দেশের রাজনীতির আলোচিত চরিত্র প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী বেগম রওশন এরশাদ দলীয় নেতাকর্মীদের দেখা দেন না। তাদের সঙ্গে কথাও বলেন না। বাসায় নেতাকর্মীদের কেউ আসতে চাইলে এরও অনুমতি মেলে না। ব্যক্তিগত সহকারী ও বাবুর্চি ছাড়া রওশনের বাসায় প্রবেশের আর কারো অনুমতি মেলে না। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াতের বাইরে তার সারা দিন সময় কাটে বই পড়ে।
এছাড়াও ডাক্তারের পরামর্শে তার জীবনযাপন পদ্ধতিতেও কিছু পরিবর্তন এনেছেন বলে জানা গেছে। তবে রওশন এরশাদ আজ মঙ্গলবার সংসদের চলতি একাদশ অধিবেশনে যোগ দিতে পারেন। এর আগে এই অধিবেশন শুরুর দিনে তিনি করোনার কারণে স্বেচ্ছায় গৃহঅন্তরীণ অবস্থা থেকে সংসদে গিয়েছিলেন। অধিবেশনটি এতদিন চললেও আর সংসদমুখো হননি তিনি।
রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, করোনা মহামারী শুরু হওয়ার আগ থেকেই দেশের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চিফ পেট্রন রওশনের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না তারই দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূলের কর্মীরা পর্যন্ত। এ কারণে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। অনেকে এ ক্ষোভ প্রকাশ করতেও পিছপা হচ্ছেন না।
রওশন তার স্বামী এরশাদের মৃত্যুর পর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকেও একবারেই গুটিয়ে নেন নিজেকে। রওশনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে কোণঠাসা অবস্থায় পড়ে দলে পরিচিতি পাওয়া রওশনপন্থি নেতারা। তবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য অপর গ্রুপের নেতা দলের চেয়ারম্যান তারই দেবর জিএম কাদেরের সঙ্গে ভিড়ে যায় রওশনপন্থিরা। তারাই এখন পার্টির শীর্ষ পদ-পদবিতে রয়েছেন। তবে কমিটি থেকে বাদপড়া পার্টির ত্যাগী শীর্ষ নেতারা এখন কাদেরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে জাপার পাল্টা কমিটি দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখছেন।
পার্টির একটি সূত্র জানায়, করোনা নয়, বরং জাতীয় পার্টিতে রওশন এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এ কারণে অনেকটা অভিমান করে ঘর থেকে বের হন না। দলের কোনো কর্মকাণ্ডেও নিজেকে জড়ান না। বেঁচে থাকতে যে কোনো সংকটেই শেষ পর্যন্ত স্ত্রী রওশনের পাশে দাঁড়াতেন প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৪ মে-তে পার্টির অষ্টম কাউন্সিলে ভাই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করলে ক্ষিপ্ত হন রওশন। তাই ভাইয়ের ওপরে রওশনকে রাখতে তৈরি করেন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান পদ। এতে রওশনর এরশাদের ক্ষোভের প্রশমনও হয়।
এরশাদ জীবিত থাকতে যে কোনো কারণেই যদি দেবর-ভাবির মধ্যে বিরোধ দেখা দিত, তা কখনোই প্রকাশ্যে আনতে দিতেন না। নানাভাবে কৌশল অবলম্বন করে সন্তুষ্ট রাখতেন স্ত্রী ও ভাই দুজনকেই। এরশাদের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর দলের নবম কাউন্সিলে নিজের জন্য তৈরি ‘প্রধান পৃষ্ঠপোষক’ বা ‘চিফ পেট্রন’ পদটি পছন্দ না হওয়ায় এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী মহাসচিব নির্বাচন না করতে পারায় ক্ষুব্ধ হন রওশন। একারণে সেই সময় কাউন্সিলেই যোগ দেননি তিনি।
কাউন্সিলের আগে হওয়া কোনো সভাতেও অংশ নেননি তিনি। এমনকি ছেলে সাদ এরশাদকেও পাঠানটি জাতীয় কাউন্সিলে। কোনো বাণীও দেননি। কিন্তু তখন আর সংকট সমাধানে কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি স্বামী এরশাদের মতো রওশনের পাশেও দাঁড়াননি কেউ। কাউন্সিল হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত জাপার কোনো সাংগঠনিক সভা-সমাবেশে যোগ দিননি বেগম রওশন।
এতদিন যেসব নেতাকে রওশনের পক্ষ হয়ে প্রকাশ্যে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও তার অনুসারী নেতাদের প্রকাশ্য বিরোধিতা করতে দেখা গেছে, এবার রওশনের ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় তারাও। কাউন্সিলে নতুন পদ পেয়ে বেশ উৎসাহ প্রকাশ করতে দেখা গেছে রওশনপন্থিদের অনেককেই। জিএম কাদেরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পদ-পদবি ভাগিয়ে নেন তারা। তারপরও তারা গত দেড় বছর যাবত রওশনের সঙ্গে যোগযোগের বহুবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এসব ক্ষোভ থেকে তাদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ রাখেননি জাতীয় পার্টির এই প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
