করোনা মহামারীর এ মুহূর্তে দেশের চিকিৎসা খাতের সবচেয়ে বড় সংকটের নাম নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউ। করোনা দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তা থেকে রোগীকে রক্ষা করতে পারে আইসিইউ। অথচ দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪২ জেলায়ই নেই এই আইসিইউ সুবিধা। ফলে সে সব জেলায় করোনায় আক্রান্ত রোগীদের আইসিইউ সুবিধার প্রয়োজন হলেই আঁতকে উঠছেন স্বজনরা।
অসহায়ভাবে ছুটে আসছেন ঢাকায়। এদিকে অতিরিক্ত রোগীর চাপে তিল ধারণের ঠাঁই নেই ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে এখন আইসিইউ পাওয়া দূরের কথা সাধারণ সিট পাওয়াই ভাগ্যের ব্যাপার।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলায় জেলায় আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অনন্ন্যোপায় হয়ে সেখানকার রোগীদের নিয়ে আত্মীয়-স্বজনরা ছুটে আসছেন ঢাকায়। আবার ঢাকায়ও আইসিইউর সংকট। ফলে রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল ঘুরে আইসিইউ না পেয়ে মারা যাচ্ছেন। দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ এই আইসিইউ সংকট। অতি শিগগির যদি এই পরিস্থিতির উত্তোরণ না ঘটে তাহলে মৃত্যুর হার এভাবেই বাড়তেই থাকবে। চিকিৎসা ব্যবস্থার আরো সূচনীয় অবস্থা হবে।
nagad
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের জুন মাসে দেশের প্রতিটি জেলায় আইসিইউ স্থাপনের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাও বাস্তবায়ন হয়নি। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ উদ্দিন মিয়া বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশেই নতুন শয্যা ও আইসিইউ স্থাপনের কাজ চলছে। যেসব জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ নেই সেসব হাসপাতালে এডিপি ও ইউনিসেফের অর্থায়নে কাজ প্রক্রিয়াধীন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসব সংকট সমাধান করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ঢাকা বিভাগের ৭টি, রাজশাহী বিভাগের ৬টি, চট্টগ্রাম বিভাগের ৭টি, খুলনা বিভাগের ৬টি, বরিশাল বিভাগের ৫টি, সিলেট বিভাগের ২টি, ময়মনসিংহ বিভাগের ৩টি ও রংপুর বিভাগের ৬টি মিলিয়ে দেশের মোট ৪২ জেলায় করোনা রোগীদের জন্য নেই কোনো আইসিইউ সুবিধা।
জেলাগুলো হলো- ঢাকা বিভাগের মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, শরিয়তপুর, টাঙ্গাইল। চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া।
রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট ও নাটোর। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা ও নড়াইল। বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাটি। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ।
ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর এবং রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট।
দেশের জেলাগুলোতে আইসিইউ সংকট প্রসঙ্গে খ্যতিমান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, দেশে কিছুটা হলেও আইসিইউর সংকট রয়েছে। সব জেলায় আইসিইউ থাকলে ভালো হতো। অন্তত কিছু লোককে বাঁচানো যেত। আর আইসিইউতো তাড়াহুড়ো করে বানানো যায় না। এখানে অনেক যন্ত্রপাতি লাগে, পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল লাগে। বাইরের দেশ থেকে এখন আমদানি বন্ধ থাকায় যন্ত্রপাতিও আনা সম্ভব হচ্ছে না। আর দেশে আইসিইউ পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলও নেই। ফলে এই সমস্যাটি হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, গত বছরের মে মাসে দেশের ৪৭টি জেলায় আইসিইউ ছিল না। এবছরের এপ্রিলে দেশের ৪২ জেলায় নেই আইসিইউ সুবিধা। অর্থাৎ এক বছরের ৫টি জেলায় আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে। অথচ গত মাস থেকে এয়ারপোর্টে ২শ আইসিইউ বেড, অক্সিজেন সরঞ্জাম পড়ে আছে। অন্যদিকে আমাদের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের গুদামে ২৭৮টি আইসিইউ বেড পড়ে আছে। সবমিলিয়ে ৪৭৮ টি বেড পড়ে আছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশের প্রতিটি জেলায় ১০ বেডের আইসিইউ করা হবে। তাহলে ৪২ জেলায় আইসিইউ স্থাপন করতে প্রয়োজন ছিল ৪২০টি আইসিইউ বেড। কিন্তু আমাদের তার থেকে অধিক আইসিইউ পড়ে আছে। কিন্তু আমরা কেন করতে পারলাম না এর জবাবদিহিতা কিন্তু কেউ চাচ্ছে না।
তিনি বলেন, আইসিইউ সুবিধা নেই- এমন সব জেলার যেসব রোগীর আইসিইউ দরকার হচ্ছে তারা বড় শহরে আসছে। কিন্তু বড় শহরে জনসংখ্যা বেশি, লোকজন বেশি। এখানে এসে আইসিইউ পাচ্ছে না। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে মারা যাচ্ছে। মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার এটিও অন্যতম একটি কারণ।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান বলেন, ‘আইসিইউ খালি হলেই তা সঙ্গে সঙ্গে আবার পূরণ হয়ে যায়। এ ছাড়া আইসিইউতে যারা যায় তাদের অনেকটাই সময় লাগে। ফলে খালি হতেও সময় লাগে। আমরা দু-এক দিনের মধ্যেই ২০ বেডের একটি এইচডিইউ ইউনিট চালু করতে যাচ্ছি। আশা করি তখন কিছুটা সুবিধা হবে।’
তিনি আরো বলেন, জেনারেল বেডে কিছুটা মনে হচ্ছে চাপ কমতে শুরু করেছে ধীরগতিতে হলেও। আরো সপ্তাহখানেক পরে বোঝা যাবে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়। ঢাকার বাইরের চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার সুজাউদৌলা রুবেল বলেন, কারো কারো অবস্থা এতটাই জটিল থাকে যে এখানে তাদের চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ নেই। তবে আইসিইউ সাপোর্ট থাকলে এমন সমস্যায় পড়তে হতো না।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান জানান, সদর হাসপাতালে চারটি আইসিইউ বেডের জন্য আরো আগেই প্রস্তাবনা পাঠানো আছে। এখন পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক খবর আসেনি।
নরসিংদীতেও এখনো জোটেনি আইসিইউ বেড। এক সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্কে জেলাবাসী। মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের লোকজনের দাবি, নরসিংদীতে কোনো হাসপাতালে যদি আইসিইউর ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো তারা চিকিৎসার সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করতে পারত।
জেলা হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এখানে আইসিইউ, পিসিআর ল্যাব, সেন্ট্রাল অক্সিজেনের দরকার। এর মধ্যে নরসিংদীর শিল্পপতি মজিদ মোল্লা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবদুল কাদির মোল্লার অর্থায়ন, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিএমএর সহযোগিতায় সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে।’