ঘোড়দৌড় উপমহাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হয়, মোগল আমলে বিভিন্ন উৎসব উদযাপনে ঘোড়দৌড় জনপ্রিয়তা পায়। সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে এর প্রচলন ছিল। বরিশাল অঞ্চলে নদীর ওপারে গজনীর দিঘীর বিস্তৃত মাঠে, গৌরনদী, নলছিটিতে ঘোড়দৌড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্রিটিশদের আমলে, ঘোড়দৌড় একটি বাণিজ্যিক ও পেশাদারী খেলায় পরিণত হয়। এতে, মূলত ব্রিটিশ ঘোড়া সওয়ারীরা অংশগ্রহন করতো, জুয়ারীরা রেসের ঘোড়ার পেছনে টাকা লগ্নি করতো। ব্রিটিশদের পাশাপাশি বহু বাঙ্গালীও এই খেলায় জড়িয়ে পড়ে।
খ্রিষ্টমাসের শেষে নতুন বছরের আগমন উপলক্ষে সাম্রাজ্যিক রাজধানী কলকাতায় ঘোড়দৌড়ের আয়োজন হত। নিমন্ত্রিত অতিথিদের মনোরঞ্জনের আয়োজন সম্পর্কে একটা আন্দাজ পাওয়া যায় ১৭৮৪ সালের ২ জানুয়ারি, ক্যালকাটা গেজেট-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে। রেসের পর অতিথিদের জন্য যে তাঁবুতে প্রাতরাশের ব্যবস্থা হয়, সেখানে এক সঙ্গে দেড়শো জনের হাত-পা ছড়িয়ে খাওয়ার বন্দোবস্ত। খাওয়াদাওয়া শেষে পাশের আর একটি তাঁবুতে শুরু হয় নাচ, চলেছিল দুপুর দু’টো পর্যন্ত।
ইউরোপীয়দের নিজস্ব হুল্লোড়োৎসব হিসেবে শুরু হলেও, ধীরে ধীরে বাঙালিরাও নিমন্ত্রণ পেতে শুরু করলেন এই উৎসবে। আজ থেকে ১৯০ বছর আগে, ১৮৩০ সালের ১ জানুয়ারির সান্ধ্য উৎসবে গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এ দেশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আপ্যায়িত করেন খানাপিনা ও নাচের আসরে। সংবাদপত্রে নিমন্ত্রিতদের তালিকাও ছাপা হয়, যার মধ্যে ছিল দ্বারকানাথ ঠাকুর, রূপলাল মল্লিক, রাধাকান্ত দেব, রামকমল সেন-সহ সে যুগের ওজনদার কলকাতাবাসীর নাম।
১৮২০ সালে কলকাতা ময়দানে ঘোড়া দৌড়ের মাঠ বা রেসকোর্স স্থাপিত হয়, যা পরবর্তীতে কলকাতা টার্ফ ক্লাব দ্বারা পরিচালিত হতো। এদিকে ঢাকায় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা আয়োজনে খাজা আলীমুল্লাহ তাঁর রমনার মাঠ ব্যবহার উপযোগী করতে ইংরেজদের সহায়তা করেন, যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান হিসেবে পরিচিত লাভ করে।
ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের তিনি মূল্যবান ট্রফি উপহার দিতেন এবং এতে অংশ নিতে আগত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে নৈশভোজ ও নাচ গানের আয়োজন করতেন। এ ব্যবস্থাদি নওয়াব আবদুল গনি ও আহসানুল্লাহর আমল পর্যন্ত চালু ছিল। নওয়াব আবদুল গনি ঢাকা ও কলকাতায় ঘোড়দৌড়ের জন্য উন্নতমানের ঘোড়া পালতেন এবং ঢাকার রেসে অনেক সময় নিজেরাও অংশ নিতেন। ১৮৯০ এর দশকে ঢাকার ঘোড়দৌড়ে ‘নওয়াব আহসানুল্লাহ পার্স’ নামে একটি মূল্যবান ট্রফি দান করা হয়।
অ্যামেইজিং ব্যাপার হল, বরিশালেও ঢাকা-কলকাতার অনুকরনে Barisal Horse Race Committee নামে একটি সংগঠন গড়ে উঠেছিল। শ্বেত পাথরে খোদাই করা তাদের নামটি এখনো দৃশ্যমান বরিশাল সদর হাসপাতাল ডোনার লিস্টে। গবেষণার কাজে, সদর হাসপাতালের কিছু ছবি তুলতে এসে এই সংগঠনের নাম প্রথমে নজরে আসে। অনলাইনে বিভিন্ন আর্কাইভে খুঁজে তাদের ব্যাপারে তেমন কোন তথ্য পাইনি। এ সংগঠনের সাথে কারা যুক্ত ছিল, তাদের কার্যক্রম কি রকম ছিল, কিছুই জানা যায় নি। অনুমান করা যায়, বেলস পার্কেও একসময় অনুরূপ ঘোড়দৌড় হতো। তাদের সদস্যরা অংশগ্রহন করতেন, কিংবা ঢাকা ও কোলকাতার ঘোড়দৌড়ে টাকা লগ্নি করতেন।
Muhammad Wahidur Rahman
BARISHAL – 250 years History in Photographs & Stories
