শিশুর প্রতি স্নেহ-ভালোবাসার বিষয়ে ইসলামে অত্যন্ত তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারি মহানবী (সা.) শিশুদেরকে বেহেশতের নিকটবর্তী মনোরম উদ্যান এবং বেহেশতের বর্ণাঢ্য প্রজাপতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ইসলাম শিশুকে স্নেহ-মমতা ও আদর-যত্ন দিয়ে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছে। শিশুদের প্রতি যেন কোনো ভাবেই কঠোরতা প্রদর্শন করা না হয় এবং দারিদ্রের ভয়ে যেন তাদেরকে হত্যা করা না হয় এ বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘আর দারিদ্রের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদের এবং তোমাদেরও রিজিক দেই। তাদেরকে হত্যা করা নিশ্চয় মহাপাপ’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩১)।
এ আয়াতে শিশুদের হত্যার বিষয়ে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ।
তাদেরকে যদি সঠিক শিক্ষা এবং উপযুক্ত সুবিধার মাধ্যমে তাদের পূর্ণ মানসিক ও নৈতিক বৃদ্ধিপ্রাপ্তিতে সাহায্য করা হয়, তাহলে তারা সমাজের সত্যিকার উপযোগী ও কার্যকর সদস্যে পরিণত হবে। অথচ আজ শিশুরা বাবার কোল এমন কি মাতৃগর্ভেও শিশু নিরাপদ নয়।
এমন সব নজিরবিহীন ও নির্লজ্জ ঘটনা আজ ঘটে চলেছে, যা শুনলে হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়।
সমাজে আজ শিশুর প্রতি নৃশংসতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে আজকাল সচেতন মহলে শিশুহত্যা প্রতিরোধের আহ্বান জোরদার হচ্ছে।
অথচ ইসলাম চৌদ্দশত বছর পূর্বেই শিশু হত্যাকে বারণ করেছে। বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) যুদ্ধক্ষেত্রেও কোন শিশুকে হত্যা করতে বারণ করেছেন।
রণাঙ্গনে ভুলক্রমে কোন ইহুদী শিশু মারা গেলে হুজুর পাক (সা.) সাহাবিদের প্রতি অনেক অসন্তুষ্ট হন। কারণ শিশুরা নিষ্পাপ, মাসুম। তাদের কোন পাপ নেই।
আমরা জানি, এ বিশ্বের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ পরম দয়ালু আল্লাহতায়ালা মহানবীকে (সা.) প্রেরণ করেছেন। পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। মানুষকে মানুষ হিসেবে কীভাবে সম্মান করতে হয় তা তিনি নিজ জীবনাদর্শের মাধ্যমে শিখিয়েছেন।
শিশুর প্রতি উত্তম আচরণ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না সে আমাদের দলভুক্ত নয়’ (তিরমিজি)।
একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন সে নিষ্পাপ থাকে। মানুষ সাধারণত শিশুদেরকে ভালোবাসে এবং আদর করতে চায় আর শিশুদেরকে ভালোবাসার প্রতি ইসলাম অনেক জোর দেয়। আসলে শিশু একটি বীজের মত। আমরা যত বেশি এর পরিচর্যা করবো, এর ফুল ও ফল তত ভালো হবে।
মহানবী (সা.) শিশুদেরকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন ও ভালোবাসতেন, তাদেরকে কাছে টেনে চুমু খেতেন, তাদের জন্য সর্বদা কল্যাণ ও মঙ্গলের দোয়া করতেন।
একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) একবার হাসানকে (তার দৌহিত্র শিশু) চুমু খেলেন। তখন নবী করিম (সা.)এর সঙ্গে ছিলেন হজরত আকরা ইবনে হাবিস (রা.)।
তিনি বিরক্তি ভরে বললেন, ‘আমার ১০টি সন্তান রয়েছে, আমি কাউকে কোনদিন চুমু খাই নি।’ এ কথা শুনে নবী করিম (সা.) তার দিকে তাকিয়ে করুণা ভরে বললেন, যে দয়া করে না সে দয়া পায় না’ (বোখারি)।
শিশুদের প্রতি মহানবীর (সা.) ভালোবাসার কারণে শিশুরাও মহানবী (সা.)-কে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। হজরত আবদুল্লাহ বিন জাফর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) যখন কোনো সফর শেষে বাড়িতে ফিরতেন, তখন বাচ্চারা তার আগমনের পথে গিয়ে অভ্যর্থনা জানাত।
একবার তিনি তার সফর থেকে এসে আমাকে তার বাহনের সামনে বসালেন। অতঃপর নাতি হাসান, হোসেন (রা.)-কে বাহনের পেছনে বসালেন। তারপর আমাদের নিয়ে তিনি মদীনায় প্রবেশ করলেন (মুসলিম)।
অবহেলিত শিশুদের প্রতি সমাজের সচেতন মানুষের সম্মিলিত সহানুভূতি একান্ত প্রয়োজন। ওদের প্রতি সামান্য সহানুভূতির ফলে আমরা খুব সহজে পৃথিবীকে স্বর্গরাজ্যে পরিণত করতে পারি।
কেননা, যে শিশুটি আজ অবহেলিত, হয়তো সেই শিশুই একদিন সমাজ ও দেশের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই তাকে যদি প্রথম থেকেই আমরা নিজ সন্তানের ন্যায় ভালোবাসি, তাহলে হয়তো সে দেশের জন্য গর্বের কারণ হবে।
আল্লাহর প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রাসুলই শিশুদেরকে আদর করতেন, ভালোবাসতেন, মূল্যায়ণ করতেন। শিশুদের ওপর অত্যাচার কোনভাবেই মহানবী (সা.) সহ্য করতেন না।
এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও যেন কোন শিশুকে হত্য না করা হয় সে বিষয়ে বিশেষ ভাবে নির্দেশ প্রদান করতেন।
তাই আসুন, শিশুদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসার ডানা প্রসারিত করি আর বিশ্বের সকল শিশুর প্রতি মমতাশীল হই।