রয়েছে। ইসলামের পূর্ণতা পাওয়ার পর ১১ হিজরিতে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার আল্লøাহ তায়ালা নবীজী সা:-এর ইন্তেকালের মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত নবুয়তের দরজা বন্ধ করে দেন।
নবীজীর দৈহিক গঠন : রাসূল সা:-এর চেহারা ছিল খুবই লাবণ্যময় ও নূরানী। পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঝকঝকে। দুধে আলতা মিশ্রণ করলে যে রঙ হয়, রাসূল সা:-এর গায়ের রঙ তেমনি ছিল। রাসূল সা: ছিলেন মধ্যম আকৃতির। খুব লম্বাও নন, খুব বেঁটেও নন। তাঁর আগে ও পরে কখনো তাঁর মতো সুপুরুষ দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেননি। রাসূল সা:-এর মাথার চুল ছিল কানের লতি পর্যন্ত কিছুটা কোঁকড়ানো, ঢেউ খেলানো বাবরি। বাবরি কখনো ঘাড় পর্যন্ত আবার কানের লতি পর্যন্ত থাকত। শেষ বয়সে চুল লালাভ হয়েছিল। প্রিয় নবী রাসূল সা:-এর মাথা অপেক্ষাকৃত বড় ছিল। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর চক্ষুযুগলের মণি খুব কালো ছিল। চোখের পাতা ছিল খুব বড় এবং সর্বদা সুরমা লাগানোর মতো দেখাত। নাক ছিল সুন্দর ও উঁচু। দাঁত ছিল রজতশুভ। হাসির সময় তাঁর দাঁত মুক্তার মতো চমকাত। রাসূল সা:-এর ঘাড় ছিল দীর্ঘ, মনোরম মাংসল। কাঁধের হাড় আকারে বড় ছিল।
দুই কাঁধের মধ্যস্থলে কবুতরের ডিমসদৃশ একটু উঁচু মাংসখণ্ড ছিল। এটাই মোহরে নবুয়াত। এতে লেখা ছিল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লøাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লøাহ’। মোহরের ওপর তিলক ও পশম ছিল এবং রঙ ছিল ঈষৎ লাল।
রাসূল সা:-এর দাড়ি ছিল লম্বা, ঘন, যা প্রায় বক্ষ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। হাত ও আঙুলগুলো লম্বা ছিল। হাতের কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত পশম ছিল। হাতের তালু ছিল ভরাট ও প্রশস্ত। বক্ষ ছিল কিছুটা উঁচু ও বীর বাহাদুরের মতো প্রশস্ত। বক্ষস্থল থেকে নাভি পর্যন্ত চুলের সরু একটা রেখা ছিল।
রাসূল সা:-এর পেট মোটা কিংবা ভুঁড়ি ছিল না। সুন্দর সমান ছিল। সুগঠিত ঊরু ও দুই পায়ের গোড়ালি পাতলা ছিল। পায়ের তালুর মধ্যভাগে কিছুটা খালি ছিল। চলার সময় সামান্য ঝুঁকে মাটির দিকে দৃষ্টিপাত করে হাঁটতেন। রাসূল সা:-এর শরীরের চামড়া রেশম থেকেও অধিক মসৃণ ও নরম ছিল। তিনি স্থূলও ছিলেন না, ক্ষীণকায়ও ছিলেন না। তাঁর চেহারা দেখলে যেকোনো মানুষের হৃদয় প্রভাবিত হতো। একজন মহাপুরুষের যাবতীয় লক্ষণই মহানবীর পবিত্র দেহে বর্তমান ছিল। (সূত্র : শামায়েলে তিরমিজি)