শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন

খালেদা জিয়ার লন্ডনযাত্রা আটকে আছে ‘শর্তে’

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০
  • ৩৬ জন নিউজটি পড়েছেন

উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হলে বিনাশর্তেই সরকারের কাছ থেকে সে অনুমতি পেতে চান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলীয় নেতাদের ভাষ্য, নানা শর্তের কারণে আটকে আছে খালেদা জিয়ার লন্ডন যাওয়া। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে। কৌশলগত কারণে কোনো পক্ষই মুখ খুলতে নারাজ। তবে সরকার যদি অনুমতি দেয় তাহলেও করোনা মহামারির মধ্যে খালেদা জিয়ার লন্ডন যাওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন তার পরিবার ও দলীয় নেতাদের অনেকে। পরিস্থিতির উন্নতির পরই কেবল বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি ভাবতে চান তারা। এমন আভাসই দিয়েছেন বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক সূত্র।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার এ বিষয়ে বলেছেন, খালেদা জিয়া নানান শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তার বিদেশে যাওয়া প্রয়োজন। তবে বিদেশে যেতে পারবেন না- এমন শর্তেই সরকার তাকে জামিন দিয়েছে। অন্যদিকে দেশের হাসপাতালগুলোরও বেহাল অবস্থা। এর মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে করোনা মহামারি। এদিকে, গতকাল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একটি দলীয় কর্মসূচি উদ্বোধনকালে মির্জা ফখরুল বলেছেন, বিদেশে না যাওয়ার জন্য খালেদা জিয়াকে শর্ত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার বিদেশে চিকিৎসাই এখন বেশি প্রয়োজন।

খালেদা জিয়ার বড় বোন সেলিনা ইসলাম গতকাল বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়া প্রয়োজন। তবে লন্ডনে যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের কাছে আবেদন করার চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা করাতে জামিনের জন্য আইনি লড়াই চালানো হয়েছিল। তাতে সফল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ‘সমঝোতা’র মাধ্যমে ও শর্তসাপেক্ষেই জামিন নেওয়া হয়েছিল। করোনা মহামারির মধ্যে সরকারের সেসব শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্পও ছিল না তখন। বর্তমানে খালেদা জিয়া বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এখন বড় ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দুই পুত্রবধূ ও তিন নাতনিসহ ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়মিত টেলিফোনে কথা বলছেন। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও মাঝেমধ্যে সাক্ষাৎ করছেন।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, সরকার শর্তসাপেক্ষে খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছে। এখন চিকিৎসা নিতে বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে আর কোনো ‘শর্ত’ সহজে মেনে নেবেন না তিনি। নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দেশ ও দলের সার্বিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই লন্ডনে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান ওই নেতারা।

দলীয় সূত্র জানায়, বিদেশে না যাওয়ার শর্ত দিয়ে জামিন নিলেও এখন তা পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানানো হচ্ছে পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ চলছে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে নানা শর্ত দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে লন্ডনে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি না দেওয়া, সভা-সমাবেশে যোগদান থেকে বিরত থাকা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা, বিদেশিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি। এসব শর্ত মেনে খালেদা জিয়া লন্ডন যেতে রাজি হচ্ছেন না। শর্ত ছাড়াই যেতে চান তিনি।

বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা জানান, অতীতে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা জামিন নিয়ে উন্নত চিকিৎসা নিতে বিদেশে গেছেন। রাজনৈতিক মামলায় জামিন নিয়ে অনেকে বক্তব্য-বিবৃতি, বিদেশ সফর এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে সভা-সমাবেশও করেছেন। ওই নেতার দাবি, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে এত শর্ত দেওয়া অগণতান্ত্রিক। অবশ্য করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে সরকারের সঙ্গে এসব নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চালানোর কথা জানান ওই নেতা।

খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে সরকার শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। এখন উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হোক। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য সরকারের কাছে নিশ্চয় তার পরিবারের সদস্যরা আবেদন করবেন। হাতে এখনও সময় আছে।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, খালেদা জিয়াকে শর্ত সাপেক্ষে ছয় মাসের জামিনে মুক্তি দিয়েছে সরকার। এখন যদি তিনি বিদেশে যেতে চান তাহলে সরকারের অনুমতি লাগবে। এ ছাড়া আদালতে তার দুটি মামলার আপিল বিচারাধীন। তাতে জামিনের আবেদন করা হয়েছে। হয়তো আদালত খুললে তার শুনানি হতে পারে।

অন্যদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারক একটি সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে চিকিৎসা নিতে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রিন সিগন্যালের যে খবর বেরিয়েছে, তা সঠিক নয়। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রচার চালানো হতে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এতে বিস্ময় প্রকাশ করেন। এ ছাড়া সরকার অনুমতি দিলেও দীর্ঘ বিমান ভ্রমণ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে লন্ডনের হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে গিয়ে তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। বাসায় বর্তমানে তার চিকিৎসকরা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। কিন্তু এই সময়ে লন্ডনে তাকে চিকিৎসা নিতে হবে অনলাইনে। নিয়মিত চিকিৎসক পাবেন না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, এখন করোনা মহামারির মধ্যে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না। আগে পরিস্থিতির উন্নতি হোক, তারপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, এখন তার লন্ডনে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো আলোচনা হয়নি। খালেদা জিয়াও তাকে এ নিয়ে কিছু বলেননি।

মামলায় সাজা হওয়ার পর থেকেই খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন। কিন্তু আইনি লড়াই ও রাজপথের আন্দোলন ব্যর্থ হলে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে নির্বাহী আদেশে জামিন দেওয়ার আবেদন জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাসের জন্য সাজা স্থগিত করে গত ২৫ মার্চ খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি মামলা বিচারের পর্যায়ে আছে। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজা ভোগ করছেন খালেদা জিয়া। দুই মামলায় তার ১৭ বছরের সাজা হয়েছে।

৭৫ বছর বয়সী খালেদা জিয়া ডায়াবেটিস এবং চোখ ও আর্থ্রাইটিস সমস্যায় ভুগছেন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English