শীতের দুপুরে বাড়ির উঠোনে বা ছাদে বসে পিঠে রোদ লাগিয়ে কিংবা অফিসের অবসরে ব্যাগ থেকে উল বোনার কাঁটা বের করে কর্মজীবী নারা আপন মনে বুনে চলেছেন সোয়েটার, টুপি বা মাফলার—এমনটি আর চোখে পড়ে না। দু-তিন দশক আগে এ ছিল চেনা দৃশ্য। দুপুরে খাবারের পর কিশোরী থেকে বৃদ্ধার হাতে উঠত উলের কাঁটা। বাড়ির ছোট বড় এমনকি আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশীর জন্যও বোনা হতো উলের পোশাক। এ ছিল নারীদের শখ, শিল্পও।
খুব মনে পড়ে, আমাদের পিরোজপুরের রায়বাহাদুর রোডের বাসার পাশে ছিল শেফালী আপাদের বাসা—তিনি ছিলেন আমার বড় বোন বকুল আপার বান্ধবী। শেফালী আপাকে দেখতাম, দুপুরে খাবার পর কাঁটা দিয়ে উলের সোয়েটার বা মাফলার বুনতে বুনতে আমাদের বাসায় আসতেন। তাঁর বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করতে করতে আপনমনে শেফালী আপা সোয়েটার বুনেই চলতেন!
মধ্যশিক্ষা পর্ষদের কর্মশিক্ষা বিষয়েও অনেকেই এই হাতের কাজ বেছে নিত। পরে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও হাতের কাজ বন্ধ হতো না। বাজার থেকে নানা রঙের উলের গোলা ও ভিন্ন ভিন্ন নম্বরের কাঁটা কিনে এনে নানা নকশায় বোনা হতো শীতের পোশাক। এমনও দেখা গেছে, একটি পোশাক তিন প্রজন্ম ব্যবহার করেছে।
সোয়েটার বুনতে প্রথম দিকে ছিল আ্যাালুমিনিয়ামের তৈরি একমুখো কাঁটা, যার একপ্রান্তের চ্যাপটা অংশে কাঁটার নম্বর লেখা থাকত। দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করে ৫ থেকে ১২ নম্বর; পরে দু মুখ খোলা কাঁটার ব্যবহার শুরু হলো। এলো কুরুশ কাঁটাও—এখনো এর ব্যবহার আছে কোথাও কোথাও। তবে উল বোনার অভ্যাস বাঙালি জীবন থেকে অনেকটাই চলে গেছে।
এখন বাজার কারখানায় বোনা শীতকালীন পোশাকে সয়লাব। সস্তা রকমারি ডিজাইন। কেন হাতে বোনা পোশাক লোকে ব্যবহার করবে? অবসর সময় গ্রাস করেছে মোবাইলফোন আর সিরিয়াল। আগে তো বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও। তাতে কান রেখেও হাত চালাতে অসুবিধে হতো না। আজ নারীরা হাতের কাজ কিছু করেন না, তা নয়। কিন্তু ঝোঁকটা চলে গেছে! চাহিদাও নেই।