করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলছে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ইফতারির বাজারেও। মানুষের জীবনধারায় এসেছে পরিবর্তন। বদলেছে খাবার মেন্যু। আগে যেখানে ইফতারের তালিকায় ওপরের সারিতে স্থান পেত আলুর চপ, বেগুনি, জিলাপি, পেঁয়াজু, ছোলা-মুড়ির মতো ভাজাপোড়া খাবার। এখন সে স্থান দখলে নিয়েছে ফল এবং পানীয় জাতীয় খাবার। ভাজা খাবারের চেয়ে অনেক বেশি বিক্রি হচ্ছে এসব। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বুধবার ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
পুষ্টি ও খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের সচেতনতা আগের চেয়ে বেড়েছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ফল ও পানীয় জাতীয় খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। করোনা অনেক কিছু শিখিয়েছে। মানুষ পুষ্টিকর খাবারগুলো গ্রহণের চেষ্টা করছেন। নতুন এই অভ্যাসের ফলে আমাদের সমাজে দীর্ঘমেয়াদে একটা ভালো ফল আসবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ইফতারে সবচেয়ে ভালো মৌসুমি ফল তরমুজ, কলা, পেয়ারা, টমেটো, গাজর-জাতীয় খাবার রাখা, যা স্বাস্থ্যকর। খেজুরও খেতে পারি। ফল জাতীয় খাবারে বিভিন্ন ভিটামিন থাকে। এসব খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। তবে এই করোনাকালে ফল বাইরে থেকে বাসায় আনার পর কিছুক্ষণ ভিনেগার দিয়ে ভিজিয়ে নেওয়া উচিত। আর ভাজাপোড়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেকের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা, শ্বাসনালির রোগ আছে, তাদের জন্য ভাজাপোড়া খাওয়া ভালো নয়।
তিনি বলেন, ভাজাপোড়া খেতে চাইলে বাসায় তৈরি করে খাওয়া উচিত। ঘরে তৈরি ছোলার মতো অনেক খাবার রয়েছে যেসব আমাদের দেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুষ্টির জোগান দেয়। এ সময়টাতে বাইরে থেকে খোলা বা ভাজাপোড়া খাওয়া ঠিক নয়।রাজধানীর উত্তরা, কাওরান বাজার, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, পুরান ঢাকার চকবাজারের শাহী মসজিদ রোডসহ বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা যায়, ভাজা খাবারের চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ফল এবং পানীয় জাতীয় খাবার।
ব্যবসায়ীরা জানান, লকডাউনের কারণে যথাযথভাবে পণ্য আসছে না। তাই বেড়েছে কিছু ফলের দাম। বর্তমানে ইফতারে কলা, আপেল, খেজুর, তরমুজ, মাল্টা, নাশপাতি, আঙ্গুর, পেঁপে ও বাঙ্গির খুব চাহিদা। মিরপুরে জামাল হোসেন নামের একজন ফল ব্যবসায়ী জানান, লকডাউন হলেও ব্যবসা ভালোই যাচ্ছে। একটু দাম বেশি হলেও লোকজনের কাছে ফলের চাহিদা বেশি।
মনির হোসেন নামের একজন তরমুজ বিক্রেতা জানান, লকডাউনে বেশিরভাগ বাজার ও দোকান বন্ধ থাকায় তাদের বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়। যে কারণে বিক্রিও করতে হয় বেশি দামে। উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে ফলের দোকানের সামনে কথা হয় আজিজ রহমান নামের একজন স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুদিন আগেও যে কলা ৮০-৮৫ টাকা ডজন কিনেছি এখন তা ১২০-১৩০ টাকা ডজন। তরমুজ সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে কেজিতে প্রায় ২০-২৫ টাকা। দাম বেড়েছে মাল্টারও। দাম বেশি হলেও করোনাকালে ইফতারে ফলই বেশি রাখতে হচ্ছে। আর আলুর চপ, বেগুনি, জিলাপি, পেঁয়াজু, ছোলা-এই জাতীয় খাবার বাসাতে তৈরি করা হয়।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বেশিরভাগ খাবার দোকানই বন্ধ দেখা গেছে। কিছু দোকানের সামনে পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, পাকোড়া, নিমকি, চিকেন, নানা ধরনের জিলাপি সাজানো দেখা যায়। কিন্তু ক্রেতার উপস্থিতি এসব জায়গায় কম দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, লকডাউনের কারণে রোজাদাররা এখন বাসায় ইফতার করছেন। ফলে বিক্রি কমেছে। তারা বলেন, করোনার কারণে অনেকে ভাজাপোড়া খাচ্ছেন না। তারা ইফতার করছেন বিভিন্ন ফল দিয়ে। অন্যদিকে লকডাউনে হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা রেখেছে রাজধানীর অনেক রেস্টুরেন্ট। লকডাউনে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনলাইনে নানা অফারও দিচ্ছে রেস্তোরাঁগুলো।