আপনি আমি যদি কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি সে প্রতিষ্ঠানে যে পরিমাণ সময় দেয়ার কথা বলে আমাকে নিয়োগ করা হয়েছে সে সময়ের মধ্যে যদি আমি ব্যক্তিগত কোনো কাজ করি, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ ছাড়া অন্য কাজ করি, এমনকি যদি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়া কোনো নফল ইবাদত-বন্দেগিও করি তাহলে সেটিও আমার গুনাহের কারণ হবে এবং মানুষের হক নষ্ট করার সমান হবে।
আমরা সবাই অবগত আছি, বান্দার হক এমন একটি বিষয়, মানুষের পাওনা এমন একটি বিষয় যা আল্লাহ তায়ালাও মাফ করবেন না। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলে কারিম সা: বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তিন ধরনের মামলা হাজির করা হবে।
প্রথম প্রকার- কিছু থাকবে ক্ষমার অযোগ্য, সেগুলো শিরক সংশ্লিষ্ট অপরাধ; যেগুলো করে তাওবা ছাড়া মানুষ ইন্তেকাল করে। সেই মানুষগুলো অসীম কালের জন্য জাহান্নামে যাবে তাদের শিরক সংশ্লিষ্ট ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের কারণে।
দ্বিতীয় প্রকার- সেই মামলাগুলোকে আল্লাহ মাফ করবেন না যেগুলো বান্দার হক সংশ্লিষ্ট মামলা। যেমন- কেউ আমার কাছ থেকে টাকা পাবে বা আমি কারো হক নষ্ট করেছি, অধিকার নষ্ট করেছি বা আমানতের খিয়ানত করেছি। সে ক্ষেত্রে আল্লাহ এগুলো মাফ করবেন না। এসব অপরাধের মাফ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে নিতে হবে। আর কিয়ামতের ময়দানে কেউ কাউকে মাফ করবে না।
রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা কি জানো (কিয়ামতের মাঠে) কে সবচেয়ে বেশি অভাবী?’ সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, যার টাকা পায়সা নেই তাকেই আমরা অভাবী হিসেবে জানি। রাসূল সা: বললেন, ‘আমি অন্য অভাবীর কথা বলেছি। কিয়ামতের মাঠে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে অভাবী হবে যে অনেক আমল নিয়ে যাবে কিন্তু মানুষের হক ও পাওনা দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।’
প্রিয় পাঠক, তাই কর্মস্থলে আপনি ৮ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা বা ১২ ঘণ্টা- যেই সময় দেয়ার জন্য আপনি চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন সেই সময়ে আপনি যদি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে ব্যক্তিগত কাজ করেন, গেমস খেলেন বা বাসা বাড়িতে কথা বলে অফিসের সময় নষ্ট করেন তাহলে ওই সময়ের টাকাগুলো কিন্তু আপনার জন্য হালাল হবে না।
কিন্তু আমরা এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছি না। এটাকে হারাম মনে করছি না। এমনকি আপনি ডিউটিতে থাকাকালীন কাজ বাদ দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করলেও গুনাহগার হবেন। তবে হ্যাঁ! যদি ওই সময় কোনো কাজ না থাকে এবং যার অধীনে কাজ করছেন তার পক্ষ থেকে মৌন সমর্থন বা সরাসরি সমর্থন থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা।
এ জন্য কর্মস্থলে কাজে ফাঁকি দেয়ার মতো অপরাধ থেকে আমরা বেঁচে থাকি। এই অপরাধ থেকে মুক্ত কোনো মানুষ পাওয়া কঠিন। কারণ আমরা অফিসে কাজের মধ্যেই মোবাইল এলে কাজ রেখে কথা বলছি। কাজের মধ্যে থেকেই অনলাইনে অ্যাক্টিভ থাকছি। যদি সেটি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা সম্মতি ছাড়া হয় এবং তাদেরকে ফাঁকি দিয়ে কাজের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো কাজ করার চেষ্টা করি তাহলে সেটা সম্পূর্ণ হারাম হবে। আর এই হারাম আল্লাহ তায়ালাও মাফ করবেন না। এদিকে কিয়ামতের দিন বান্দাও মাফ করবে না। অবশ্যই আমরা ধরা পড়ে যাবো। তাই আসুন এই জঘন্য অপরাধ থেকে আমরা তাওবা করি। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান হলে তো তার সাথে কোটি কোটি মানুষের স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সুতরাং সবাই কিয়ামতের দিন আমার বিরুদ্ধে বাদি হয়ে দাঁড়াবে হয়তো। বান্দার হকের ওপর যে যত সাবধান হবেন তিনিই তত বেশি মুত্তাকি হবেন।
তৃতীয় প্রকার- এই মামলাটি আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার বিষয়। সেটা হলো- ইবাদত-বন্দেগিতে যদি ত্রুটি হয়। সেগুলোকে আল্লাহ চাইলে মাফ করে দিতে পারেন। আবার চাইলে শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু বাকি যে মামলা দু’টির বিষয়ে আমরা আলোচনা করলাম অর্থাৎ শিরকের অপরাধ এবং মানুষের হক এই দু’টি বিষয়ে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।
একই সাথে মালিক পক্ষের বা নিয়োগকর্তাদেরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। চুক্তির বাইরে জোর করে কর্মীকে দিয়ে কোনো কাজ করানো যাবে না। নির্ধারিত সময়ে বেতন পরিশোধ করতে হবে। অতিরিক্ত চাপ ও বেতন দিতে দেরি করাও জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। এই পাপও আল্লাহ ক্ষমা করবেন না; কারণ এটিও বান্দার হক।
প্রিয় পাঠক, আসুন কর্মস্থলে আমরা আমানতদারিতার পরিচয় দেই। সাবধান সচেতন হই। সতর্ক হই। ইতঃপূর্বে যেসব ভুল হয়ে গেছে সেগুলোর জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে যাদের অধীনে আমরা কাজ করছি তাদের কাছে আমরা ক্ষমা চেয়ে নেই। আল্লাহ আমাদের জীবনকে পরিচ্ছন্ন করার এবং আখিরাতে আল্লাহর সামনে জঘন্য সব মামলার আসামি হয়ে দাঁড়ানো থেকে বাঁচার মতো জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন।