শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:২৮ অপরাহ্ন

দর্শকের ঢল নামা অভিরুচিও বন্ধের পথে

বিনোদন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ৭ এপ্রিল, ২০২১
  • ৫০ জন নিউজটি পড়েছেন
দর্শকের ঢল নামা অভিরুচিও বন্ধের পথে

প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালে এক সময় গড়ে উঠেছিল ১৮টি সিনেমা হল। তখন হল মালিকদের ব্যবসা ছিল রমরমা। তবে পরিস্থিতি এখন পুরোটাই উল্টো। সময়ের পরিক্রমায় জৌলুশের সঙ্গে দর্শক খরায় ভুগছে হলগুলো।

দর্শকের অভাবে জেলার ১৭টি হল বন্ধ হয়েছে। কোনো রকমে চালু থাকা বরিশালের একমাত্র অভিরুচি হলটি যেকোনো সময় বন্ধ হতে পারে। বেশ কয়েক বছর ধরে হলটিতে ঈদ ছাড়া অন্য সময় দর্শক হয় না বললেই চলে। তবে করোনার প্রভাবে অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে কোনো সময় বন্ধ হতে পারে অভিরুচি।

বরিশালের জেলা সহকারী তথ্য কর্মকর্তা লেনিন বালা জানান, মোট হল ছিল ১৮টি। তার মধ্যে ১৭টি বন্ধ হয়েছে। নগরীতে চারটি সিনেমা হলের মধ্যে তিনটিই বন্ধ। শুধু অভিরুচি চালু রয়েছে।

বরিশালের ১০ উপজেলা ও নগরী মিলে বন্ধ হওয়া হলের মধ্যে রয়েছে, নগরীতে কাকলী, বিউটি ও সোনালি। মেহেন্দিগঞ্জে আজাদ, রাজলক্ষ্মী, মেঘনা, পদ্মা, বাকেরগঞ্জে রংধনু, সঙ্গীতা, ঘোমটা, বাবুগঞ্জে আনারকলি, উজিরপুরে স্বপ্নপুরী, বানারীপাড়ায় সোহাগ, গৌরনদীতে নাহার, আগৈলঝাড়ায় তাজমহল, মুলাদীতে মামুন এবং হিজলায় রূপমহল হল।

বরিশালের সংস্কৃতিকর্মীরা জানান, হল একসময় বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল। পরিবার নিয়ে হলে যাওয়া যেত। তবে নব্বইয়ের শেষ দিকে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা শুরু হয়। ফলে পরিবার নিয়ে হলে যাওয়া কমে যায়। তবে অশ্লীলতার আগে সিনেমাকে হুমকিতে ফেলে পাইরেসি। সেটাও নব্বই দশকের শেষের দিকে। সিডি ও পরে ডিভিডির মাধ্যমে পাইরেসি শুরু হয়। এখনও ইউটিউবে পাইরেসি রয়েছে। নব্বই দশকের শেষ ভাগে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের প্রভাব রয়েছে। এরপর ঘরে ঘরে স্যাটেলাইট টিভির বিস্তারে হলের কদর কমেছে। চলতি দশকে তথ্য প্রযুক্তির প্রসারে হাতের নাগালে আসে ইন্টারনেট। এখন ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম, দেশি ওয়েবসহ নানা প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। মুহূর্তেই মুঠোফোনে বা ঘরে বসেই সবকিছু দেখা যায়। এছাড়া গত দুই দশকে মূলধারার মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাবে দর্শকরা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

অভিরুচি হলের ব্যবস্থাপক রেজাউল কবির বলেন, প্রায় ২২ ধরে এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছি। প্রথমে ছিলেন টিকিট বিক্রেতা, পদোন্নতি পেয়ে এখন ব্যবস্থাপক হয়েছি। চাকরি জীবনের প্রথম দিকে দর্শক ছিলাম। তখন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এ হলে প্রতিদিন চারটি শো চলতো। দর্শকের ভিড় থাকতো। ঈদ বা ছুটির দিনে হলে এক হাজার ২০০ আসনের একটিও ফাঁকা থাকতো না। পরিবার নিয়ে হলে আসতো দর্শকরা। টেকনিশিয়ান, অপারেটর ও টিকিট বিক্রেতা মিলিয়ে ৪০ জনের বেশি কর্মাচারী ছিল হলটিতে। এখন এসব শুধুই স্মৃতি। দিনে দিনে দর্শক কমেছে। কোনো কোনো শো-তে তিন-চারজন দর্শকও হয় না। দর্শকের অভাবে মাঝে মধ্যে শো বন্ধ রাখতে হয়। ফলে চাকরি হারিয়েছে হলের বেশিরভাগ কর্মচারি। এখন চার জন কর্মচারি দিয়ে কাজ চলছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো হলটি বন্ধই হয়ে যাবে।

