শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

আকাশ থেকে দেখা করোনা

খেলা ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ৮ জুলাই, ২০২১
  • ৫৯ জন নিউজটি পড়েছেন
দেড় মাস পর দেড়শর নিচে নামলো করোনায় মৃত্যু

যখন মাটির স্পর্শ ছিন্ন করে আকাশের দিকে মাথা তুলছি, আরেকটি বিষণ্ন দিনের আগে শেষ ঘুমটুকু ঘুমিয়ে নিচ্ছিল নিস্তব্ধ শহর। বিষণ্ন দিনই বলতে হচ্ছে। যে দিনগুলোর শেষে টালিখাতা খুলে হিসাব হয় আজ কত মানুষ মরল, কত লোকের শরীরে নতুন করে করোনার বিষ বাসা বাঁধল, সেই দিনগুলোকে আর কীই-বা বলা যায়!

পরশু ভোরে কাতার এয়ারওয়েজের বোয়িং বিমান ঢাকার আকাশ ভেদ করে যত ওপরে উঠছিল, দূর দিগন্তে ফুটে উঠছিল প্রভাতের আভা। যেন এই মাত্র নরম আগুনে ভেজানো তুলিতে কোনো শিল্পী সোনালি আঁচড় দিয়ে গেলেন। এমন দৃশ্য দেখার অনুভূতি অবশ্য দুনিয়ার সব আকাশ থেকে একই রকম। সূর্যোদয় সে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপরেই হোক বা মরুর আকাশে ভোরের আলো ফুটিয়ে অথবা পরশু সকালের ওই ঢাকার আকাশ—সবই এককথায় ‘নৈসর্গিক’। তবে সত্যি বলতে, করোনাকালের আকাশযাত্রায় দিনের আলো ফোটানো মায়াবী ভোর এবার মনে সে অনুভূতি আনেনি।

আমি দীর্ঘ পথের যাত্রী। ঢাকা থেকে দোহা, জোহানেসবার্গ হয়ে শেষ গন্তব্য জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারে। সব মিলিয়ে প্রায় ২১ ঘণ্টার উড়াল। জিম্বাবুয়ে যাত্রার উদ্দেশ্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সিরিজ কাভার করা। করোনার মধ্যে এর আগেও বাংলাদেশের ক্রিকেটারেরা বিদেশে গিয়ে খেলেছেন। তবে মহামারিকালে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম বিদেশে ক্রিকেট সিরিজ কাভারের সুযোগ জিম্বাবুয়েতেই প্রথম পেল।

সুযোগটা নিতে গিয়ে সফরের যত আয়োজন, তার পুরো প্রেক্ষাপটই করোনার বিধিনিষেধকে ঘিরে। করোনাকে ফাঁকি দিয়ে জীবন চালিয়ে নেওয়ার ফন্দিফিকির এ ক্ষেত্রেও নানা রূপে আবির্ভূত। আকাশে ভাসতে ভাসতে, বিমানের গা ঘেঁষে ভাসমান মেঘেদের ছুটে যাওয়া দেখতে দেখতে মনে প্রশ্ন জাগছিল—এভাবে আর কত দিন? করোনার সঙ্গে এমন লুকোচুরি খেলার শেষ কবে?

এটা জেনেই জিম্বাবুয়ে এসেছি যে এর আগে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে করা বিদেশ সফরগুলোর মতো হবে না এবারের সফর। হারারে পর্যন্ত এসেও জৈব সুরক্ষাবলয়ে থাকা দলটাকে দেখতে হবে স্বচ্ছ কাচের এপাশ থেকে। ঠিক এই মুহূর্তে যেমন হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠের প্রেসবক্স থেকে দেখছি।

ঢিল-ছোড়া দূরত্বে বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুম। কোচ রাসেল ডমিঙ্গো কোচিং স্টাফ সহকর্মীদের নিয়ে বারান্দায় বসে খেলা দেখছেন। নিচে মাঠের পাশে নরম রোদে বসে আছেন শরিফুল, এবাদতরা। মাঠে ব্যাট হাতে মাহমুদউল্লাহকে দারুণ সংগত দিয়ে যাচ্ছেন তাসকিন আহমেদ। তাঁদের উৎসাহ দিতে একটু পরপরই হাততালির শব্দ ভেসে আসছে ড্রেসিংরুমের দিক থেকে।

