রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ন

থেমে নেই বাসের রেষারেষি, বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ৩ মার্চ, ২০২১
  • ৬২ জন নিউজটি পড়েছেন
পরিবহন

৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টা। রাজধানীর সাইনবোর্ড-সাভারের নবীনগর রুটে চলাচলকারী লাব্বাইক পরিবহনের একটি বাস মানিকনগর বাসস্ট্যান্ডে থামে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাব্বাইক পরিবহনের আরেকটি বাস আসে। এটাকে দেখে আগের বাসটি দ্রুতগতিতে টান দেয়। পরের বাসটিও দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে। টিটিপাড়া সিগন্যালে আগের বাসটি অনেকটা বাঁকা করে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে যায়, যাতে পেছনের বাসটি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে না পারে। সিগন্যাল ছাড়তেই দুটি গাড়ি পাশাপাশি বেপরোয়া গতিতে যেতে থাকে। বাসে ঘষাও লাগে কয়েকবার।

বাসাবোর বৌদ্ধমন্দির স্টপেজে সামনের গাড়িটির মাথা বাঁকা করে রেখে রাস্তা প্রায় আটকে (যেন পেছনের গাড়িটি সামনে উঠতে না পারে) রেখে যাত্রী তুলতে থাকে। যেটুকু যাওয়ার জন্য ফাঁকা রাস্তা ছিল পেছনের গাড়িটি প্রচণ্ড গতিতে সেই স্থান দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়। প্রচণ্ড শব্দে থেমে থাকা গাড়ির ডান পাশের লুকিং গ্লাস ভেঙে চলে যায় পেছনের গাড়িটি। থেমে থাকা গাড়িটি প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খায়। গাড়ির ভেতরের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

কোনো গাড়ি রেষারেষি করে বেপরোয়া গতিতে চালালে আমরা দুটি গাড়িকেই থামাই। এরপর ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৮৭ ধারায় মামলা দেই। এ ধারায় আড়াই হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে

শুধু এই একটি ঘটনা নয়। রাজধানীর সড়কে বাসের এমন বিপজ্জনক ও ভীতিকর প্রতিযোগিতা দেখা যায় হরহামেশা। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। একই রুটের বাসের মধ্যে এমন রেষারেষিতে প্রায়ই জীবন যাচ্ছে যাত্রী ও পথচারীদের। কেউ কেউ হাত-পা হারিয়ে হচ্ছেন পঙ্গু। কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর বিষয়টি আলোচনায় এলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, এখনো চলছে এমন রেষারেষি।

যাত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একই রুটের কিংবা একই কোম্পানির দুটি বাস কাছাকাছি এলে যাত্রী তুলতে এই রেষারেষি শুরু হয়। এক বাস আরেক বাসকে পেছনে ফেলে আগে গিয়ে যাত্রী তুললে দুটি বাসই বেপরোয়া গতিতে এগিয়ে যায়। এতে অনেক সময় দুই বাসের মাঝখানে পড়ে পথচারী বা মোটরসাইকেল আরোহীদের হতাহতের ঘটনা ঘটে।

অনেক সময় দুই বাসের মাঝে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে

আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা করা হবে। কিন্তু এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই

সংশ্লিষ্টরা জানান, মালিকদের দৈনিক জমা তুলতে বাসচালকরা এমন ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা ব্যবস্থা চালু এবং এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান না নিলে এমন অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে না বলে মনে করেন যাত্রী কল্যাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শ্রাবণ ট্রান্সপোর্টের (ঢাকা-মেট্রো-ব-১৪১৯১২) চালক মো. জীবন বলেন, ‘অনেক সময় যাত্রী কম থাকে। মালিকদের দৈনিক জমা তোলার চাপ থাকে। মালিককে প্রতিদিন এক হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়, নানা ধরনের চান্দা (চাঁদা) দিতে হয়। এইডা দিয়া আমাগো সংসারও চলে। তাই যাত্রী ধরতে ড্রাইভাররা পাড়াপাড়ি (রেষারেষি) করে। আয়-ইনকাম ভালো না, বাধ্য হয়ে এগুলো করতে হয়।’

আরেক চালক মো. মনির বলেন, ‘গাড়ি বেশি ও যাত্রী কম থাকলে পাড়াপাড়ি হয়। সব বাসই এগুলো (প্রতিযোগিতা) করে। গাড়িগুলোর বডিতেই সেই চিহ্ন আছে, চাইয়া দেখেন। পুলিশ দেখলে জরিমানা করে। গাড়ির ক্ষতি তো হয়ই।’

গুলশানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন আব্দুল গাফফার। তিনি থাকেন সায়েদাবাদ এলাকায়। গাফফার বলেন, ‘রাইদা পরিবহনে আমি চালাচল করি। ভালোই চলে, কিন্তু এ পরিবহনের একটি গাড়ি আরেকটিকে দেখলেই শুরু হয় প্রতিযোগিতা। তখন কাকে পিষে গেল, কোথায় ঠোকা লাগলো, সেই পরোয়া চালকরা করে না।’

বাসের চাপায় হাত হারানোর পর হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন রাজীব হোসেন, কিন্তু সে লড়াইয়ে হেরে যেতে হয় তাকে

তিনি বলেন, ‘চালকরা এটি শুধু যাত্রী তোলার জন্য করে— আমার এটা মনে হয় না। গাড়ি ভরা থাকলেও এটা করতে দেখেছি। আমার মনে হয় চালকদের মানসিক একটা সমস্যা যেমন আছে, তেমনি আইন প্রয়োগে শিথিলতাও এজন্য দায়ী। কঠিন শাস্তি হলে এটা করতে আর কেউ সাহস করতো না।’

শ্রাবণ ট্রান্সপোর্ট (রায়েরবাগ-গুলিস্তান), লাব্বাইক (সাইনবোর্ড-নবীনগর), ভিক্টর ক্ল্যাসিক (সদরঘাট-গাজীপুর) ঠিকানা (সাইনবোর্ড-চন্দ্রা), ৮ নম্বর (যাত্রাবাড়ী-গাবতলী), অনাবিল (সাইনবোর্ড-গাজীপুর), তুরাগ (পোস্তগোলা-গাজীপুর), রজনীগন্ধা/সিটি লিংক (সাইনবোর্ড-ঘাটারচর), অছিম (স্টাফ কোয়ার্টার-গাজীপুর), বলাকা (সায়েদাবাদ-গাজীপুর), শিখর/শিকড়/খাজাবাবা (যাত্রাবাড়ী-মিরপুর), নিউভিশন (মতিঝিল-চিড়িয়াখানা), আজমেরী গ্লোরীসহ (সদরঘাট-চন্দ্রা) বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোকে সড়কে রেষারেষি করতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

শ্রাবণ পরিবহনের মালিক মো. আবু তৈয়ব বলেন, ‘চালকরা অনেক সময় নিয়ম মানে না। আমরা তাদের সেভাবে মনিটরিংও করতে পারি না। তাদের কারণে অনেক সময়ই আমাদের জরিমানার মুখে পড়তে হয়।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত কোম্পানিভিত্তিক বাস চালানো সম্ভব হবে না, ততদিন বাসের রেষারেষি থাকবে। এখন ইজারাভিত্তিতে বাস পরিচালনা করা হয়। কিন্তু বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয় পরিবহন শ্রমিকদের বেতন, পরিচালক খরচ, মালিকের মুনাফার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এখন বাসচালক ও হেলপারদের হাতে দৈনিক ইজারায় বাস তুলে দেয়া হয়।’

বেপরোয়া বাস কেড়ে নেয় আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মিমকে

