শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন উত্তম গুণ। এটি বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অধিক নিয়ামত বা অনুগ্রহ অর্জনে গুরুতপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দান করেছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ দিয়েছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্টবস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ (সূরা ইসরা-৭০)
আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন, ‘আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে।’ (সূরা ত্বিন-৪) আমরা যদি শুধু এ নিয়ামতটির শুকরিয়া আদায় করণার্থে সারাজীবন আল্লাহর গুণগান গাই, তবু কী আমাদের পক্ষে তা আদায় করা কোনোভাবে সম্ভব হবে? সেই সাথে দান করেছেন অসংখ্য-অগণিত নিয়ামত। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো, তবে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা নাহল-১৮)
বস্তুত আল্লাহ তায়ালা সব সৃষ্টিকে মানুষের সেবা ও উপকারার্থে সৃষ্টি করেছেন। চাই মানুষ আল্লাহর অনুগত হোক বা অবাধ্য। অবশ্য আল্লাহর কাছে তার প্রিয় বান্দাদের জন্য পরকালীন জীবনে যা রয়েছে তা অনেক শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালোবাসা, নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদিপশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহ, তার কাছে রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।’ (সূরা আলে ইমরান-১৪)
করুণাময় আল্লাহ তায়ালার দয়া-অনুগ্রহ যদি শুধু তার অনুগত বান্দাদের মধ্যে সীমিত থাকত, তবে এ পৃথিবী শুধু তার অনুগত বান্দাদের দিয়ে পরিপূর্ণ থাকত। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। দুনিয়ায় আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাজি মুসলিম-অমুসলিম, মুত্তাকি-পাপী সবার জন্য সমান। পার্থিব জীবনে আল্লাহর দয়া-অনুগ্রহ উন্মুক্ত, অফুরান। আর এ জন্যই তিনি রাহমান।
সৃষ্টির সূচনা থেকে নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত আমরা আল্লাহর নিয়ামতরাজির মধ্যে ডুবে আছি। এসব নিয়ামত আমাদের কষ্টার্জিত নয়; না চাইতেই পেয়েছি। তাই আমাদের বিবেক-হৃদয়ে টনক নড়ে না। আমরা ঘূণাক্ষরেও ভাবি না। অথচ আমরা যদি আল্লাহ প্রদত্ত কোনো একটা নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে গোটাজীবন সেজদায় পড়ে থাকি তবুও তা যথেষ্ট হবে না। আবার যদি শুকরিয়া আদায় না করি, তাতেও আল্লাহর বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না। বরং এসব বিষয়ে মানুষের একটু চিন্তাভাবনা, শুকরগুজারি তার নিজের জন্যই মঙ্গলজনক হয়। জীবনে আল্লাহর আরো অনেক অনুগ্রহ প্রাপ্তির দ্বার উন্মোচনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আমার নিয়ামতরাজির কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো, আমি অবশ্যই অবশ্যই আমার নিয়ামত বাড়িয়ে দেবো।’ (সূরা ইবরাহিম-৭)
বর্ণিত আয়াত মানুষকে শিক্ষা দেয়Ñ ছোট-বড় প্রতিটি নিয়ামতের জন্য আল্লাহর দরবারে সন্তুষ্টচিত্তে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সুস্থতার জন্য আন্তরিকতার সাথে আলহামদুলিল্লাহ বলা এবং সময়কে অযথা নষ্ট না করে আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করা। ধন-সম্পদের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি সাধ্যমতো আল্লাহর পথে তা ব্যয় করা। অর্থাৎ, প্রতিটি নেয়ামত অনুযায়ী শারীরিক, মানসিক, আর্থিকÑ সব দিক থেকে শুকরিয়া আদায় করা।
ইসলামের শিক্ষা হলোÑ সুখ-দুঃখ, সচ্ছলতা-দারিদ্র্য, সুস্থতা-অসুস্থতা তথা সর্বাবস্থায় শোকরগুজার থাকা। আল্লাহর ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শ ও নীতি হচ্ছেÑ ‘আলহামদুলিল্লাহি আলা কুল্লি হাল’ অর্থাৎ সর্বাবস্থায় প্রশংসা শুধু আল্লাহর জন্য। এর তাৎপর্য হলোÑ সুখে পড়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আল্লাহকে ভুলে না যাওয়া বরং সামগ্রিকভাবে শুকরিয়া আদায় করা এবং দুঃখ-কষ্টে পতিত হলে হতাশ বা ধৈর্যহারা না হয়ে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। তথা সর্বাবস্থায় আল্লাহর ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং নিয়ামতরাজির কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা। এমন অবস্থার অনেক ফজিলতও রয়েছে। এমন মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হন এবং নিয়ামত বা অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেন।
আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করা জঘন্যতম পাপ। এমন কাজ না করতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা আমার নিয়ামতসমূহকে অস্বীকার করো, তবে জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আমার শাস্তির বিধান অবশ্যই কঠিন।’ (সূরা ইবরাহিম-৭)
সমাজ জীবনে আমরা একে অন্যের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে উপকৃত হই। সহযোগিতা, সহানুভূতি লাভ করি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, উপকারী ব্যক্তির প্রতি সাধ্যানুযায়ী আমরাও অনুরূপ আচরণ করা। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পাশাপাশি তার উপকার করা, কল্যাণকামী হওয়া এবং কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট থাকা। এগুলো আমাদের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে না, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতাও আদায় করে না।’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)
সুতরাং আমরা আল্লাহর দরবারে, তাঁর নিয়ামতরাজি এবং আমাদের নেককাজের জন্য প্রাণভরে অধিকহারে শুকরিয়া আদায় করব। উপকারী মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব এবং কল্যাণকামী হবো। আল্লøাহ আমাদের তাঁর শোকরগুজার বান্দা হিসেবে কবুল করুন এবং আমাদের জন্য তাঁর নিয়ামতসমূহ বাড়িয়ে দিন। আমিন।