করোনাভাইরাসের মহামারী আজ সারা দুনিয়াকে গ্রাস করে নিয়েছে। চীন থেকে এর উৎপত্তি। অতঃপর দেখতে দেখতে এই ভাইরাস সারা দুনিয়াকে আয়ত্তে নিয়ে নিয়েছে। দুই শতাধিক রাষ্ট্রে তা ছড়িয়ে পড়েছে। চীন, ইতালি, ফ্রান্স, আমেরিকা, ব্রিটেন, স্পেন এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ নিজেদের অসহায়ত্বের প্রতিকৃতি হয়ে রয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমার যা কিছু করার ছিল তা শেষ, এবার বাকিটা উপর ওয়ালার হাতে।
মহামারী আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আগেও ঘটত। তবে তা সীমাবদ্ধ থাকত কোনো দেশে বা অঞ্চলে। এবার করোনাভাইরাসটি সারা বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলেছে। অতীতে কওমে আদ, কওমে ফেরাউন, কওমে নূহ, কওমে লুত, কওমে ছামুদকে আজাব দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। মানব ইতিহাসে নূহ আলাইহিস সালামের পর এই প্রথম ঘটছে যে, সারা দুনিয়াকে একটি আজাবের মধ্যে নিপতিত করা হয়েছে।
প্রশ্ন এই যে, এসব ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে সতর্ক করার জন্যই যদি করোনার আজাব হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্বের মজলুম জাতি, বিশেষ করে মুসলিম জাতি এই আজাবের শিকার কেন? এটা একটা বড় প্রশ্ন।
রাসূল (সা:) আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, মুসলিম উম্মাহ গুনাহে লিপ্ত হলে এবং আল্লাহর বিধান থেকে বিমুখ হয়ে গেলে, তাদের ওপর এ ধরনের আজাব আসবে। সুতরাং ইমাম আহমদ এবং ইমাম তিরমিজি রহ. রাসূল সা:-এর হাদিস বর্ণনা করেছেন, ‘যখন হকদার নয় এমন লোকদের মধ্যে সম্পদ বণ্টিত হবে, গণিমতের মাল প্রকৃত হকদার নয় এমন লোকদের মধ্যে বণ্টিত হবে, আমানতকে মুনাফা মনে করা হবে, ইলম শুধু দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে হাসিল করা হবে, পুরুষরা স্ত্রীদের আনুগত্য করবে, সন্তান মা-বাবার অবাধ্য হবে এবং সম্পর্ক চ্ছিন্ন করবে, বন্ধুকে আপন মনে করে পিতাকে দূরে ঠেলে দেবে, মসজিদে উচ্চস্বরে কথাবার্তা হবে, কিবলা এবং জাতির নেতৃত্ব ফাসেকদের হাতে হবে, জাতির নিকৃষ্ট ব্যক্তি তাদের নেতা হবে, মানুষ ভয়ে তাকে সম্মান করবে, গায়ক-শিল্পীরা প্রাধান্য পাবে, মদ্যপান করা সাধারণ ব্যাপার হয়ে যাবে, উম্মতের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের ওপর লানত করবে এমন সময়ে তোমরা ভূমিকম্প, ভূমিধস, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এবং ধ্বংসযজ্ঞের অপেক্ষা করবে। এগুলো একের পর এক এমনভাবে ঘটবে, যেন গ্রথিত মালার দানা একটার পর একটা পড়তে থাকে।’
অন্য এক হাদিসে আল্লাহর রাসূল সা: বলেন : ‘ওই সময় তোমাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন তোমাদের মধ্যে পাঁচটি জিনিস দেখা যাবে? আমি আল্লাহর আশ্রয় চাইছি, এগুলো তোমাদের মধ্যে দৃশ্যমান হওয়া থেকে। যখন কোনো জাতির মধ্যে চরিত্রহীনতা সর্বজনীন হয়ে যাবে, মানুষ প্রকাশ্যে গুনাহের কাজ করবে, তখন তাদের মধ্যে এমন মহামারী ও এমন সব বিপদ আসবে, যে ব্যাপারে তাদের পূর্বপুরুষরা অনবহিত ছিল।’ নিশ্চিতভাবে এ রোগ বা মহামারী এমন যে, আগের লোকেরা এ সম্পর্কে অবগত ছিল না। অতঃপর মহানবী সা: বলেন : ‘যে জাতি জাকাত দেয়া বন্ধ করে দেয়, তাদের ওপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেয়া হয়। যদি পৃথিবীতে মানুষ ব্যতীত অন্যান্য প্রাণী না থাকত, তাহলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যেত। যে জাতি ওজনে বেশ-কম করে, তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের ওপর শাসকদের অত্যাচার-নির্যাতন নেমে আসে। এমতাবস্থায় করণীয় হচ্ছে, সাধারণ মুসলমান, শাসকবর্গ, জুলুমকারীরা যেন ‘রুজু ইলাল্লাহ’ তথা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। গুনাহ থেকে বিরত থাকে। আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো নামাজ। সে ব্যাপারে রাসূল সা: বলেন, যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দেয়, তাকে আল্লাহ পাক তাঁর অনুগ্রহের জিম্মা থেকে দূরে ঠেলে দেন।’
উম্মতকে শিক্ষাদানের জন্য বিপদ-মুসিবতে সাইয়্যেদুনা রাসূল সা: আল্লাহর দরবারে সিজদারত হয়ে কান্নাকাটি করে দোয়া করেছেন। অনুমান করুন, সর্বশক্তিমানের সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টির কর্মনীতি যদি এই হয়, এমতাবস্থায় আমাদের সাধারণ মুসলমানদের কী করা উচিত? পবিত্র কুরআনে নবীগণের দোয়া উল্লিখিত আছে। লক্ষ্য করুন, একজন নবী বিপদের সময়ে এ দোয়া করছেন, রাব্বি ইন্নি মাসসানিয়াদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহেমিন অর্থাৎ “হে আল্লাহ, আমাকে মুসিবত স্পর্শ করেছে। আর আপনি সর্বাধিক রহমকারী।’
আম্বিয়ায়ে কেরামের মধ্যে হযরত ইউনুস আ: যখন আপন জাতির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সমুদ্র সফর করছিলেন, তখন মাছ তাকে গিলে ফেলেছিল। মাছের পেটে তিনি যে দোয়াটি করেছিলেন, তা আজো দোয়ায়ে ইউনুস হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। যদি বিপদ-মুসিবতে এ দোয়া পাঠ করা হয়, তাহলে আল্লাহ নিঃসন্দেহে বান্দাদের ওপর থেকে মুসিবত দূরীভূত করে দেবেন। কুরআন কারিমে বিপদ-মুসিবতে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, ‘যখন মানুষের ওপর বিপদ আসে, তখন তারা বলেÑ ‘আমরা আল্লাহরই জন্য। আমাদের আল্লাহর দিকেই ফিরে যেতে হবে। তাদের ওপরই প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষিত হয়। এরাই সৎপথে পরিচালিত। এটাই ‘রুজু ইলাল্লাহ’র সুস্পষ্ট ঘোষণা। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা:-এর ওপর কোনো মুসিবত এলে তিনি মসজিদে চলে যেতেন এবং সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হয়ে যেতেন। পাপে লিপ্ত এবং গুনাহগারদের জন্য যেখানে বিপদ-মুসিবত হচ্ছে, সেখানে ‘রুজু ইলাল্লাহ’ই হচ্ছে তাওবা করার মাধ্যম। তাদের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, যেন গুনাহগাররা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়। আল্লাহ তাদের অবশ্যই মাফ করে দেবেন। কুরআন কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : ‘আপনি বলুন, হে আমার বান্দারা, তোমরা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন।’
অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর রহমত থেকে কেবল কাফিররাই নিরাশ হয়।’ সূরা মায়েদায় বলা হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে আমি ক্ষমা করে দেবো তাদেরকে, যারা তাওবা করে, ঈমান নবায়ন করে এবং নেক আমল করে; অতঃপর হেদায়েতের পথ অবলম্বন করে।’ সূরা ফুরকানে বলা হয়েছে : ‘নিঃসন্দেহে যারা তাওবাহ্ করে ও ঈমান নবায়ন করে এবং নেক আমল করে, তাদের পাপসমূহ তিনি পুণ্যে পরিবর্তিত করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’
আসুন, আল্লাহ তায়ালার শাহী দরবারে কায়মনোবাক্যে বিনয়াবনত হয়ে দোয়া করি, হে আল্লাহ! আমাদের করোনাভাইরাসের এই ভয়ঙ্কর মহামারী থেকে হেফাজত করুন।