বছরের শুরুর সপ্তাহটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্থির হয়ে ওঠার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে পরাজয় না মানা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে এগিয়ে এসেছেন শতাধিক আইনপ্রণেতা। কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে জো বাইডেনকে বিজয়ী ঘোষণা করার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প-সমর্থক রক্ষণশীলরা ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে ব্যাপক সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হবে না। বিরাজমান পরিস্থিতিতে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে।
সিএনএন বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প তাঁর অবকাশ সংক্ষিপ্ত করে ফ্লোরিডা থেকে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ক্রিসমাস ও নিউ ইয়ার পালনের জন্য ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো-তে অবকাশ কাটাতে যান। নানা নাটকীয়তার পর সেখানে বসেই তিনি নাগরিক প্রণোদনা আইনে স্বাক্ষর করেন। ট্রাম্প এখন ৬ জানুয়ারি কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন সামনে রেখে ঝামেলা পাকানোর জোর প্রয়াস চালাচ্ছেন। অবকাশ সংক্ষিপ্ত করেই তিনি হোয়াইট হাউসে ফিরে আসছেন।
মিজৌরি থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান সিনেটর জোশ হাওলি ৩০ ডিসেম্বর ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ইলেকটোরাল ভোট গণনা নিয়ে যৌথ অধিবেশনে আপত্তি জানাবেন।
সিনেট ও কংগ্রেসের একজন করে সদস্য এমন আপত্তি উপস্থাপন করলে তা নিয়ে কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিক বিতর্কের সুযোগ আছে।
দ্য হিল নামের সংবাদমাধ্যম বুধবার পর্যন্ত ২১ জন এমন আইনপ্রণেতার তালিকা নিশ্চিত করেছে, যাঁরা কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে আপত্তি উপস্থাপনে যোগ দিচ্ছেন। এই সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়াস চলছে ট্রাম্প শিবির থেকে।
সর্বশেষ গণনায় দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেসের ৬ জানুয়ারির যৌথ অধিবেশনে শতাধিক আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের অবস্থানের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন।
সিনেটে রিপাবলিকান দলের নেতা মিচ ম্যাককনেল এ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিনেটর মিচ ম্যাককনেল ব্যক্তিগতভাবে দলের আইনপ্রণেতাদের এমন কাজে যোগ না দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
টেক্সাস থেকে নির্বাচিত সিনেটর জন কোরনাইন সাংবাদিকদের বলেছেন, এমন অনেক কিছুই চাওয়ার বিরুদ্ধে ঘটে যায়। আর এমন ঘটনা ঘটলেই তখন তা মোকাবিলা করতে হয়। প্রভাবশালী এই সিনেটর নিজের অবস্থানের বাইরে গিয়ে ট্রাম্পের ভুয়া দাবির পক্ষে দাঁড়াবেন না বলে আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা সিনেটর চালর্স শুমার মিজৌরির সিনেটর জোশ হাওলির বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। শুমার বলেছেন, ভোট নিয়ে কয়েক ডজন মামলায় হেরে যাওয়ার পর ট্রাম্পের নির্বাচনে কারচুপির আর কোনো দাবি ধোপে ঠেকে না। তিনি বলেন, কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ঠিকই প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনকে ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমলা হ্যারিসকে অনুমোদন দেওয়া হবে। এই দুজন সাংবিধানিক নিয়মেই ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করবেন।
সিনেটর শুমার বলেছেন, ‘এটা হচ্ছে আমেরিকা! নির্বাচন হয়েছে। এবং ফলাফল পাওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের যুক্তি সত্যের ওপর ভিত্তি করে, ষড়যন্ত্র বা কল্পনাপ্রসূত নয়।’
কংগ্রেসের উভয় কক্ষে আইনপ্রণেতারা আপত্তি ওঠালে প্রতিটি আপত্তির জন্য আলাদা বিতর্ক ও ভোট দেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্প–সমর্থকদের পক্ষ থেকে আভাস দেওয়া হয়েছে, তাঁরা অন্তত ছয়টি অঙ্গরাজ্যের ইলেকটোরাল ভোট নিয়ে এমন আপত্তি উপস্থাপন করবেন। সে হিসেবে ১২ ঘণ্টার মতো বিতর্ক হলে ৬ জানুয়ারি কংগ্রেস কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। বিতর্ক পরের দিন পর্যন্ত গড়াবে।
অনেকেই বিষয়টাকে সময়ক্ষেপণ ও রাজনৈতিক ‘সার্কাস’ মনে করছেন। কংগ্রেসে কোনো আপত্তি ভোটে গেলে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের হয় ট্রাম্পের পক্ষে বা বিপক্ষে সরাসরি দাঁড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে এমন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া আগে কখনো ঘটেনি। ফলে প্রথাবিরোধী এক পথে হাঁটছেন ট্রাম্প। এ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে।
একটি রক্ষণশীল ট্রাম্প-সমর্থক গোষ্ঠী রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। এই সমাবেশে সমর্থকদের যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন ট্রাম্প। সমাবেশে পুরো আমেরিকা থেকে সমর্থকদের জড়ো করার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে।
অন্যান্য রক্ষণশীল সংগঠনও ওই সমাবেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রস্তুতি নিয়ে যোগ দিচ্ছে। ট্রাম্প-সমর্থকদের বার্তায় বলা হচ্ছে, সবাই যেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
এমন বার্তাকে বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ। ওয়াশিংটন ডিসির পুলিশ কমিশনার হিসেবে বছরের শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন রবার্ট কন্টি। ৬ জানুয়ারির সমাবেশ নিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেছেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার সব ধরনের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে কোনো ধরনের সহিংসতাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর টুইট বার্তায় ইঙ্গিত দিয়েছেন, এমন সমাবেশ শান্তিপূর্ণ নাও হতে পারে।
৬ জানুয়ারি দেখা হবে—বলেও ট্রাম্প বারবার টুইট বার্তা ও ফেসবুক পোস্ট দিচ্ছেন। ট্রাম্প দাবি করছেন, এখন তাঁর হিসাবে জর্জিয়া ও পেনসিলভানিয়ায় বেশিসংখ্যক ভোট রয়েছে, যা ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অবশ্য ইলেকটোরাল কলেজের প্রত্যয়নের পর নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে যাওয়ার চিন্তা ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থক গোষ্ঠী ছাড়া আর কেউ করতে পারছে না।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ২০ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও তাঁদের প্রস্তুতির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন জো বাইডেন।
এমন বাস্তবতায় ৬ জানুয়ারি কোনো বিশৃঙ্খলা হলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মার্কিন জনগণের মনে।
৬ জানুয়ারি কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার পরদিনই ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের মধ্যপ্রাচ্য সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, মাইক পেন্সের বিদেশ যাত্রার সফরসূচি স্থগিত করা হয়েছে।
সব মিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে তাঁর সম্ভাব্য বেপরোয়া কাজকর্ম নিয়ে নানা আশঙ্কা জাগছে।