বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হলেও সক্ষমতা অনুযায়ী চাহিদা তৈরি করতে পারেনি সরকার। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাই মহাপরিকল্পনা পুনর্মূল্যয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে রাজস্বে যাতে চাপ সৃষ্টি না হয়, পুনর্মূল্যায়নের সময় তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। ১৮ মার্চ বৃহস্পতিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনা : বিদ্যুতের যৌক্তিক চাহিদা প্রক্ষেপণে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল ডায়ালগে (অনলাইন সংলাপ) বক্তারা এমন মতামত দেন।
সংলাপে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মহাপরিকল্পনায় চারটি প্রধান মৌলকে কাজে লাগানোর সুপারিশ করা হয়। প্রথমত, একটি প্রাগৌশর পদ্ধতি ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত, আগের পরিকল্পনায় যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো দূর করা। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত যে বিদ্যুৎ সক্ষমতা রয়েছে সেগুলো কিভাবে কমিয়ে আনা যায় তার একটি দিকনির্দেশনা থাকা দরকার, চতুর্থত, কিভাবে ক্লিন এনার্জি বা পাওয়ারের দিকে যাওয়া যায় সেজন্য কাজ করা।
সংলাপের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মহাপরিকল্পনা নিয়ে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেটিকে আমরা অভিনন্দন জানাই। এটি এমন একটা সময় নেয়া হলো যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমরা নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। জাপান ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশকে আমরা সাধুবাদ জানাই। মহাপরিকল্পনা পুনর্মূল্যয়নে তারা আমাদের দেশের বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্টকে সহায়তা দেবে। একইসঙ্গে আমরা মনে করি জিরো কার্বন নিঃসরণে তারা কী উদ্যোগ নিতে চায়। সেটিও আমাদের অবহিত করবে।
মূল প্রবন্ধে পিএসএমপির ক্ষেত্রে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে, বিশেষত স্বল্প সংখ্যক সূচক ব্যবহার করে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, জিডিপি ব্যবহার করে হিসাব করা হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
মহাপরিকল্পনায় আর্থিক ঝুঁকির বিষয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে আর্থিক দায়ের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। একইসঙ্গে অতিরিক্ত যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে সেগুলো কমিয়ে নিয়ে আসার এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ যে ম্যাথড ব্যবহার করে বিশেষ করে টপ ডাউন বা বটম অ্যাপ ম্যাথড সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটি সুবিধাজনক সেটি ব্যবহার করা দরকার। তথ্য-উপাত্তের যে ঘাটতি রয়েছে সেটির জন্য নতুন করে যদি জরিপ চালানোর প্রয়োজন পড়ে তাহলে সেটি করতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রক্ষেপন অনুযায়ী চাহিদায় যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সেটি নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় না গিয়ে পাঁচবছর এবং দশ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ-জ্বালানির অর্থায়নগত জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে।
তিনি বলেন, আমরা যদি ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেখি সেখানে দেখা গেছে, যে পরিমাণ পাওয়ার প্ল্যান্ট হওয়ার কথা ছিল তার ৬০ শতাংশ মাত্র কাজ শুরু করতে পেরেছিল, বাকি ৪০ শতাংশ করতে পারেনি। এখন যেসব পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেখানেও চ্যালেঞ্জ হবে। সেক্ষেত্রে আরও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করা উচিৎ।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখেছে। তবে এখন সময় এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা। ভবিষ্যতের জ্বালানি সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনে গুরুত্ব দিতে হবে। আর এজন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মাতারবাড়িতে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে সেটি নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক হবে এমন কোন সিদ্ধান্ত নেবে না জাপান।
মহাপরিকল্পনায় দেশীয় বিশেষজ্ঞ না রাখায় সমালোচনা করে প্রফেসর আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের একটা মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে-অথচ সেখানে দেশীয় কোন বিশেষজ্ঞ রাখা হয়নি। গত ৫০ বছরে কি দেশে কোন বিশেষজ্ঞ তৈরি হয়নি? জানি না সরকার এটা কিভাবে দেখছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পটভূমি বিবেচনা করে কী ধরনের জ্বালানি প্রয়োজন, দেশের সঙ্গে সেটা কিভাবে যাচ্ছে, সেটি কী দেশীয় বিশেষজ্ঞদের ধারণা নেই? এখানে জাপানি বিশেষজ্ঞ দিয়ে মহাপরিকল্পনা করায় তাদের দেশের প্রকৌশলী ও কোম্পানিদের বিশেষ আগ্রহের জায়গা রয়েছে। তারাই এদেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করছে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মাদ হুসাইন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মহাপরিকল্পনা যে ধরনের চ্যালেঞ্জগুলো মূল প্রবন্ধে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি আমরা অস্বীকার করছি না। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে যে কাজ করছি না সেটি বলা ভুল হবে। এছাড়া বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতায় যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে সেটিও এখন দৃশ্যমান। কিভাবে এটা চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় সেটা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে সরকার।
বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান করিম বলেন, বিদ্যুৎ জ্বালানি নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি উৎপাদন কমিয়ে মহাপরিকল্পনায় জীবাশ্ম জ্বালানি এবং এলএনজির ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, সেখানেও কিন্তু চ্যালেঞ্জ কম নয়। চলতি বছরের শুরুতে এলএনজি এবং কয়লার যে বাজার তাতে এ ধরনের অনিশ্চিত জ্বালানি নিয়ে পরিকল্পনার চাইতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।
সংলাপে অংশ নিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন বুয়েটের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন, বাংলাদেশে জাইকার প্রধান প্রতিনিধি ইউহো হায়াকাওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রোডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা প্রমুখ।