‘এতে যাত্রী ধরার জন্য এক বাস আরেক বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। আর এতে কারও হাত চলে যায়, কারও পা চলে যায়, কারও জীবনও চলে যায়; কিন্তু তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের লক্ষ্য থাকে তারা একজন যাত্রী কীভাবে বেশি তুলবে, কীভাবে বেশি আয় করবে। গাড়িচালক ও হেলপারদের এই টার্গেট যতদিন থাকবে, ততদিন এই ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই’—বলেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব।

মোজাম্মেল হক আরও বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা করা হবে। কিন্তু এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আশা করি সরকার এ বিষয়ে নজর দেবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে বাসের এই জীবনঘাতী প্রতিযোগিতা বন্ধ করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।’

ডেমরা ট্রাফিক জোনের সার্জেন্ট সুমন ইসলাম দায়িত্ব পালন করছিলেন রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ডে। তিনি বলেন, ‘দু’টি বাস রেষারেষি করলে কিংবা বেপরোয়া গতিতে চলাচল করলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। অনেক সময় আমাদের অগোচরে এটা হয়, তখন তো আমাদের কিছু করার থাকে না।’

বাড্ডা লিংক রোডে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট দীপ হাসান। বাড্ডা ট্রাফিক জোনের এই সার্জেন্ট বলেন, ‘কোনো গাড়ি রেষারেষি করে বেপরোয়া গতিতে চালালে আমরা দুটি গাড়িকেই থামাই। এরপর ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৮৭ ধারায় মামলা দেই। এ ধারায় আড়াই হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে জরিমানা দ্বিগুণ।’

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালে দেশজুড়ে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা

বাসের রেষারেষিতে বাড়ছে মৃত্যু
২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রাজধানীর মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন (২১)। তার হাতটি বেরিয়ে ছিল সামান্য বাইরে। হঠাৎ করেই পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে পেরিয়ে যাওয়া বা ওভারটেক করার জন্য বাঁ দিকে গা ঘেঁষে পড়ে। দুই বাসের চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১৭ এপ্রিল মারা যান তিনি। এ ঘটনা মানুষের মনে দাগ কাটে।

২০১৮ সালের ২৯ মে দুই বাসের চাপায় পড়ে কোনাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রাণ যায় রামচরণ সরকার নামের এক বাস হেলপারের। ঢাকাগামী আজমেরী ও গ্লোরী পরিবহনের দু’টি বাস পাল্লা দিয়ে যাওয়ার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর হোটেল র‌্যাডিসনের বিপরীত পাশের জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের ঢালের সামনের রাস্তার ওপর জাবালে নূর পরিবহনের তিন বাসের রেষারেষির সময় একটি বাস রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের উপর উঠে পড়ে। এতে শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব (১৭) ও একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম (১৬) মারা যান। আহত হন ৯ জন। এরপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়।

পরের বছর ২০১৯ সালের ২৮ জুন রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী পৌরসভার সামনে ঘটে এমনই আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সেদিন বেপরোয়া গতির একটি বাসের সঙ্গে আরেক বাসের ধাক্কায় রাজশাহী কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ফিরোজ সরদারের (২৫) ডান কনুইয়ের ওপর থেকে হাত কাটা পড়ে।

২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় প্রাণ যায় ওমর ফারুক তুহিন (২৮) নামের এক মোটরসাইকেল চালকের।

একই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুই বাসের রেষারেষিতে তিন পথচারী নিহত হন।

এই দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, রাজধানী থেকে ছেড়ে আসা বোরাক পরিবহন ও হোমনা সুপার সার্ভিস সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর ওভারব্রিজের সামনে প্রতিযোগিতা শুরু করে। একপর্যায়ে বোরাক বাসটি কাঁচপুর ওভারব্রিজের ঢালুতে থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করছিল। এ সময় হঠাৎ হোমনা সুপার সার্ভিস বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বোরাক পরিবহনের পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটে দুর্ঘটনা, ঝরে তিনটি তাজা প্রাণ।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English