১.
‘ওয়াও জনি, ইউ ওয়্যার ইন জাপান, হোয়াট আ বিউটিফুল কান্ট্রি জাপান ইজ!’ কর্মস্থলে জনি একজন বিনয়ী ও সদাহাস্য গবেষক। জাপানের প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল তাঁর অফিসের সহকর্মী লরার সঙ্গে। জনির বেড়ে ওঠা এশিয়ায়, তবে লরা কানাড়ায়। প্রশংসার পরেই লরা বললেন, কিন্তু জাপানিরা তো খুবই আত্মকেন্দ্রিক! সেই দেশে ভ্রমণে গিয়ে লরার এই উপলব্ধি। ঠিক কী কারণে এমনটা মনে হলো? টোকিওতে বেড়াতে গিয়ে লরা যখন ট্রেনে, বাসে, বা হাঁটাপথে চলেছেন, জাপানিরা উৎসুক হয়ে আগ বাড়িয়ে তাঁর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কোনো কথা বলেনি। সে জন্য। সুযোগ পেয়ে জনি বললেন, হ্যাঁ, ঠিক তাই, অযাচিতভাবে জাপানিরা অন্যকে বিরক্ত করে না। আত্মকেন্দ্রিক নয়, বরং তারা স্বল্পভাষী ও অমায়িক।
জাপানিরা প্রচুর বই পড়ে। পথ চলতে ট্রেনে বা বাসে উঠে যে সময়টুকু পাওয়া যায়, তখনো তাদের চোখ বইয়ের পাতায়। তাই পড়ার মাঝে ডুবে থাকা এই জাপানিরা বহির্বিশ্ব থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকদের দিকে উৎসুক চোখে না তাকালে তাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক ভাবাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু না, আত্মকেন্দ্রিক নয়। তারা বিনয়ী, সৎ, আর পরোপকারী। তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী। সর্বোপরি পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন আর পরিপাটি। কীভাবে সম্ভব? গুণগত শিক্ষা, যোগ্য শিক্ষক, আর বই এনে দেয়—এসব ভালো গুণ। বই। মনকে সুন্দর করতে বই। মানুষ ও সৃষ্টিকে জানতে বই। কল্পনায় হারিয়ে যেতে বই।
২.
কল্পনাশক্তি মানুষকে ভাবতে শেখায়। আনন্দ দেয়। অলস ভারাক্রান্ত মনকে আনন্দ দিয়ে মানুষকে সৃজনশীল করতে বই অতুলনীয়। বই জ্ঞানের আলো দেয়। এই আলো শিক্ষার আলো। পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, বিজ্ঞানের শিক্ষা, আর ধর্মীয় শিক্ষা সব বাস্তবতা আর নীতির কথা বলে। জীবনের মান উন্নয়নে বিষয়ভিত্তিক আর বিজ্ঞানশিক্ষার আলো অপরিহার্য। জীবনের সৃষ্টি হয়েছে একবারের জন্য, মৃত্যুতে এর শেষ। তাই তথ্যনির্ভর এসব বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার বাইরে জীবনকে উপভোগ করতে মানুষকে হারিয়ে যেতে হয় কল্পকাহিনিতে। গল্প, উপন্যাস, আর রূপকথার বইয়ের পাতায়। সময় দিতে হয় বইয়ে লেখা কথামালায়, বর্তমান ডিজিটাল যুগের ফেসবুকে নয়।
দূর প্রাচীনকালে গাছের ছাল, পাথর, ধাতব পাত্র ইত্যাদিতে প্রয়োজনীয় কথা লেখা হতো। কালের ধারাবাহিকতায় এই লেখার জন্য কাগজের সৃষ্টি হয়েছে। গাছ থেকে পাওয়া সেলুলজ–জাতীয় পদার্থ এটি। এই কাগজের ওপর কলম দিয়ে লেখা হয়, অথবা বইয়ের পাতায় করা হয় মেশিনের প্রিন্ট। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মুখে উচ্চারিত শত ভাষার কথাকে সেলুলজের কাগজে সেই ভাষার বিভিন্ন রকম হরফে লেখা হয় সব জ্ঞানের কথা। তবে কম্পিউটার আবিষ্কারের পর এই ডিজিটাল দুনিয়ায় জ্ঞানের ভান্ডারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। কাগুজে বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল পর্দায় এসেছে ইলেকট্রনিক বই।
৩.