বেগম রওশন এরশাদ কেন নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন না- এমন প্রশ্নে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এস এম ফয়সল চিশতী সোমবার বিকেলে বলেন, ‘ম্যাডাম ভালো আছেন। করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে গিয়েই এমন অবস্থা হয়েছে। তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেন না। বাসায়ও কাউকে ঢুকতে দেয়া হয় না’। তবে ফয়সল চিশতী জানান, টেলিফোন বা মুঠোফোনে দলের গুরুত্বপূর্ণ কেউ কল দিলে তিনি কথা বলেন। এছাড়া অন্য সকলের সঙ্গে বেগম রওশন এরশাদ আপাতত কথা বলা থেকে বিরত আছেন।
তবে বেগম রওশন এরশাদের মান-অভিমান ভাঙাতে জাতীয় কাউন্সিলে ‘রওশনপন্থি’ হিসেবে পরিচিত নেতাদের দলের মূল নেতৃত্বেও আনা হয়। গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নিয়োগ দেয়া একজন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও ছয়জন কো-চেয়ারম্যানের মধ্যে রওশনপন্থি নেতা রয়েছেন তিনজন। এমনকি প্রথমে বিরোধিতা করলেও পরে রংপুরে সাদ এরশাদের মনোনয়নও দেন জিএম কাদের।
জাপার নেতারা বলেন, বিগত সম্মেলনে রওশন এরশাদ না যাওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি থাকলেও সেসময় নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। সে সম্মেলনে যুব সংহতির ব্যানার ছাড়া সম্মেলনের কোথাও কোনো ব্যানার-ফেস্টুনে রওশনের নাম ও ছবি ছিল না। এরশাদের ছবির পাশাপাশি শোভা পায় ভাই জি এম কাদেরের ছবি। এমনকি সম্মেলনে রওশনপন্থি এক নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া হলেও ওই নেতা বক্তব্যে সব বিরোধ ভুলে এখন থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে দল চালানোর ঘোষণা দেন। গঠনতন্ত্র সংশোধন করে প্রধান পৃষ্ঠপোষক পদ সৃষ্টি করে তাতে মনোনয়ন দিয়ে রওশনকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেন দলের নেতারা। তাদের মতে, প্রধান পৃষ্ঠপোষক পদটি আলঙ্কারিক। দলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দলের মূল কর্তৃত্ব জি এম কাদেরের হাতেই। তাই তিনি দল পরিচালনা করছেন সেভাবে।
রওশন এরশাদ কি তা হলে একা হয়ে গেলেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘জাপার একটি পক্ষ সব সময় ম্যাডামকে (রওশন এরশাদ) ঘিরে দলের মধ্যে রাজনীতি করত। অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করত। ম্যাডাম তাদের কথামতো চলতেন। এবার ওই নেতারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে দলের মূল নেতৃত্বের পক্ষে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফলে রওশন এরশাদের পক্ষে এখন আর কেউ রইল না’।
এই নেতা আরো বলেন, ‘ম্যাডাম অসুস্থ। দল চালানোর মতো শারীরিক সামর্থ্য তার নেই। তিনি কোনো অনুষ্ঠানে আধ ঘণ্টার বেশি বসতে পারেন না। অঞ্চলভিত্তিক রাজনীতিতে তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। তার ছেলেটাও রাজনীতি বোঝেন না। রংপুরে তাকে জিতিয়ে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তাছাড়া তিনি দীর্ঘদিন ধরেই পার্টির কোনো সভাতে আসেন না। পার্টির কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। তবুও তাকে সম্মান করে বিরোধীদলীয় নেতা করা হয়েছে। দলে প্রধান পৃষ্ঠপোষক পদ দেয়া হয়েছে। তার উচিত সব মেনে নিয়ে যতদিন বেঁচে আছেন দলের সঙ্গে থাকা।
নেতারা জানান, দলে পদ নিয়ে শুরু থেকেই রওশনের সঙ্গে বিভিন্ন নেতার বিরোধ দেখা দেয়। স্বয়ং এরশাদের বিপক্ষে গিয়েও উনি একবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত ২০১৬ সালে পার্টির অষ্টম কাউন্সিলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দলে কো-চেয়ারম্যানের পদ তৈরি করে তাতে ভাই জি এম কাদেরকে আসীন করেন। স্ত্রী রওশন এরশাদ তাতে ক্ষিপ্ত হলে পরে তার জন্য এরশাদ তৈরি করেন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যানের পদ। ঠিক তখন থেকেই রওশন আর জিএম কাদেরের দ্ব›দ্ব আরো প্রকাশ্যে আসে।
নেতারা বলেন, ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের আগে এরশাদ ভোটে যাবেন না ঘোষণা দিয়ে দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার নির্দেশের পরও রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি অংশ ভোটে যায়। নির্বাচনে ৩৪টি আসনে জয়ী জাতীয় পার্টির এই নেতাদের মধ্যে এরশাদের প্রভাব ছিল খুবই কম। সংসদীয় দলের সভায় এরশাদকে বাদ দিয়ে রওশনকে নেতা বানান তারা।