যাদের হৃদয়ে আছে আল্লাহর ভয়/তারা কভু পথ ভুলে যায় না
আল্লাহর প্রেম ছাড়া এই দুনিয়ায়/কারো কাছে কোনো কিছু চায় না।
কবি ও গীতিকার বেলাল হোসাইন নূরীর লেখা এই গানে আমরা আল্লাহর প্রতি ভয়ের এক ধরনের পবিত্র অনুভূতি খুঁজে পাই। পবিত্র কুরআন ও হাদিসেও আল্লাহকে ভয় করে জীবন পরিচালনার বিষয়ে নানা নির্দেশনা ও দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে।
সূরা আল ইমরানের ১৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাকো, তবে আমাকে ভয় করো। ওই আয়াতে বুঝা যায়, এক আল্লাহর প্রতি ভয় পোষণ করা মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। আয়াতটি থেকে এও প্রমাণিত হয় যে, ভয় ঈমানের বৈশিষ্ট্যসমূহের মাঝে অন্যতম। সুতরাং বান্দার ঈমানের গভীরতার অনুপাতে তার মধ্যে আল্লাহর ভয় থাকবে।
সূরা আল ফাতিরের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাময়। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। আর যে আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ভয় করে কেউ তার উপকার করতে পারে না।
কারো অন্তরে যখন আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, তখন তা প্রবৃত্তির মন্দ তাড়না ও চাহিদাগুলোকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয় এবং এর ফলে তার মন থেকে দুনিয়ার মোহ কমে যায়।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : আল্লাহ যেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; এমন লোকেরা, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয়ে আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ কায়েম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। সূরা : আন-নূর, আয়াত : ৩৬
যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তবে সেই ভয় তাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।
আল্লাহভীতির পরকালীন ফলাফল
১. আল্লাহর ভয়ে ভীত বান্দা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় স্থান পাবেন। রাসূল সা: ইরশাদ করেন এবং এমন ব্যক্তি (আরশের নিচে ছায়া পাবে) যাকে অভিজাত সুন্দরী কোনো রমণী প্রস্তাব দেয়া সত্ত্বেও সে বলে; আমি আল্লাহকে ভয় করি। (বুখারি)
২. আল্লাহর ভয় মানুষকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। রাসূল সা: ইরশাদ করেন- যে ভয় পায় সে আত্মরক্ষার্থে রাতে সফর করে, আর যে রাতে সফর করে সে সচেতনতার কারণে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। তোমরা জেনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহর পুরস্কার অত্যন্ত দামি। আর তা হলো জান্নাত। (সুতরাং আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগরুক রাখো এবং সাবধানে দুনিয়ার জীবন পাড়ি দাও। তবেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। (তিরমিজি)
৩. যার মাঝে আল্লাহর ভয় আছে, সে কিয়ামতের দিন নিরাপদে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ করেন : আমার ইজ্জতের কসম! আমার বান্দার জন্য দু’টি ভয় ও দু’টি নিরাপত্তাকে একত্র করি না। যদি সে দুনিয়ায় আমাকে ভয় করে তবে কিয়ামতে আমি তাকে নিরাপত্তা দান করব। আর দুনিয়ায় আমাকে যে নিরাপদ মনে করবে (ভয় না করবে) কিয়ামতের দিন তাকে আমি সন্ত্রস্ত রাখবো (বায়হাকী)
৪. আল্লাহ তায়ালা তাঁর ঈমানদার বান্দাদের যেসব গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, আল্লাহভীতি তার অন্যতম।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে সাজদা ও দণ্ডায়মান হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে এবং আখিরাতকে ভয় করে ও তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।
সূরা : আয-যুমার, আয়াত : ৯
ফেরেশতাগণও আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, তারা তাদের ওপর পরাক্রমশালী, তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে এবং তারা যা আদেশ পায়, তা করে। সূরা : আন-নাহল, আয়াত : ৫০
আল্লাহর পরিচয় লাভকারী বান্দারা সর্বদা নেক আমলে মগ্ন থাকেন। তারা কখনো নিরাশ হন না। তারাই আল্লাহর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় ও বিনয় পোষণ করেন। এর একটি উদাহরণ হলো :
রাসূল সা: নামাজে এত অধিক ক্রন্দন করতেন যে, ক্রন্দনের ফলে তাঁর বুক দিয়ে ফুটন্ত ডেকের শব্দের মতো (গম্ভীর) শব্দ শোনা যেত। (আহমদ, আবু-দাউদ ও নাসাঈ।)
আল্লাহর ভয় সংক্রান্ত জ্ঞাতব্য
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাময়। (সূরা : আল-ফাতির, আয়াত: ২৮)
নবী করিম সা: ইরশাদ করেন, জেনে রেখো! আল্লাহর শপথ আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে অধিক সমীহ করি এবং অধিক ভয় করি। (মুসলিম)
আল্লাহর প্রতি ভয় পোষণ করা ঈমানের একটি অত্যাবশ্যকীয় দাবি। আল্লাহর ভয় প্রতিটি মানুষের জন্য ফরজ। এটা পাপ, দুনিয়ার মোহ, অসৎসঙ্গ, আখিরাত সম্পর্কে ঔদাসীন্য ও নির্বোধ মানসিকতা পোষণ থেকে মানুষকে বিরত রাখে।
কোনো মানুষের যখন খারাপ কাজ করার সুযোগ আসে তখন সে যেন ভাবে, আমার খারাপ কাজগুলো দুনিয়ার কেউ না জানলেও কিংবা না দেখলেও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তা দেখছেন। কিরামুন কাতিবিন আমাদের সব আমলনামা সার্বক্ষণিক লিপিবদ্ধ করছেন। অতএব সবসময় অন্তরে আল্লাহর ভয় পোষণ করা মুমিনের জন্য অপরিহার্য।