আমরা মানুষ। আদি পিতা আদম আ:-এর বংশ থেকে আমরা বিস্তৃত হয়েছি। মাটি থেকে হজরত আদম আ:কে সৃষ্টি করার পর তাঁর বাম পাঁজর থেকে জীবন সাথী মা হাওয়া আ:কে আল্লাহ সৃষ্টি করলেন। তার পর কুরআনের ভাষায় আদম-হাওয়া থেকে সন্তানদের বিস্তার করলেন পৃথিবীতে। আমরা আল্লাহর সৃষ্টি মানুষ। আমরা কুরআনের ভাষায় সৃষ্টির সেরা জীব। প্রশ্ন হলো মানুষ কেনো শ্রেষ্ঠ জাতি।
জমিনে প্রথম বিচরণ করেছে জিন জাতি। তারা আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে জমিনের প্রতিনিধিত্ব অর্জন করতে পারেনি। তাদের বিতাড়িত করা হয়েছে জমিনের রাজত্ব থেকে। সুতরাং যারা জমিন থেকে বিতাড়িত, তারা কখনো শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। পরবর্তীতে ফেরেশতাদের জমিনে উপাসনার জন্য পাঠানো হয়। ফেরেশতাদের পর মানব জাতিকে জমিনের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য পাঠানো হয়েছে। মানবজাতি শ্রেষ্ঠ হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।
এক. ফেরেশতাদের একত্র করে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করলেন, ‘আমি মানব জাতিকে পৃথিবীর রাজত্ব করার জন্য সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেছি।’ আল্লাহ যাদের এ জগতের রাজত্ব দান করলেন এবং এ রাজত্বে তার আনুগত্যকারীদের পরবর্তী জীবন অর্থাৎ পরকালের জীবনে জান্নাতে রাজত্ব দেয়ার সুসংবাদ দিলেন। যে জাতি সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে তাঁর প্রেরিত সব বিধিবিধান মেনে জীবনযাপন করবে তাকে উভয় জাহানের রাজত্ব দেয়ার সুসংবাদ রাব্বে কারিম নিজে দিয়েছেন, সে জাতি শ্রেষ্ঠ কেন হবে না!
দুই. মানবজাতির সৃষ্টির প্রারম্ভে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ফেরেশতাদের মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার কথা জানানোর পর তাদের অন্তরে মানুষ জাতির শ্রেষ্ঠ হওয়ার সংশয় উত্থাপিত হলে হিকমাহ অবলম্বন করে মানুষের শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ এবং দলিল জানিয়ে দিলেন, আল্লাহ বললেন, ‘আমি যা জানি তোমরা তা জানো না’। (সূরা বাকারা, আয়াত-৩২)
ফেরেশতারা হলেন পাঁচ বছরের শিশুর মতো। আর মানুষ হলো ২৫ বছরের টগবগে তরুণ যুবকের মতো। উদাহরণ দেয়া যায়, একজন বালিকা যে অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী। তার কাছে নির্জনে ২৫ বছরের নাবালেগ শিশু বিচরণ করল। কিন্তু সে কোনো অপকর্মে লিপ্ত হলো না। অন্য দিকে ২৫ বছরের টগবগে যুবক প্রাপ্তবয়স্ক একজন তরুণীর সান্নিধ্যে থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের গুনাহে লিপ্ত হলো না। অতএব, শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে পাঁচ বছরের অবুঝ শিশু শ্রেষ্ঠ হবে নাকি ২৫ বছরের তরুণ শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হবে। ফেরেশতারা হলেন পাঁচ বছরের শিশুর মতো। তাদেরকে গুনাহ করার যোগ্যতা মহান আল্লাহ দেননি। এ জন্য তারা গুনাহ করে না। বিপরীতে মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষ গুনাহের স্বাদ নিতে পারে। তার পরও মানুষ গুনাহ মুক্ত থেকে আল্লাহর দাসত্বে লিপ্ত থাকে। আল্লাহর মাহবুব হয়ে বেঁচে থাকে।
এ কারণে মানুষই শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন ফেরেশতাদের, ‘আমি যা জানি তোমরা তা জানো না’। যখন ফেরেশতারা বোঝতে পারল তখনই আল্লাহর কাছে নতি স্বীকার করলÑ ফেরেশতারা বলল, ‘আপনি পবিত্র মহান। আমাদেরকে আপনি যা শিখিয়েছেন, আমাদের তা ছাড়া আর কোনো জ্ঞান নেই। অবশ্যই আপনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-৩২)
অতঃপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে রাব্বে কাবা ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন, ‘যখন আমি আদমকে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলিস ছাড়া সবাই সেজদা করল।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-৩৪) সবাই সেজদা করল। কিন্তু শয়তান সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানাল। শয়তানের অস্বীকৃতির পুরস্কারও ঘোষণা করলেন আল্লাহ তায়ালাÑ ‘শয়তান হুকুম পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহঙ্কার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-৩৪)
