মহান আল্লাহ মানুষকে সব পাপের জন্য শাস্তি দিলে মানুষ একটি নিঃশ্বাস নেওয়ারও সুযোগ পেত না। কিন্তু আল্লাহ দুনিয়াকে পরীক্ষাগার বানিয়েছেন, তাই তিনি বান্দাকে সব পাপের জন্য তাৎক্ষণিক পাকড়াও করেন না। তদুপরি বান্দা পাপের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে দুনিয়াতেও তার ওপর কিছু বিপর্যয় নেমে আসে। যাতে তারা সতর্ক হয়ে যায়, পাপের পথ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সাগরে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে; ফলে তিনি তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কাজের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত : ৪১)
জলে-স্থলের এই বিপর্যয় অনেক রকম হতে পারে। যেমন—দুর্ভিক্ষ, মহামারি, অগ্নিকাণ্ড, পানিতে নিমজ্জিত হওয়া, সব কিছু থেকে বরকত উঠে যাওয়া, উপকারী বস্তুর উপকার কম এবং ক্ষতি বেশি হয়ে যাওয়া ইত্যাদি আপদ-বিপদ ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। (সাদি, কুরতুবি, বাগভি)
আবদুল্লাহ বিন উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলেন, হে মুহাজিররা, তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তা ছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা আগের লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। যখন কোনো জাতি ওজন ও পরিমাপে কারচুপি করে তখন তাদের ওপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, কঠিন বিপদ-মুসিবত এবং জাকাত আদায় করে না তখন আসমান থেকে বৃষ্টিবর্ষণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদি ভূ-পৃষ্ঠে চতুষ্পদ জন্তু ও নির্বাক প্রাণী না থাকত তাহলে আর কখনো বৃষ্টিপাত হতো না। যখন কোনো জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের ওপর তাদের বিজাতীয় দুশমনকে ক্ষমতাসীন করেন এবং সে তাদের সহায়-সম্পদ সব কিছু কেড়ে নেয়। যখন তোমাদের শাসকবর্গ আল্লাহর কিতাব মোতাবেক মীমাংসা করে না এবং আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে গ্রহণ করে না, তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)
উল্লিখিত হাদিসে বলা হয়েছে যে সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়লে সে সমাজে মহামারি নেমে আসে। বর্তমান যুগে বিশ্বব্যাপী অশ্লীলতা বেড়ে যাচ্ছে, যারা অশ্লীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চায়, বিভিন্ন অশুভ শক্তি তাদেরই উল্টো কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে, যার ফলাফল সবার সামনে আছে।
দ্বিতীয়ত, যখন মানুষ মাপে কারচুপি করে, তখন অভাব নেমে আসে। পবিত্র কোরআন-হাদিসে অবশ্য সুদভিত্তিক লেনদেনে জড়ালেও রিজিকের বরকত উঠিয়ে নেওয়ার ঘোষণা এসেছে। মানুষের এই অভাবের ধরন বহু রকম হতে পারে। এক. রিজিকে বরকত থাকবে না। মানুষ অনেক উপার্জন করবে; কিন্ত বরকত না থাকায় সে তার উপার্জনের যথাযথ ফল ভোগ করতে পারবে না। মানুষ অনেক খাবার কেনার সামর্থ্য রাখবে; কিন্তু তার রিজিক সংকীর্ণ হওয়ার কারণে সে সেই খাবারগুলো ছুঁয়ে দেখতে পারবে না। কোথাও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন রোগ-ব্যাধির ভয়ে মানুষকে অভাবীদের মতোই অনাহারে দিন কাটাতে হবে। জীবন বরকতময় না হওয়ার কারণ মানুষ মানসিক প্রশান্তি হারাবে। বর্তমান যুগে আমরা এর প্রতিটি চিত্রই খুব কাছ থেকে দেখছি।
এভাবে জাকাত প্রদানে দুর্নীতি করলে অনাবৃষ্টি দেখা দেওয়া, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করার শাস্তি অবিশ্বাসীদের গোলামে পরিণত হওয়া, আল্লাহর কালাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি সবই হচ্ছে মানুষের পাপের কারণে। এ ছাড়া হাদিসে এসেছে যে পাপের কারণে মহান আল্লাহ মানুষকে অন্যদের কাছে নিন্দিত করে তোলে, অপমান, পরাজয়ের গ্লানি তাকে গ্রাস করে ফেলে। সফলতা ও উন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। তাই জীবনকে শান্তিময় করে সবাইকে পাপের পথ ছেড়ে আল্লাহর রাস্তায় চলে আসতে হবে। বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে।
মহান আল্লাহ সবাইকে পাপ বর্জন করে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।