ইরান ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ শুরু করতে চায় বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। দেশটির শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিযাদে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় গত মাসে ইরানের পার্লামেন্ট পরমাণু সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি বিষয়ক একটি আইন পাস করে। জাতিসঙ্ঘের পরমাণু নজরদারি সংস্থা বলছে, এটি এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লঙ্ঘন।
একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি জন্য শতকরা ৯০ ভাগের বেশি মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। সে হিসেবে ইরানের কাছে ওই পরিমাণে ইউরেনিয়াম না থাকলেও ২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা চার শতাংশের নিচে রাখার কথা ছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে সরে আসায় ইরান চুক্তি লঙ্ঘন শুরু করে। তবে চুক্তিবদ্ধ বাকি রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীন সবাই আশা করে যুক্তরাষ্ট্র আগের অবস্থানে ফিরে আসবে।
ইরান কী পরিকল্পনা করছে?
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ইরান ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ পরমাণু সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে তাদের পরিকল্পনার কথা ফোর্ডো ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্লান্টকে জানিয়েছে। ইরানের ওই পরমাণু সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পটির জন্য দেশটির একটি পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত স্থাপনা রয়েছে।
সংস্থাটি আরো বলছে, ‘সংস্থাকে যে চিঠিটি ইরান দিয়েছে, সেখানে এই সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম কখন শুরু হবে তা বলা হয়নি।’
২০১৯ সালের পরমাণু চুক্তিতে শর্ত দেয়া হয়েছিল যে ইরান তিন দশমিক ৬৭ শতাংশের বেশি বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না, কিন্তু সেই শর্ত তারা লঙ্ঘন করেছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা তখন থেকেই চার দশমিক পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত স্থির রয়েছে।
দেশটির শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিযাদে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় গত মাসে করা নতুন বিল অনুযায়ী ইরানের তেল ও আর্থিক খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞাগুলো দুই মাসের মধ্যে সহজতর না করা হলে সরকার ২০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ আবারো শুরু করবে।
নাটানজ ও ফোর্ডোতে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় জাতিসঙ্ঘের পরিদর্শকদের যেন যেতে দেয়া না হয় সে বিষয়ে ওই আইনে আদেশ দেয়া হয়েছে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কী?
ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাস সেন্ট্রিফিউজে ঢুকিয়ে পরমাণু ফিশনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত আইসোটপ আলাদা করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করা হয়। এটি ইউ-২৩৫ নামে পরিচিত।
স্বল্প-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ইউ-২৩৫-এর ঘনত্ব সাধারণত তিন থেকে পাঁচ শতাংশ হয়।
বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় এই স্বল্প-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, জ্বালানী উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
অনেক বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব ২০ শতাংশ বা তার বেশি হতে পারে এবং এটি গবেষণার চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়। তবে অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি সমৃদ্ধ হতে হয়।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমাবদ্ধ করা কেন প্রয়োজন?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ক্রমবর্ধমান থাকলে দেশটির ‘ব্রেক-আউট টাইম’ কমে যেতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে ‘ব্রেক-আউট টাইম’ বলতে পারমাণবিক বোমা বিকাশ করতে যে সময় লাগে সেটাকে বোঝায়।
তবে ইরান জোর দিয়ে বলে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ইরান একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে এমন সন্দেহে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসঙ্ঘ ২০১০ সালে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
চুক্তি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কি রয়েছে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৫ সালে করা ছয় দেশের সাথে চুক্তিকে ‘অপচয় ও যাচ্ছেতাই’ বলে আখ্যায়িত করে ২০১৮ সালের মে মাসে সরে আসেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তিতে ফিরিয়ে আনবেন।
প্রেসিডেন্ট ওবামার শাসনামলে এ নিয়ে সমঝোতা হয়েছিল ইরান যদি ‘পরমাণু চুক্তির শর্তগুলো কঠোরভাবে মেনে চলে’ তবে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।
এদিকে বাইডেন, ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। তিনি গত বছর নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এটি কঠিন হতে পারে, কিন্তু ‘বিশ্বের ওই অংশে পারমাণবিক সক্ষমতা যেন শেষ হয়, সেটা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের কাজ।’ যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তিতে ফিরে এলে ইরান আবারো চুক্তিটি মেনে চলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
‘বাইডেন যদি ২০১৭ সালের মতো পরিস্থিতিতে ফিরে আসেন, তবে আমরাও তাই করব,’ ডিসেম্বরে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বক্তব্যে একথা বলেন।া