ফেরেশতারা অনুতপ্ত হয়ে আরশে মাসজিদে সাতবার তাওয়াফ করে ক্ষমা চাইল। আল্লাহ ক্ষমা করে ঘোষণা করলেন, ‘জানার জন্য প্রশ্ন করা অপরাধ নয়। তোমরা জানার জন্যই প্রশ্ন করেছ।’
তিন. মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ আল্লাহর সৃষ্টির দিকে দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায়। আল্লাহ মানুষকে তৈরি করেছেন তার খিলাফত অর্থাৎ জমিনের রাজত্ব পরিচালনার জন্য। তার পর তাঁর অন্য সব সৃষ্টিকে মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন। মানুষকে আল্লাহ নিজ হাতে সুনিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে আল্লাহ পঞ্চেন্দ্রিয় দান করেছেন, যা মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। শেষকথা হলো, মানুষ সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাতেই শ্রেষ্ঠ জীব।
মানুষ হিসেবে আল্লাহ আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে তাঁর পক্ষ থেকে দূত হিসেবে নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর ঐশী বাণী মানুষের কর্ণকুহরে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে নবী ও রাসূলদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। হজরত আদম আ:কে নবুওয়াত দেয়ার মাধ্যমে বনি আদমকে পথ দেখিয়েছেন সত্য ও হকের। দূর করেছেন সংশয়। এভাবে মানুষকে ঐশী বাণী পৌঁছে দেয়া এবং এক আল্লাহর ইবাদত উপাসনা করার প্রতি মানুষকে আহ্বান করার জন্য পৃথিবীর বুকে পাঠিয়েছেন একের পর এক নবী। কোনো কোনো রাসূলকে আল্লাহ তায়ালা আসমানি কিতাব দান করেছেন। কাউকে আবার সহিফা গ্রন্থ দান করেছেন। এসব কিতাব ও সহিফা ছিল আল্লাহর বাণীসমৃদ্ধ মানুষের হিদায়াতের আলোকবর্তিকা।
নবী মুহাম্মদ সা:-এর আবির্ভাবের কথা তাঁর আগে আগমনকারী সব নবী-রাসূল তাদের উম্মতের কাছে জানিয়েছেন। এমনকি নবী সা:-এর আগমনের বার্তা প্রকাশিত হয়েছে পূর্ববর্তী সব কিতাবের পাতায়। তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিলে ছিল দুই জাহানের সরদার সা:-এর আগমনের চিহ্ন। বর্ণনা করা হয়েছে তাঁর শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। মক্কার জমিন কুফর শিরকে নিমজ্জিত ছিল। মানুষ আল্লাহর দাসত্ব ত্যাগ করে মানুষের গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ হয়ে গেল। হত্যা-খুন ইত্যাদি ছিল সাধারণ ব্যাপার। এককথায় পুরো পৃথিবী ছিলো অন্ধকারে আবৃত। ঠিক তখনই মক্কার জমিনে আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত হলেন নবী মুহাম্মদ সা:।
আল্লাহ তায়ালা কুরাইশ বংশের আবদুল্লাহ ও মা আমিনার ঘরে দান করেছিলেন শিশু মুহাম্মদ সা:কে। শিশুকাল থেকে তার প্রতি মক্কার মানুষদের ভালোবাসা অপরিসীম ছিল। সিরাতের পাতায় পাতায় উপস্থাপন করা নবী সা:-এর জন্মের আগে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের আলোকময় অধ্যায়। তিনি আগমন করেছিলেন মানুষকে জাহেলিয়াত থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য। তাঁকে দেয়া হয়েছিল আসমানি গ্রন্থ কালামুল্লাহ শরিফ। যে গ্রন্থে কথা বলেছেন আল্লাহ তায়ালা। রাব্বে কাবা আমাদের সবাইকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করার উপরে বর্ণিত মুহাম্মদ সা:-এর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিজীবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন নবী-রাসূলরা। নবী-রাসূলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হলেন আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সা:। আমরা সেই শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত। কুরআনের আমাদেরকে উম্মতদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত নির্বাচিত করেছে।