প্রতিটি ধর্মে বর্ণিত আছে যে, আদি মানব-মানবী থেকেই মানবজাতির বিস্তার ঘটেছে এবং আমাদের আদি মাতা-পিতার জন্ম হয়েছে জান্নাত বা স্বর্গে। আধুনিক অনেক বিজ্ঞানীও ধারণা করেন যে, একমাত্র মানুষ ব্যতীত অন্য সব প্রাণীর জন্ম হয়েছে দুনিয়ার মাটিতে। কিন্তু আদি মানব এসেছে অন্যগ্রহ থেকে। আহলি কিতাব বা ইহুদি-খ্রিষ্টান এবং ইসলাম মতে, আদি পিতার নাম আদম আ: আর আদি মাতা হচ্ছেন হাওয়া আ:, যা ইহুদিদের কাছে হবা নামে পরিচিত। তবে সনাতন ধর্মানুযায়ী আদি পিতার নাম হলো ‘মনু’ যা থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘মানুষ’ শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। আর তাদের মতে, আদি মাতার নাম হচ্ছে শতরূপা বা অদিতি। তবে ইহুদি, খ্রিষ্টান বৌদ্ধ, হিন্দুসহ প্রধান প্রধান ধর্মগ্রন্থেই হজরত মুহাম্মদ সা:-এর সর্বশেষ নবী বা কল্কি অবতার হওয়ার ব্যাপারটি প্রমাণিত। এ থেকে এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, সব ধর্মের শুরুই হয়েছিল একত্ববাদী ইসলাম দিয়ে, যা পরবর্তীতে বিকৃত হয়েছে এবং নবী-রাসূলগণ অবতার, ভগবান, ঈশ্বর বা গড নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ফলে সব ধর্মের দাবি অনুযায়ী ইসলামে আত্মসমর্পণ ব্যতীত কোনো মানুষেরই পরকালীন মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ জান্নাতে আদমকে আ: আদি মানুষ এবং তার প্রতিনিধি হিসেবে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছিলেন। তখন তিনি নবী ছিলেন না কিংবা নবুয়ত লাভ করেননি। কেননা পবিত্র জান্নাত যেমন নবী-রাসূলের নবুয়তি দায়িত্ব পালনের জায়গা হতে পারে না। নবী-রাসূলগণের খেলাফতি দায়িত্ব পালন আর শয়তানের শয়তানির জায়গা হচ্ছে একমাত্র দুনিয়া। এ জন্য দুনিয়ায় প্রেরণের সময়ই আদমকে আল্লাহ রাসূল হিসেবে বাছাই করে নেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, কিন্তু (আদমের ক্ষমা প্রার্থনার পর) তার মালিক তাকে (তার বংশধরদের পথপ্রদর্শনের জন্য রাসূল হিসেবে) বাছাই করে নিলেন, তার ওপর ক্ষমাপরবশ হলেন এবং তাকে সঠিক পথনির্দেশ দিলেন। (সূরা ত্ব-হা, আয়াত : ১২২)।
আবার নবী-রাসূলরা কখনো শয়তানের প্ররোচনায় যেমন পথভ্রষ্ট হন না, তেমনি তারা আল্লাহর নির্দেশ-অমান্যের পাপ-অপরাধও করতে পারেন না। তবে সাময়িক ভুলত্রুটি করলেও আল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সংশোধন করে দিয়ে থাকেন। জান্নাতে অবস্থানকারী আদম-হাওয়া আ: তখন পর্যন্ত নবী-রাসূল ছিলেন না বলেই মানবীয় দুর্বলতাসংবলিত মানুষ হিসেবে শয়তানের প্রতারণায় আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ-অমান্যের জুলুম করেছিলেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাদের প্রতি আগেও সাবধানবাণী করেছিলেনÑ ‘আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী তোমরা দু’জনাই এ জান্নাতে থাকো। যেখানে যা তোমাদের ইচ্ছা হয় খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছে যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’ (সূরা আরাফ, আয়াত ১৯)।
