জীবনে সফল হতে চায় না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং প্রত্যকে মানুষই চায় সফল হতে। সফলতার সোনালি সোপানে আরোহণ করতে। নিজের কৃতিত্বকে জানান দিতে। তবু জীবন চলার পথে বারবার আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। হতাশার কালো মেঘ যেন আমাদের পিছু ছাড়তেই চায় না। জীবনের বাঁকে বঁাঁকে হতাশা আমাদের পথ আগলে রাখে। তাই মাঝে মধ্যে আমরা নিরুৎসাহিত হয়ে কাজের উদ্যম হারিয়ে ফেলি। ভাবি আর বুঝি কিছুই হবে না আমাকে দিয়ে। আক্ষেপ করে বলি, হায়! আমি এত দুর্ভাগা কেন? সত্যিই কি দুর্ভাগ্য আমার ঘাড়ে ছেপে বসেছে! কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি কিসে আমার সফলতা? আর সেই অর্জিত সফলতার স্থায়িত্বটুকুইবা কত? জীবনের যেমন স্থায়ী ও অস্থায়ী রূপ রয়েছে, তেমনি সফলতারও রয়েছে স্থায়ী ও অস্থায়ী রূপ।
পার্থিব জীবন অস্থায়ী এবং পরকালীন জীবন স্থায়ী। তাই পার্থিব জীবনের সফলতাই যাদের কাছে মুখ্য বিষয়, বিপুল অর্থ-সম্পদ ও বিলাসিতাময় জীবন-যাপন যাদের পরম আরাধনা; তারা সফল হয় বটে, তবে তা ক্ষণিকের জন্য। অপর দিকে বিশ্বাসী মানুষ সফলতাকে দেখে অন্যভাবে, ভিন্ন আঙ্গিকে। পরকালীন অনন্ত জীবনের সফলতা অর্জন করতে গিয়ে পার্থিব জীবনের সাময়িক ব্যর্থতা সে মেনে নেয়। বিশ্বাসী মাত্রই স্রষ্টার নির্দেশিত পথে জীবনের সফলতা খোঁজে। তাই পার্থিব জীবনে সামান্য ব্যর্থ হলে ও পরকালীন জীবনের অসামান্য সফলতা তার চাইই, চাই। প্রকৃতপক্ষে সফল হচ্ছে সে, যে মহান প্রভুর দেয়া রূপ-সৌন্দর্যময় এই পৃথীবিতে তার নির্দেশিত পথে পদচারণা করে তার সন্তুষ্টি প্রাপ্ত হয় এবং তার বিনিময়ে পরকালীন জীবনে আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও ক্ষমা লাভ করে।
আর সেই সাথে সাথে বৈধ উপায়ে যদি পার্থিব সুখ শান্তি অর্জিত হয়, তবে তো সোনায় সোহাগা। আর যদি একটু কমও হয় তবু আল-হামদুলিল্লাহ। পরকালীন মুক্তি ও সফলতাই একজন আত্মপ্রত্যয়ী বিশ্বাসীর মূল আলোচ্য বিষয়। এমন সফল ব্যক্তির কথাই পবিত্র কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘অবশ্যই বিশ্বাসীগণ সফল হয়েছে। (সূরা মুমিনুন :০১) আরো এসেছে, ‘যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই পাবে সফলতা’। (সূরা আল-ইমরান : ১৮৫) পার্থিব আরাম-আয়েশ ও সুখবিলাস নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই মুমিন জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা। কুরআন মাজিদের ভাষায়, ‘আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, তাতে তারা চিরদিন থাকবে এবং ওয়াদা দিচ্ছেন স্থায়ী জান্নাতে পবিত্র বাসস্থানসমূহের। আর সবচেয়ে বড় হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটিইতো মহাসফলতা।’ (সূরা তাওবা :৭২)
আল্লামা ইবনে জারির আত-তাবারী র: বলেন, যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে মুক্তি দেয়া হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে মুক্তি পেয়ে গেল এবং মহাসম্মানে পুরস্কৃত হয়ে উচ্চতর সফলতা লাভ করল। (তাফসিরে তাবারি :৭/৪৫২) রাসূল সা: বলেন, আল্লাহ তায়ালা জান্নাতবাসীদের সম্বোধন করে বলবেন : হে জান্নাতিরা! তারা উত্তর দিবে, লাব্বাইকা রাব্বানা ওয়াসা’দাইকা ওয়াল খাইরি বিয়াদিকা। আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? তারা বলবে, কেন হবো না! হে রব? অথচ আপনি আমাদের এত মর্যাদা দিয়েছেন, যা আপনার আর কোনো সৃষ্টিকে দেননি। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাদেরকে তার চেয়েও উত্তম কিছু দেবো না? তারা বলবে, হে রব! তার চেয়েও উত্তম আর কী আছে? আল্লাহ বলবেন, আমার সন্তুষ্টি তোমাদের জন্য অবারিত করে দিলাম, আজকের পর থেকে আর কখনো তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবো না। (সহিহ বোখারি : ৬৯৬৪)
তাই মুমিন জীবনের একান্ত আরাধনা পরকালীন সফলতা অর্জন করতে হলে, দুনিয়ার জীবনের সাময়িক হতাশা ও ব্যর্থতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে, পরম বিশ্বাসের সাথে ভালো কাজ করে যেতে হবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘নিশ্চই এটি এক মহাসফলতা। এ মহাসাফল্যের জন্যই আমলকারীদের আমল করা উচিত। (সূরা সাফফাত :৬০-৬১) তবে সে কাজ যেন হয় রাসূল সা:-এর অনুসরণে, তারই দেখানো পথে; নতুবা বিফলে যাবে কাজ ও কাজের মূল্য, শ্রম ও শ্রমের প্রতিদান। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, সে সব লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রাসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদের নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে; তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ এবং তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেন এবং বন্দিত্ব অপসারণ করেন যা তাদের উপর বিদ্যমান ছিল।
সুতরাং যেসব লোক তাঁর উপর ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সে নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধু তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য সফলতা অর্জন করতে পেরেছে। (সূরা আরাফ : ১৫৭) শুধু পার্থিব জীবনের পিছনে ছুটে হয়রান হলে ভেস্তে যাবে পরকালীন জীবনের সফলতা। কারণ পার্থিব জীবন ধোঁকায় ভরা। আর এই ধোঁকার জালে যে ফেঁসে যাবে, সেই হবে ব্যর্থ ও হতভাগা।