ধর্মের উপাদানগুলো চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। কারণ ধর্মের উপাদানগুলোর মধ্যে কোনো সর্বজনীনতা নেই। কোনো একটি ধর্মের মধ্যে একটি উপাদান পাওয়া গেলে অন্য ধর্মের মধ্যে আবার তা অনুপস্থিত। তবে এসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যেসব উপাদানের মিল লক্ষ করা যায়, তা উল্লেখ করা হলো—
১. বিশ্বাস (Faith) : ধর্মের প্রথম ও প্রধান উপাদান হলো বিশ্বাস। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্ম কোনো না কোনো বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। তবে এই বিশ্বাস বিচিত্র রকমের। বিশ্বাস কখনো সর্বশক্তিমান এক ও একক আল্লাহকেন্দ্রিক হতে পারে, কখনো অতি জাগতিক কোনো সত্তাকেন্দ্রিক হতে পারে, হতে পারে হাজারো দেবতা কিংবা প্রাকৃতিক বিভিন্ন বস্তুকেন্দ্রিক। প্রত্যেক ধর্ম কোনো না কোনো বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সুতরাং বিশ্বাস ধর্মের একটি অতি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
২. আচার-অনুষ্ঠান (Rituals or Ceremonies) : ধর্মের একটি বিশেষ উপাদান হলো আচার-অনুষ্ঠান। প্রত্যেক ধর্মেই নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে। এটি ধর্মের বাস্তব দিক। যেমন—মুসলমানরা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে। হিন্দুরা পূজা অর্চনা, ধর্মসংগীত, গঙ্গাস্নান করে। বৌদ্ধ, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তাদের নিজ নিজ আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। কোনো ধর্মই খারাপ কাজ করতে বলে না।
৩. পবিত্র (Holy) : প্রত্যেক ধর্মেই কিছু পবিত্র বিষয় থাকে। ইসলাম ধর্মে মক্কা ও মদিনা নগরী এবং জমজমের পানিকে পবিত্র মনে করা হয়। হিন্দুরা তুলসীগাছ ও গরুকে পবিত্র মনে করে। শিখদের পবিত্র নগরী অমৃতসর। এভাবে অন্য সব ধর্মেই এ রকম পবিত্র বিষয় লক্ষ করা যায় ।
৪. অপবিত্র (Profane) : প্রত্যেক ধর্মে কিছু কিছু বিষয়কে অপবিত্র বলে মনে করা হয়। ইসলাম ধর্মে মদ্যপান, জুয়া খেলা, ব্যভিচার, সুদ খাওয়া, শূকরের গোশত ভক্ষণ ইত্যাদিকে অপবিত্র বলে গণ্য করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মে জীব হত্যা মহাপাপ। জৈন ধর্মে শুধু জীবন ধারণের প্রয়োজনে যতটুকু দরকার ততটুকু উদ্ভিদ ধ্বংস করার কথা বলা হয়েছে। ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মে এমন বিধি-নিষেধ খুব কম লক্ষ করা যায়।
৫. প্রতীক (Symbol) : ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো প্রতীক। কোনো চিহ্ন বা স্মারক যা কোনো বস্তু, শব্দ, ছবি, আকার, আকৃতি প্রভৃতি হতে পারে, যা স্বভাবগত নয় বরং প্রথাগত অর্থের বাহক তা-ই প্রতীক। অন্যভাবে বলা যায়, কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ বা বোধের পরোক্ষ প্রতিনিধিত্বকারী চিহ্ন হচ্ছে প্রতীক। প্রতীকের সাহায্যেই ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের চিত্র ফুটে ওঠে। প্রতীক দেখেই চিহ্নিত করা যায় ব্যক্তি কোনো ধর্মের অনুসারী। যেমন—রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট প্রতীক খ্রিস্ট ধর্মের পরিচয় বহন করে। এগুলো স্থান ও পাত্রভেদে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আবার কেশ, কংখ, কড়া, কৃপাণ ও কাচ্চা প্রভৃতি প্রতীক দেখে শিখ গুরু বা শিখ ধর্মের অনুসারীদের চিহ্নিত করা যায়।
৬. অভিজ্ঞতা (Experience) : ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকে পরিচালিত হয়। ধর্মীয় সম্প্র্রদায়ের লোকেরা তাদের বিশ্বাস উদ্ভূত নানা রকমের ভীতি-সম্ভ্রম, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-বিনয় মিশ্রিত অনুভূতির সংমিশ্রণ লালন করে। গান, বাদ্য, নৃত্য, বলিদান ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের অতীন্দ্রিয় অনুভূতি জন্মলাভ করে, যা সামাজিক পরিবেশ থেকে পাওয়া মিথ, উপাখ্যান ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হয়। ব্যক্তি সামাজিকীকরণের মাধ্যমে বা বংশ পরম্পরা যেসব অভিজ্ঞতা সঞ্চার করে তাও তার বিশ্বাস ও চেতনায় স্থায়ী রেখাপাত করে। এভাবে দীর্ঘদিনের প্রচলিত বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা ব্যক্তির ধর্মীয় জীবনকে প্রভাবিত করে।