আল্লাহ আরো বলেন, ‘আমি আদমকে বললাম, এ (শয়তান) হচ্ছে তোমার ও তোমার (জীবন) সাথীর দুশমন; সুতরাং (দেখো) এমন যেন না হয় যে, সে তোমাদের উভয়কেই জান্নাত থেকে বের করে দেবে এবং তুমি দারুণ দুঃখকষ্টে পড়ে যাবে। (অথচ) এখানে তুমি কখনো ক্ষুধার্ত হও না, কখনো পোশাকবিহীনও হও না! তুমি (কখনো) এখানে পিপাসার্ত হও না, কখনো রোদেও কষ্ট পাও না!’ (সূরা ত্বহা আয়াত ১১৭-১১৯)।
শয়তানের প্রথম দুই কাজ ‘মিথ্যাচার-ধোঁকাবাজি’ : জান্নাতে অবস্থানকারী আজাজিল ফেরেশতা আল্লাহর নির্দেশ-অমান্যের মাধ্যমে শয়তানের পরিণত হওয়ার পর তার সর্বপ্রথম পাপ কাজই ছিল মিথ্যাচার ও প্রতারণা। এ ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন দেখা যাকÑ ‘অতঃপর শয়তান উভয়কে প্ররোচিত করল, যাতে তাদের অঙ্গ, যা তাদের কাছে গোপন ছিল, তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়। সে বলল, তোমাদের পালন কর্তা তোমাদের এ গাছ থেকে নিষেধ করেননি, তবে তা এ কারণে যে, তোমরা না আবার ফেরেশতা হয়ে যাও কিংবা হয়ে যাও এখানকার চিরকালের বসবাসকারী। শয়তান তাদের কাছে কসম খেয়ে বলল, আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাক্সক্ষী।’ (সূরা আরাফ, আয়াত ২১-২১) ‘(কিন্তু এত সাবধান সত্ত্বেও) অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিলো; সে (তাকে) বলল, হে আদম, আমি কি তােমাকে অনন্ত জীবনদায়িনী একটি গাছের কথা বলব এবং বলব এমন রাজত্বের কথা, যার কখনো পতন হবে না! (সূরা ত্বহা, আয়াত ১২০)
শয়তানের তৃতীয় পাপ কার্য হচ্ছে উলঙ্গপনার প্রবর্তন : আল্লাহ যেমন জানতেন যে, নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলেই তাদের শরীরে মলমূত্রের উদ্রেক হবে, তেমনি শয়তানও তা জানত যে, নিষিদ্ধ ফল খেলে তাদের জান্নাতি পোশাক খুলে গিয়ে তারা উলঙ্গ হয়ে পড়বে। ফলে তাদের আর জান্নাতে থাকাও সম্ভব হবে না। আর এই কাজটির জন্যই শয়তান কেয়ামত পর্যন্ত তার আয়ুষ্কাল চেয়ে নিয়েছিল। আর তার প্রথম চ্যালেঞ্জর বাস্তবায়ন হিসেবে আদম-হাওয়াকে পার্থিব গুণসম্পন্ন নিষিদ্ধ ফল খাইয়ে সরাসরি উলঙ্গ করেছিল। এই ব্যাপারটি আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন এভাবে- ‘অতঃপর তারা উভয়ে ওই ফল খেলো, সাথে সাথেই তাদের শরীরের লজ্জাস্থানসমূহ তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা (লজ্জায় তাড়াতাড়ি করে) জান্নাতের (বিভিন্ন গাছের) পাতা দ্বারা নিজেদের লজ্জাস্থান ঢাকতে শুরু করল, এভাবেই আদম তার মালিকের নাফরমানি করল এবং সে (সাময়িকভাবে) পথভ্রষ্ট হয়ে গেল। (সূরা ত্বহা, আয়াত ১২১)
