সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন

বক্তৃতায় অতিরঞ্জন

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৪৫ জন নিউজটি পড়েছেন

অলঙ্কারপূর্ণ ভাষায় প্রাঞ্জলতার সাথে বিশুদ্ধ ও সুস্পষ্টভাবে মনের কথা ও আবেগ প্রকাশ করাই বক্তৃতা। আকর্ষণীয় বক্তৃতা করার শক্তি মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মহাদান। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা: বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা: বলেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো কোনো বক্তৃতায় জাদুর ন্যায় প্রভাব থাকে।’ (বুখারি : ৫৪৩৪ ) বক্তৃতার মধ্যে মোহনীয় ও আকর্ষণীয় প্রভাব থাকায় তা মানুষকে দ্রুত প্রভাবিত করে এবং অন্তরকে আকৃষ্ট করে। তবে বক্তৃতা করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় লক্ষ রাখা জরুরি যাতে অপ্রয়োজনীয়, অশালীন, চাটুকারি ও অসত্য কথা প্রকাশিত না হয়। সে ক্ষেত্রে রাসূল সা:-এর উত্তম জীবনাদর্শ অবশ্যই অনুকরণীয়।
নিরর্থক বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং অযথা ভাষায় পাণ্ডিত্য প্রকাশ করে গলাবাজি করা ইসলাম পছন্দ করে না। যারা বক্তৃতায় অতিরঞ্জন করে রাসূল সা: তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘কথায় বাড়াবাড়িকারীগণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ : ৩৬৫৫) কথায় বাড়াবাড়ি করার কারণে মানুষ বিপদে পড়ে যায়, ফিতনা সৃষ্টি করে এবং পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। মানুষের জবান ছোট-বড় অসংখ্য গুনাহের অন্যতম উৎস। অপবাদ আরোপ, পরনিন্দা, গালমন্দ, তিরস্কার ও মিথ্যা কথাগুলো বক্তৃতা দিয়েই প্রকাশ পায়।
সর্বদা সতর্কতার সাথে কথা বলা বুদ্ধিমানের কাজ ও ঈমানের প্রমাণবহ। মুমিন কথা বলার সময় সাবধানতা অবলম্বন করে যাতে অসমীচীন ও অশালীন শব্দ বের না হয়। কেননা, যারা অশোভন কথা থেকে দূরে থাকে তারা সফলকাম হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(তারা সফল) যারা অসার কথাবার্তা এড়িয়ে চলে।’ (সূরা মুমিনুন : ৩) ঢালাওভাবে অতিরঞ্জনমূলক বেফাঁস বক্তব্য নেফাকির অন্যতম একটি শাখা। আবু উমামা রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ও জিহ্বা সংযত রাখা ইমানের দুটি শাখা। পক্ষান্তরে অশ্লীল ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলা নেফাকির দুটি শাখা।’ (মুসনাদু আহমদ : ২২৩১২) বস্তুত মুনাফিকরাই পাণ্ডিত্যের সাথে অতিরঞ্জনমূলক অযথা, অপ্রয়োজনীয় ও বেহায়াপূর্ণ কথা বলে এবং বাকচাতুরতার সাথে অহেতুক দুর্নাম রটায় ও হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অযোগ্য ব্যক্তির প্রশংসা করে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে এমন আছে, যার কথা তোমাকে চমৎকৃত করে, আর সে ব্যক্তি তার অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে অথচ সে ব্যক্তি খুবই ঝগড়াটে।’ (সূরা বাকারা : ২০৪)
মিতভাষী হওয়া চরিত্রের বিশেষ একটি গুণ। বেশি কথার অবতারণায় সাবধানতা থাকে না, ফলে তা মিথ্যা সৃষ্টি করে, সত্যকে চাপা দেয়, অযথা কথা বলে ঠোট পেঁচিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করে, বিশেষ ভঙ্গিতে গাল বাঁকিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে হালকা করে বর্ণনা করে। সবিস্তারে কথা বলার উদ্দেশ্য হলো যাতে মানুষের মন জয় করা যায় এবং লোকেরা তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতে তাদের মাঝে আত্ম-অহমিকা সৃষ্টি হয়। এমন লোকদের সম্পর্কে আবু সালাবা আল-খুশানি রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূল সা: বলেন, ‘কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়তম এবং তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে নিকটতম হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে চরিত্রবান। আর আমার কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত এবং আমার থেকে সবচেয়ে দূরতম সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক চরিত্রহীন। আর তাদের পরিচয় হচ্ছে তারা বেশি বেশি কথা বলে, অসতর্কভাবে যা-তা বলে এবং অহঙ্কার করে থাকে।’ (তাবারানি : ১০৪২৪)