জিম্বাবুয়ের এই মাঠটাতে প্রেসবক্স থেকে ড্রেসিংরুম এতটাই কাছে যে আগের সফরগুলোয় আশপাশে গিয়ে উঁকিঝুঁকিও মারা গেছে। কিন্তু এবার সেটা কল্পনা করাও কঠিন। ‘কত কাছে, তবু কত দূরে’ কথাটাই বাস্তবতা এখন। খেলা আর খেলোয়াড়দের নিয়ে নিয়মিত ঘটনাপ্রবাহে হঠাৎ কোনো কারণে বাড়তি তরঙ্গের ঢেউ খেলে গেলেও অনুসন্ধিৎসু মনের খোরাক মেটাতে হবে দূর থেকে কান পেতে। তবু আকাশ পাড়ি দিয়ে এসে যতটা কাছে গিয়ে দেখা যায়, এই আর কী! অনেকটা পানিতে পা না ডুবিয়ে তীর থেকে সমুদ্র দেখার মতো।

খেলাধুলাটা আজকাল মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য, কখনো–সখনো রাজনীতিরও বড় উপকরণ হয়ে উঠলেও জীবন-মৃত্যুর আলোচনায় খেলার চেয়ে তুচ্ছ বিষয় আর হয় না। করোনাদিনের খেলার মধ্যেও তাই আগে জীবন বাঁচানোর তাড়না। স্বাস্থ্য নিরাপত্তার শর্ত। ইউরো বলুন, কোপা আমেরিকা বলুন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বলুন, ঢাকার ঘরোয়া খেলাই বলুন, সর্বত্র স্লোগান একই—আগে করোনা থেকে বাঁচো, তারপর খেলো। খেলা হবে, কিন্তু মাঠে দর্শক থাকবে না, এই ভেলকি তো করোনাই দেখাল। হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠেও শূন্য পড়ে আছে সুদৃশ্য কাঠের গ্যালারি। নিষ্প্রাণ ঘাসে ঢাকা সবুজ মাটির ঢিবিটাও।

দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছুঁয়ে জোহানেসবার্গের উদ্দেশ্যে উড়ছিলাম তখন। বিশাল এয়ারবাসের সবকিছুতে করোনাকে পরাভূত করার আয়োজন। কেবিন ক্রুদের চিরচেনা ইউনিফর্ম ঢাকা পড়ে গেছে সাদা ওয়ানটাইম অ্যাপ্রোনের নিচে। চোখে সুরক্ষা চশমা, মাথায় টুপি। আগে তারা একটু পরপর এসে সিটবেল্ট বাঁধার কথা মনে করিয়ে দিয়ে যেতেন। এখন কয়েক দফা এটাও দেখে যান যে যাত্রীদের নাক-মুখ মাস্কে ঢাকা আছে তো! কারও মুখে তা না থাকলে সিটবেল্ট বাঁধতে বলার তুলনায় ভাষাটা একটু কঠোর—‘মাস্ক জায়গামতো পরুন। নিরাপত্তার স্বার্থেই আপনার তা করা উচিত।’

লম্বা ফ্লাইটে টুকটাক ব্যবহার্য জিনিসপত্রের যে প্যাকেটটা কেবিন ক্রুরা দিয়ে যান, সেখানেও নতুন আইটেম যোগ হয়েছে। স্যানিটাইজার, মাস্ক, ক্যাপ। ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৮ হাজার ফুট ওপরেও করোনার নীরব হুংকারই শুনতে থাকলাম একটু পরপর। আকাশের নীল যেন এখন আর আকাশের নেই। আকাশও নীল করোনার বিষে!

