রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:২৯ অপরাহ্ন

ঐ মহামানব আসে

নিজস্ব প্রতিবেদন
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১
  • ২০১ জন নিউজটি পড়েছেন
ঐ মহামানব আসে

‘আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল/ সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল/ মৃত্যু-গহন অন্ধকূপে/ মহাকালের চণ্ড-রূপে/ ধূম্র-ধূপে/ বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর/…ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়।’ আজ ১৭ মার্চ সেই মহালগ্ন। বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে, তর্জনীর গর্জনে পরাধীনতার আগল ভেঙে জাতিকে যিনি শুনিয়েছিলেন স্বাধীনতার অমৃত বাণী, আজ তার একশ একতম জন্মবার্ষিকী। বঙ্গবন্ধুর আগমনে অমারাত্রির দুর্গতোরণ ধূলিতলে ভগ্ন হয়েছে নবজীবনের আশ্বাসে।

১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সাহেরা খাতুনের কোল জুড়ে আসেন বাঙালির বহু শতাব্দীর পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে শান্তি ও মুক্তির বারতা নিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ এমন এক মহালগ্মে জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হবে যখন জাতি একইসঙ্গে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী পালনের দ্বারপ্রান্তে। জাতির হৃদয়ে বাজছে বিশ্বকবির সুর, ‘ঐ মহামানব আসে/ দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে/ মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে/ সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ/ নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক/ এল মহাজন্মের লগ্ন।’

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্ম ও রাজনৈতিক জীবন অসামান্য গৌরবের। বঙ্গবন্ধুর বাল্যকাল কেটেছে টুঙ্গিপাড়া গ্রামেই। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। পড়াশোনার হাতেখড়ি গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে মাদারীপুর ইসলামিয়া হাই স্কুল, গোপালগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল ও গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করেন।

শৈশব থেকেই শেখ মুজিব ছিলেন মানবিক, সাহসী ও দানশীল। গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়াকালীন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক বিদ্যালয় পরিদর্শনে এলে কিশোর শেখ মুজিব তার পথ আগলিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সংস্কার ও ছাত্রছাত্রীদের থাকার হোস্টেল কত দিনের মধ্যে নির্মাণ করা হবে’। স্কুলজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। কৈশোরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন। ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ তৎকালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন। ওই সময় থেকে নিজেকে ছাত্র-যুব নেতা হিসেবে রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেন।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, আটান্নর আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনসহ পাকিস্তানি সামরিক শাসনবিরোধী সব আন্দোলন-সংগ্রামে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালির অধিকার আদায়ের এসব আন্দোলনের কারণে বারবার তাকে কারাবরণ করতে হয়।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাকে। আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তথা বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে তাদের কারাগারে পাঠান। ঊনসত্তরের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করে ‘বঙ্গবন্ধু’র মর্যাদায় অভিসিক্ত করে।

সত্তরের নির্বাচনে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের ম্যান্ডেট লাভ করে আওয়ামী লীগ; কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির এ বিজয়কে মেনে নেয়নি। এরপর বঙ্গবন্ধু স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রথমে স্বাধিকার আন্দোলন এবং চূড়ান্ত পর্বে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দেন।

এ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মার্চে নজিরবিহীন অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ ভাষণে সেদিন স্বাধীনতার ডাক দিয়ে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকনির্দেশনা দেন।

একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর বঙ্গবন্ধুকে তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং ৪ লাখ মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে বীর বাঙালি একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে। অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু। সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। পঁচাত্তরে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ডাক দেন দ্বিতীয় বিপ্লবের। এর অল্প কিছুদিন পরেই ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে নিজ বাসভবনে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা।

মাত্র সাড়ে তিন বছর শাসনামলে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠন, অর্থনৈতিক মুক্তি, ধর্ম নিরপেক্ষক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার ভিত স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ অর্জন, দক্ষ পররাষ্ট্রনীতি, কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন, ফারাক্কা চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করে বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালিকে আত্ম-মর্যাদাশীল জাতিতে পরিচিত করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যান বঙ্গবন্ধু। তার দ্বিতীয় স্বপ্ন ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার আগেই ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নেয় তার প্রাণ। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই আজ উন্নয়নের মহাসড়কে পঞ্চাশে পা রাখা বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণেই দু’পারের স্বপ্ন ছুঁয়েছে পদ্মা সেতু। মেট্টো রেল, এলিভেটর এক্সপ্রেস, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা বন্দর, বঙ্গবন্ধু টানেল থেকে শুরু করে মহাবিশ্বে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নেই রূপকল্প-২০৪১ এর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণে বিভোর জাতি।
জন্ম শতবর্ষে বিনম্র শ্রদ্ধা জাতির পিতা।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English