বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে দুটি সামুদ্রিক মাছ। পিঠের পাখনার আকৃতির কারণে জেলেরা এটিকে ‘গোলপাতা’ মাছ বলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিকারি পরিবারের এই মাছ আসলে সেইল ফিশ। এটি সাগরের সবচেয়ে দ্রুতগামী মাছ।
সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় সামুদ্রিক মৎস্য প্রজাতির বা সাগরের জলজ প্রাণীর জীববৈচিত্র্যের উন্নয়ন হয়েছে। এতে বেড়ে উঠছে সামুদ্রিক মাছ। এ কারণে জেলের জালে বড় আকারের সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মেঘনায় জেলের জালে সাগরের সবচেয়ে দ্রুতগতির মাছ সেইল ফিশ
বৃহস্পতিবার পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা শহরের পূর্ব মাছ বাজারে বিক্রির জন্য এই সামুদ্রিক মাছ দুটি তোলা হয়। বড় আকারের মাছ দুটির ওজন ১০৭ কেজি। খবর পেয়ে মাছ দুটিকে দেখতে সেখানে উৎসুক মানুষ ভিড় করে। গলাচিপা মাছবাজারের সভাপতি মো. চুন্নু মৃধা বলেন, বাজারে এর আগে গোলপাতা মাছ এলেও এত বড় মাছ আর কখনো আসেনি। তাই মাছ দেখতে উৎসুক অনেক মানুষ বাজারে ভিড় করেছিলেন।
গলাচিপা বাজারে মাছ দুটি নিয়ে আসেন সাগর মাঝি নামের একজন জেলে। তাঁর বাড়ি উপজেলার গোলখালী গ্রামে। তিনি জানান, উপকূল–সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে বুধবার তাঁদের জালে এই মাছ দুটি ধরা পড়ে। প্রায় ৭ ফুট দৈর্ঘ্যের মাছ দুটির একটির ওজন ৫৭ কেজি। অন্যটির ওজন ৫০ কেজি। বুধবার তিনি বিক্রির জন্য মাছ দুটিকে গলাচিপায় নিয়ে আসেন এবং পূর্ব মাছবাজারে তোলেন।
বাজারে আনার পর কেউ কেউ মাছ দুটি ছুঁয়ে দেখেন। কেউ কেউ মাছের পিঠের গোলপাতার মতো পাখনা মেলে ধরে ছবি তোলেন। একপর্যায়ে গলাচিপার বরফ ব্যবসায়ী লিকন তালুকদার পাঁচ হাজার টাকায় মাছ দুটি কিনে নেন। লিকন তালুকদার জানান, বৃহস্পতিবার রাতেই মাছ দুটি কেটে স্থানীয় ২০ জন মিলে ভাগ করে নিয়েছেন। বাড়িতে রাতে মাছ রান্না করে খেয়েছেন তিনি। তবে মাছের স্বাদ একটু ভিন্ন। কিছুটা মাংসের মতো।
বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তর সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্টের উপপ্রকল্প পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম জানান, সেইল ফিশ Istiophorus platypterus প্রজাতির মাছ। এটি সাগরের সবচেয়ে দ্রুতগামী মাছ। ঘণ্টায় ৬৮ মাইল গতিতে ছুটতে পারে। এরা মাংসাশী। একেকটির দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ১১ ফুট হয়। ওজন হয় ১২০-২২০ পাউন্ড। এর দুটি প্রধান উপ-প্রজাতি আটলান্টিক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক। সাধারণত ২১-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানিতে এরা বাস করে।
কামরুল ইসলাম আরও জানান, সেইল ফিশের পেটের নিচের অংশ সাদার সঙ্গে নীল থেকে ধূসর রঙের হয়। দর্শনীয় ডোরসাল বা পিঠের পাখনা গোলপাতার মতো হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এটিকে গোলপাতা মাছ বলা হয়। এদের পিঠের পাখনা প্রায় দেহের সমান দৈর্ঘ্য প্রসারিত করে এবং তাদের দেহ মোটা হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি পাতলা ও লম্বাটে। এদের ওপরের চোয়াল আছে, যা নিম্ন চোয়ালের বাইরে ভালোভাবে বেরিয়ে আসে এবং একটি স্বতন্ত্র বর্শা গঠন করে। এটা দিয়ে এরা মাছ শিকার করে খায়। এদের সাগরপৃষ্ঠের কাছাকাছি পাওয়া যায়। সাধারণত এরা সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভিসের মতো ছোট মাছ শিকার করে। এরা স্কুইড ও অক্টোপাসও শিকার করে খায়।
কামরুল ইসলাম বলেন, ইদানীং বাংলাদেশের সাগর জলসীমায় সেইল ফিশ আহরিত হচ্ছে, যা সন্তোষজনক। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশ সরকারের সমুদ্র ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক ভূমিকা। বিশেষ করে সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ করায় সামুদ্রিক মৎস্য প্রজাতি বা সাগরের জলজ প্রাণীর জীববৈচিত্র্যের উন্নয়ন হয়েছে। আহরিত সেইল ফিশ আগের দিনে শুঁটকি করা হতো। বর্তমানে তাজা মাছ খাদ্য হিসেবে ধীরে ধীরে সমাদৃত হচ্ছে, যা কাঙ্ক্ষিত ও নতুন বাজার সৃষ্টির হাতছানি। সেইল ফিশ খুব মজাদার না হলেও এর মধ্যে খাদ্যগুণ উন্নত। কারণ, সামুদ্রিক হওয়ায় এই মাছের দেহে মানবদেহের জন্য উপকারী খাদ্য উপাদান বিদ্যমান।