রেজাউল কবির বলেন, এখন এই একটি হলই চালু রয়েছে। সেটিও বন্ধের পথে। ঐতিহ্যবাহী এ হলটি বাঁচাতে সরকারকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।

অভিরুচি হলের মালিক এবায়দুল হক চাঁন বলেন, হলের ব্যবসা একসময় রাজকীয় ছিল। ১৯৮৮ সালে চালুর পর নতুন ছবি মুক্তি পেলে অভিরুচিতে দর্শকের ঢল নামতো। মনে পড়ে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ও ‘টাইটানিক’ চলচ্চিত্রের শোগুলো প্রথম কয়েকটা দিন ছিল হাউসফুল। এক হাজার ২০০ আসন কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। টানা দুই মাসেরও বেশি সময় হলে ছবি দুইটি প্রদর্শিত হয়েছিল। ২০১০ পর্যন্ত জমজমাট ছিল অভিরুচি। ২০১৪ সালের পর টানা দর্শক খরা শুরু হয়। এরপর আর প্রত্যাশামতো দর্শক হয়নি। দর্শক খরার কারণে নগরীর তিনটি হল আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে অভিরুচি বন্ধ করতে হতে পারে । কারণ, হল চালিয়ে রাখতে মাসে খরচ প্রায় এক লাখ ২০ থেকে দেড়লাখ টাকা। হল চালিয়ে রাখতে গিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা দেনা হয়েছে। ভালো গল্পের ছবি নেই, ছবিতে নেই ভালো সংলাপ, নেই ভালো গান ও অভিনয়। গত দুই-তিন বছর ধরে শুধু দুই ঈদ ছাড়া দর্র্শক হয়নি। মানুষের হলে ছবি দেখার প্রবণতা কমেছে।

তিনি আরও বলেন, এ ব্যবসা মার খেয়েছে নানা করণে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্যাটেলাইট চ্যানেলে ভরতীয় ছবি প্রদর্শন। একসময় যারা হলে ছবি দেখত তারা এখন ঘরে বসে তা উপভোগ করছেন। এমনকি চায়ের দোকান ও ভাতের হোটেলে বসেও ছবি দেখা যায়। সরকারের এ বিষয় কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। দর্শকের হলবিমুখের আরেকটি কারণ হচ্ছে, মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাব। মানসম্মত ছবির সঙ্কট থাকলে, কোনোভাবেই হল ব্যবসা টিকে রাখা সম্ভব নয়। প্রতিবছরই ছবির নির্মাণ কমছে। যা তৈরি হচ্ছে, বেশির ভাগই মানসম্মত নয়। শুধু দেশীয় চলচ্চিত্র দিয়ে হল বাঁচানো সম্ভব নয়। কারণ ঘরে বসে টিভিতে ভারতীয় ছবি দেখছে দর্শক, কিন্তু হলে তা দেখানো যাচ্ছে না। এ কারণে হলে দর্শক কমছে। তাছাড়া প্রযুক্তির প্রসার, কপিরাইট ও পাইরেসির কারণে চরম দর্শক শূন্যতায় পড়েছে সিনেমা হল।

তিনি বলেন, চলচ্চিত্রের এ সঙ্কটের একটাই সমাধান, পুরো শিল্পটাকে নতুন করে সাজাতে হবে। হল পরিচালনায় সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। সরকার এগিয়ে না আসলে কোনোভাবেই হলের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি শাহ্ সাজেদা বলেন, ছোট বেলায় বিনোদন বলতে ছিল সিনেমা হল আর রেডিও। একসময় পরিবার নিয়ে হলে বসে সিনেমা দেখা যেত। এখন সুস্থ চলচ্চিত্র তেমন নির্মাণ হয় না। একসঙ্গে হলে বসে ছবি দেখারও পরিবেশ নেই। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের অভাবে দর্শকরা হলবিমুখ হয়ে পড়েছে। সরকার, নির্মাতা, বিনিয়োগকারী ও পরিবেশকরা এ দায় এড়াতে পারেন না। চলচ্চিত্র শিল্পের এই দুর্দশায় হলমালিকদেরও দায় কম নয়। বেশিরভাগ মালিক শুধু মুনাফার চিন্তা করেছেন। হলের পরিবেশ, সংস্কার, আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আসনব্যবস্থা যুগোপযোগীর বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেননি। এসব কারণে রুচিশীল দর্শকরা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। পরবর্তীকালে তাদের হলমুখি করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ কেউ নেয়নি।

শাহ্ সাজেদা বলেন, এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পী ও কলাকুশলীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ, আধুনিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ হল মালিকদের স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি চলচ্চিত্র শিল্পের স্বার্থে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সোনালি যুগের গৌরব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা উচিত।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English