৭. উপাখ্যান ও সাহিত্য (Myth and Literature) : উপাখ্যান ও সাহিত্য ধর্মকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। উপাখ্যান ও সাহিত্যে বর্ণিত বিষয়গুলো অনেক সময় মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পরিচালিত করে। মিথ হলো মানুষের কর্ম ও মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে জীবন্ত বিশ্বাসের বাস্তব চিত্র উপলব্ধি। কোনো একটি গল্প, কাব্যগাথা বা সংগীতের মাধ্যমে কোনো বিশ্বাস বা মূল্যবোধ উচ্চকিত হয়। দেব-দেবী, বীরপুরুষ, নবী-রাসুল প্রমুখের নানা বিস্ময়কর সব কর্মকাণ্ড হৃদয়গ্রাহী বর্ণনার মাধ্যমে মানবসমাজকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। এগুলো সমাজ থেকে সমাজে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, মুখ থেকে মুখে এবং স্মৃতি থেকে স্মৃতিতে স্থানান্তরিত হয়। তাই ধর্মকে সুসংগঠিত কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে মিথ ও সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন—ত্রিপিটক, বাইবেল, কোরআন প্রভৃতি।
৮. রহস্যময়তা (Mysticism) : পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মে রহস্যময়তা বা মরমিবাদ লক্ষ করা যায়। কারণ মরমিবাদের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সত্তা বা পরম সত্যের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। তবে সব ধর্মে এই পরম জ্ঞান লাভের পদ্ধতি এক রকম নয়। দীর্ঘ সাধনা, সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ, এলমে মারেফাত প্রভৃতির মাধ্যমে এই অতীন্দ্রিয় জ্ঞানার্জন করা সম্ভব। এ জন্য ভিন্ন ধর্মে সন্ন্যাস, ভিক্ষু, সাধু, পীর-দরবেশ প্রমুখ ব্যক্তির অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়।
৯. ধর্মগুরু (Religious Expert) : প্রত্যক ধর্মে ধর্মীয় গুরু বা পাঁচ অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। এঁরা যাজক, পুরোহিত, ঠাকুর, ওলামা-মাশায়েখ নামে পরিচিত। নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীদের মাঝে ধর্মীয় বাণী, আদেশ উপদেশ, আধ্যাত্মিক নির্দেশনা, দৈববাণী প্রভৃতি তাঁরা প্রচার করেন। শুধু তা-ই নয়, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান, উৎসব অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দান, বিবাহকার্য পরিচালনা, মৃত ব্যক্তির সৎকার প্রভৃতি কার্যাদিতে তাঁরা নেতৃত্ব প্রদান করেন। সমাজে এই শ্রেণির মানুষের মূল্য অনেক বেশি।
১০. উপাসনালয় (The place of worship) : ধর্মীয় উপাসনালয় বা প্রার্থনাগৃহ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রত্যেক ধর্মে নির্দিষ্ট ধর্মীয় উপাসনালয় আছে। যেমন—হিন্দুরা মন্দিরে, মুসলমানরা মসজিদে, খ্রিস্টানরা গির্জায়, ইহুদিরা সিনাগগে এবং শিখরা গুরুদুয়ারায় গিয়ে প্রার্থনা করে।
১১. অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস (Belief of Supernatural Powers) : প্রত্যেক ধর্মে কিছু অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস করা হয়। কোনো কোনো ধর্মে এই অতিপ্রাকৃত শক্তির আকার আছে আবার কোনো কোনো ধর্মে এর আকার নাই। কেউ কেউ মনে করেন, এটা মানবজীবনকে পরিচালিত করে। হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা বিভিন্ন দেব-দেবীতে বিশ্বাস করায় তারা দেব-দেবীর মূর্তি তৈরি করে পূজা অর্চনা করে। এ জন্য তাদের বহু ঈশ্বরবাদী বলা হয়। আবার কোনো কোনো ধর্মে এক ঈশ্বরে বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করা হয়। এদের একেশ্বরবাদী বলে। যেমন—ইহুদি, খ্রিস্টান, ইসলাম প্রভৃতি একেশ্বরবাদী ধর্ম।
১২. নৈতিক ভিত্তি (Moral Basis) : মানুষের অন্তর্নিহিত নৈতিকতাবোধ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে ধর্মীয় বিশ্বাস তৈরি হয়, তা হলো ধর্মীয় বিশ্বাসের নৈতিক ভিত্তি। অন্যভাবে বলা যায় যে নৈতিক চেতনাবোধ, নৈতিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিক অনুভূতিবোধ থেকে যে বিশ্বাস স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, তা ধর্মীয় বিশ্বাসের নৈতিক ভিত্তি। যেহেতু মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীব, সেহেতু মানুষের মধ্যে নৈতিক দায়িত্ববোধ রয়েছে। তবে এই নৈতিক দায়িত্ববোধ কারো বেশি আবার কারো কম। মূলত এই দায়িত্ববোধ থেকেই ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস স্থাপন করা হয়।