জরুরি অবতরণের মুহূর্তে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে, উড্ডয়নের শুরুতে সেই চিরাচরিত নির্দেশনাটিও বুঝি এখন হারিয়ে গেছে। সিটের সামনের ছোট্ট মনিটরে কয়েক মিনিটের ভিডিওতে শুধু দেখানো হলো সাবান দিয়ে কীভাবে হাত ধুতে হবে, সাবান না থাকলে একটু পরপর হাত স্যানিটাইজ করতে হবে, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার কীভাবে মানতে হবে। যেন বিমান পানিতে পড়লে পড়ুক, তবু কোভিডের আমদানি-রপ্তানি যেন না হয়।

এত শিখিয়ে–পড়িয়েও যে খুব লাভ হচ্ছে, তা নয়। ঢাকা থেকে দোহা আসার পুরো পথেই দুজন সহযাত্রী বিকট হাঁচি-কাশি দিতে দিতে বিমান গরম করে ফেললেন। হাঁচি-কাশি তো নয়, যেন একেকটা বোমা! অন্যদের অস্বস্তি আর আতঙ্কিত চাহনির অনুবাদে অন্তত সে রকমই মনে হচ্ছিল ব্যাপারটাকে। ও হ্যাঁ, মাস্কের বাইরে নাক উঁকি দিয়ে রাখা এবং হাঁচি এলে মাস্ক সরিয়ে ‘হ্যাঁচ্চো’ করার লোক কিন্তু বাংলাদেশের বাইরেও কম নেই।

মহামারির মধ্যে প্রথম দেশের বাইরে বের হলাম বলেই কিনা নতুন অনেক কিছুতে চোখ আটকে যাচ্ছিল। বিমানভ্রমণকালে নিয়মিত কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতায় নতুন কিছু ব্যাপার যোগ হয়েছে। কোভিড পরীক্ষার সনদ তো রাখতেই হচ্ছে, সঙ্গে পথে পথে লিখিতভাবে এই ঘোষণাও দিয়ে যেতে হবে যে, গত ১৪ দিনে আপনি জ্বরে ভোগেননি, আপনার সর্দি-কাশি হয়নি, আপনি সন্দেহভাজন করোনায় আক্রান্তের সংস্পর্শে যাননি।

হারারে পৌঁছার আগে জোহানেসবার্গের ও আর টাম্বো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাড়ে তিন ঘণ্টার ট্রানজিট ছিল। মনে মনে এই ব্যাপারটা নিয়েই বেশি ভয়। এমনিতেই এমন এক মহাদেশে এসেছি, করোনাজাতির মধ্যে যারা ‘উঁচু বংশে’র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট! তারওপর দক্ষিণ আফ্রিকার করোনা পরিস্থিতি নাজুক বলেই জেনে এসেছি ঢাকা থেকে। এর মধ্যেই আমি কিনা জিম্বাবুয়ে এসেছি দক্ষিণ আফ্রিকার বাতাস গায়ে লাগিয়ে!

জোহানেসবার্গে পা দিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে আঁচ করা গেল। দুকদম হাঁটলেই সামনে স্যানিটাইজার নিয়ে হাজির হচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। মাস্ক পরার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। নিরাপত্তা চেকপয়েন্টগুলোয় যাত্রীদের জিনিসপত্রে কেউ হাত দিচ্ছে না। যার লাগেজ তাকেই ধরে ধরে স্ক্যান করাতে হচ্ছে। এমনকি বোর্ডিং পাসটাও স্ক্যানারের সামনে ধরছেন যাত্রী নিজেই। নিরাপত্তাকর্মীদের কাজ শুধু মনিটরে দৃষ্টি রাখা। ওদিকে লাউড স্পিকারে ক্রমাগত সতর্কবার্তা বেজেই চলেছে, ‘প্রটেক্ট ইউ, প্রটেক্ট আস’। নিজে বাঁচুন, আমাদের বাঁচান।

হারারেতে লোকজন এমনিতেই কম। রাস্তাঘাট সব সময়ই ফাঁকা ফাঁকা। তার মধ্যে এখন আছে করোনার বিধিনিষেধ। বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অফিস-আদালত, দোকানপাট খোলা। এরপর সব বন্ধ। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে তো কারফিউই শুরু হয়ে যায়। তার মধ্যেও যে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজটা হচ্ছে, সেটির বড় কারণ খেলাটাকে ঘিরে থাকা বাণিজ্য।

এখানকার শূন্য গ্যালারিতেও যেন সেই একই প্রতিধ্বনি, ‘প্রটেক্ট ইউ, প্রটেক্ট আস’। খেলা হোক, তবে সেটা করোনার আগুনে না পুড়ে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English