ইলেকট্রনিক বইয়ের প্রাপ্তি সহজ, দামে সস্তা, সংরক্ষণ সহজ। তবে এর খারাপ দিক অনেক, শারীরিক সমস্যা এর মধ্যে অন্যতম। চোখের বড় ক্ষতি। ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক স্মার্টফোন, আইপ্যাড বা কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে বরং বই পড়ার অভ্যাস থাকা খুবই ভালো। ইলেকট্রনিক এসব স্ক্রিনের আলো শরীরে মেলাটোনিন তৈরি কমায়।
ব্রেইন শরীরের জন্য মেলাটোনিন নামক হরমোন তৈরি করে। এটা শরীরের নিজস্ব ঘড়ি। ঘুমের সময় নিয়ন্ত্রণ করে। রাতের আঁধারে ঘুমাতে যাওয়ার জন্য তাড়া দেয়, সকালের আলোয় ঘুম ভাঙায়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সময়ের তারতম্যে দীর্ঘ ভ্রমণে সৃষ্ট জেট ল্যাগ কাটাতে, বয়স্ক মানুষের নির্ঘুম অভ্যাসকে স্বস্তি দিতে মেলাটোনিন নিতে হয়।
সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে নিঃসন্দেহে এ কথা আজও বলা যায় যে কাগজে তৈরি বই ইলেকট্রনিক বইয়ের তুলনায় শ্রেয়। যেমন কাগজে লেখা পড়ে বেশি আনন্দ পাওয়া যায়। মেশিনে ছাপানো বইয়ে পড়া তথ্য মানুষের স্মৃতিশক্তিতে বেশি দিন থাকে। এই ছাপানো বই পড়া চোখের জন্য সহজ। ছাপানো বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে নরম হাতের ছোঁয়া দিয়ে মন ও হৃদয়কে এর সঙ্গে শক্তভাবে বাঁধা যায়। কাগজে বইয়ের সঙ্গে মনের এই যে শক্ত বন্ধন, তাতে অন্য রকম আনন্দ আছে। এই আনন্দ ডিজিটাল পর্দায় পড়ে পাওয়া যায় না।
৪.
তবু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক মানুষের চোখ যায় ডিজিটাল পর্দায়। এই ডিজিটাল দুনিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আজকের যুবসমাজ। বাঁধানো বই পড়ায় মন নেই তাদের। ইলেকট্রনিক বই যে পড়ে, তা–ও নয়। এই যুগে স্কুলবয়সী কিশোর, আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা ডিজিটালের সংজ্ঞা বলতে স্মার্টফোন ও কম্পিপউটারে ইন্টারনেট, ফেসবুক এবং মেসেঞ্জার ব্যবহারকেই বোঝে। পশ্চিমা বিশ্বে টিনডার।
পড়ার টেবিলে অধ্যবসায় কম, বিছানায় শুয়ে ঘুম নেই, অথচ এই কিশোর-তরুণদের মধ্যে অনেকের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় ফেসবুক, মেসেঞ্জার আর ইউটিউব ব্যবহারে। বাংলাদেশে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এই ফেসবুক আর অপ্রয়োজনীয় ইন্টারনেটের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার জাতির জন্য এক কঠিন ব্যাধি। শিক্ষার আলো থেকে নিকষ কালো অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার এই ব্যাধি দূর হওয়া প্রয়োজন।
৫.
একটি বই পড়া মানে সুন্দর মন আর জ্ঞানের উন্নয়নে জীবনপথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। ‘বই জ্ঞানের আলো, ফেসবুকে নয়’ লেখায় ছবিটিতে সিঁড়ির ধাপে ধাপে সাজানো গল্পের বই। পড়ে ধাপে ধাপে এগোনোর চিন্তাধারাটি দৃষ্টিনন্দন সাজে সাজিয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুলবয়সী বাংলাদেশি কানাডীয় দুজন শিশু। চিন্তাশীল এই ভাবনাটা একজন তুখোড় মেধাবী কূটনীতিকের বেশ পছন্দ হয়েছে। এই মেধাবী হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি একজন বইপড়ুয়া, আর সফল ব্যক্তিত্ব। তিনি অত্যন্ত প্রতিভাময় তার্কিক, হার না–মানা বক্তা, আর দেশের স্বনামধন্য কূটনীতিক। নাম আলীমুজ্জামান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসির গ্র্যাজুয়েট। তিনি এই গল্প লেখকের বিশ্ববিদ্যালয়–জীবনে দেখা সেরা প্রতিভাময় তরুণদের একজন। লেখক অবশ্য অনেক অলস, অল্প বই পড়াতেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে বই পড়েন, এতে নাকি ক্লান্তি কম হয়!
আলসেমি, অসচেতনতা, আর অজ্ঞতা মানুষকে নিয়ে যায় নিকষ কালো অন্ধকার কোনো গন্তব্যে। সঠিক শিক্ষার পথ ছেড়ে অন্ধকার পথে এই ছিটকে যাওয়াটা এক বড় ব্যাধি। এতে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণের আগামী দিনের সব সুন্দর স্বপ্নের মৃত্যু হয়। সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে আর জীবনকে সুন্দর করতে ফেসবুক ছেড়ে পড়ার টেবিলে লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়া অপরিহার্য। জ্ঞানের সাগর খুঁজে পেতে দরকার প্রচুর বই পড়ার।