এ থেকে এটাও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, শুরু থেকেই শয়তান নর-নারীর মধ্যে অশ্লীলতা ও উলঙ্গপনার সৃষ্টি করাটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। আর মানুষের মধ্যে সব প্রকার অন্যায়-অপকর্ম সৃষ্টিতে তার মূল হাতিয়ারই হচ্ছে মিথ্যাচার ও প্রতারণা। এ জন্যই রাসূল মিথ্যাচারকে সব পাপের জননী বলে অভিহিত করেছেন। তা ছাড়া প্রতারণা ও মিথ্যা সাক্ষ্যদানও হচ্ছে কবিরা গুনাহ, যা মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। তাই দেখা যায়, দুনিয়ায় নর-নারীর বৈধ ও অবৈধ সম্পর্ককে ঘিরেই যত শান্তি-অশান্তির ঘটনা ঘটে থাকে। বিশেষ করে নর-নারীর পর্দাহীনতা অর্থাৎ বেলাল্লাপনা, অশ্লীলতা, উলঙ্গপনার প্রভাবেই সমাজে ইভটিজিং, ধর্ষণ, প্রেমজনিত হত্যাকাণ্ড, পরকীয়া, অবৈধ সম্পর্ক, জেনা ইত্যাদি বিস্তার লাভ করে থাকে।
অশ্লীলতার আরেক নাম ভালোবাসা-দিবস : পৃথিবীর যেসব দেশে লিভটুগেদার কিংবা নারী-পুরুষের বিবাহবহির্ভূত অবাধ সম্পর্ককে পাপ-মন্দ মনে করা হয় না, সেসব দেশেও দেখা যায়, এক মিনিট বিদ্যুৎ চলে গেলেই শত শত নারী ধর্ষিত হয়ে থাকে। মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও বিবাহবহির্ভূত প্রেম, পরকীয়া, অবৈধ সম্পর্ক, অশ্লীলতা, জেনা ইত্যাদি অসামাজিক কার্যকলাপ বলে চিহ্নিত হলেও শয়তানরূপী কিছু মানুষের প্ররোচনায় অনলাইন ও অফলাইনে অশ্লীলতা ব্যাপকভাবে চর্চিত হচ্ছে। অনলাইন, ওয়েবসাইট, পেজ ইত্যাদি ছাড়াও মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, সিডি-ডিভিডি ইত্যাদির মাধ্যমে অশ্লীলতা একটি অপ্রতিরোধ্য ব্যাধি হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিবাহিত-অবিবাহিত শিশু-যুবক নির্বিশেষে এসবের চর্চা করতে গিয়ে বেসামাল হয়ে পড়ছে এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য পন্থায় ইভটিজিং, ধর্ষণ এবং ধর্ষণজনিত হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত করতে বাধ্য হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাভিত্তিক ভ্যালেন্টাইন ডে, বৈশাখী উৎসব, পার্কসমূহে প্রেমিক-প্রেমিকা, নর-নারীর অবাধ মিলনমেলা, ক্লাবভিত্তিক বিভিন্ন নগ্ন ও উদ্দাম পার্টি বন্ধের পাশাপাশি মাদকমুক্ত পরিবেশই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বখে যাওয়া নর-নারীদের।
১৯৯৩ সাল থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে এ দেশে ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। এ দিনটি জাতীয়ভাবে ‘সুন্দরবন দিবস’ও। সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের এ দিনটিকেইও সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল। অথচ ১৯৯৩ সালে একজন সাংবাদিক ভ্যালেন্টাইন ডে-কে বাংলাদেশ মিথ্যাচারের মাধ্যমে ভালোবাসা দিবস নামে প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছেন, যা আজ প্রেম, অবাধ মিলন, অশ্লীলতার মাধ্যমে নর-নারীদের ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করছে এবং সমাজে ইভটিজিং, ধর্ষণ, আর ধর্ষণজনিত হত্যাকাণ্ড ও পরকীয়ার প্রসার ঘটাচ্ছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক একজন প্রার্থীর হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। তারাই হত্যাকাণ্ডের স্মরণে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে পালিত হয়ে থাকে, যদিও ব্যাপক অশ্লীলতার কারণে অনেক দেশে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।