কিয়ামতের পূর্ববর্তী সময়ে একদল লোকের চরিত্র হবে এমন, তারা জিহ্বা দিয়ে খাদ্য উপার্জন করবে। জীবিকা নির্বাহ ও পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা লোকের মিথ্যা প্রশংসা করবে এবং কুৎসা রটনা করবে। এতে তারা হালাল-হারামের তোয়াক্কা করবে না। গাভীর সামনে খাবার আসলে জিহ্বা দিয়ে টেনে টেনে দাঁত দিয়ে যেভাবে চিবায়; অনুরূপ চাটুকাররাও জিহ্বা দিয়ে পাণ্ডিত্য দেখিয়ে রুজি-রোজগার করে নিজের উদরপূর্তি করবে। এ সম্পর্কে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূল সা: বলেন, ‘কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত হবে না, যতক্ষণ না এমন এক দলের আবির্ভাব হবে, যারা নিজেদের জিহ্বার সাহায্যে ভক্ষণ করবে যেভাবে গাভী তার জিহ্বার সাহায্যে ভক্ষণ করে থাকে।’ (কানজুল উম্মাল : ৩৮৫৮)
দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ও প্রচার করা মুমিনের দায়িত্ব। কিন্তু পার্থিব স্বার্থে এটি মহাপাপ। যদি কোনো ব্যক্তি দুনিয়ার স্বার্থে মানুষের আকর্ষণ পাওয়ার লক্ষ্যে ইলম প্রচারের জন্য অতিরঞ্জন ও বাকপটুতা শিক্ষা ও প্রদর্শন করে তাহলে পরকালীন জীবনে তার জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর পরিণতি। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি বক্তব্যের বিভিন্ন বর্ণনাশৈলী শিক্ষা গ্রহণ করে, যাতে সে তদ্বারা লোকের অন্তরসমূহকে আকৃষ্ট করতে পারে; কিয়ামতের দিন আল্লøাহ তায়ালা তার কোনো ফরজ ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। (আদাবুল বায়হাকি : ৩১৭)
বক্তব্যে অতিরঞ্জন করতে গিয়ে অসংখ্য অসার কথার অবতারণা ঘটে, ফলে বক্তব্য অনেক দীর্ঘ হয়। দীর্ঘ বক্তব্যের কারণে শ্রোতার বিরক্তিভাব দূর করতে প্যাঁচ খাটিয়ে আরো দীর্ঘায়িত করা হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো স্থান-কাল-পাত্রভেদে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করা। আমর ইবনুল আস রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি একদিন বলেছেন, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দিলো। তখন আমর রা: বললেন, যদি সে তার বক্তব্য সংক্ষেপ করত তবে তার জন্য কল্যাণ হতো। কেননা, আমি রাসূল সা:কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘অবশ্যই আমি দেখেছি অথবা আমাকে আদেশ করা হয়েছে যে, আমি যেন বক্তব্য সংক্ষেপ করি। কারণ বক্তব্য সংক্ষেপ করাই উত্তম।’ (আবু দাউদ : ৫০০৮)
বক্তারা এমন সব অসত্য, বানোয়াট, বেফাঁস ও ভিত্তিহীন উদাহরণ উল্লেøখ করেন যা বক্তব্যকে অনেক বেশি রঞ্জিত করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর নিশ্চয়ই আমি কুরআনে মানুষের জন্য সব ধরনের উদাহরণ পেশ করেছি যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।’ (সূরা জুমার : ২৭) সুতরাং কুরআন বুঝার জন্য কুরআনেই রয়েছে যথেষ্ট উদাহরণ। কুরআনের বিষয়বস্তুসমূহ পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক আয়াতের ব্যাখ্যা অন্য আয়াত দ্বারাই সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাজিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, বারবার পঠিত।’ (সূরা জুমার : ২৩) বিশ্লেষণে দেখা যায়, আল্লাহর ব্যবহার করা উদাহরণগুলো আকল ও যুক্তি জ্ঞানভিত্তিক, সাধারণ ও ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা এবং কাহিনীনির্ভর।
পরিশেষে, যারা দ্বীনের জ্ঞানার্জন করে এবং তা মানুষকে শিক্ষা দেয় তাদের উচিত কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে তা করা। দুনিয়ার মোহ যেন তাদেরকে আকৃষ্ট না করে। পার্থিব এ ক্ষণস্থায়ী চাকচিক্য যেন জান্নাতের পথে অন্তরায় না হয়। আল্লাহ সবাইকে সতর্ক থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English