বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৫ অপরাহ্ন

অনিয়মে ধুকছে ব্যাংকিং খাত!

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৬৪ জন নিউজটি পড়েছেন

একটি দেশের ব্যাংকিং খাত ভেঙে পড়লে অর্থনীতি সচল থাকার সুযোগ নেই। করোনা ভাইরাস পূর্ববর্তী ব্যাংকিং খাতের অবস্থা ভালো ছিল না মোটেই। তখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। আর করোনা মহামারির আঘাতে ল-ভ- অবস্থা। এদিকে ক্ষমতা থাকলেও আইন প্রয়োগে আগ্রহ নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের। ফলে বারবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ফলে ব্যাংক খাতের সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বাড়ছে অনিয়ম, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ।

করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে গত বছরজুড়েই বিশেষ ছাড় দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরমধ্যেই ব্যাংকগুলো সম্পর্কের ভিত্তিতে বিভিন্ন কৌশলে সিএসএমই, কৃষি, রিটেইল, ক্রেডিট কার্ডসহ ছোট ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে কিস্তির টাকা আদায় করলেও বড়দের কাছ থেকে আদায় পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার একটি সংস্কৃতি চালু হয়ে গিয়েছিল। এখন করোনা ভাইরাস সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগ এ সংস্কৃতিকে স্থায়ী রূপ দিচ্ছে।

গত ডিসেম্বর শেষে কিস্তি পরিশোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া ছাড় উঠে গেলেও ঋণ আদায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যাংকাররা। এ অবস্থায় ঋণের কিস্তি পরিশোধে সময় বাড়ানোর বিষয়ে আবেদন করেছেন ব্যাংক মালিকরাই। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন তারা। তবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণের কিস্তি আদায় নিয়ে চলছে রীতিমতো হ-য-ব-র-ল অবস্থা। মূলত সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং খাতে এ নৈরাজ্য চলছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ঋণের কিস্তি আদায় নিয়ে চলছে রীতিমতো হ-য-ব-র-ল অবস্থা। মূলত সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং খাতে এই নৈরাজ্য চলছে। এটি থামানো জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে করোনা ভাইরাসের সূচনাকাল তথা গত বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ এ তিন মাসে বড় শিল্পের মেয়াদি ঋণ আদায় কমেছে ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অথচ একই সময়ে মাঝারি শিল্পের ঋণ আদায় ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং ছোট ও কুটির শিল্পের ঋণ আদায় ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়েছিল। এপ্রিল থেকে জুনÑ এ তিন মাসে বৃহৎ শিল্পের মেয়াদি ঋণ আদায় কমেছে ৫৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। করোনা ভাইরাস সৃষ্ট অচলাবস্থার এ সময়েও বড়দের তুলনায় মাঝারি ও ছোটরা ব্যাংকঋণের কিস্তি বেশি পরিশোধ করেছে। এ তিন মাসে মাঝারি শিল্পের মেয়াদি ঋণ আদায় কমেছিল ৪০ দশমিক ৯২ শতাংশ। আর ছোট ও কুটির শিল্পের মেয়াদি ঋণ আদায় ৪৪ দশমিক ১৮ শতাংশ কমেছিল। বড়দের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের দীনতা এখনো চলছে বলে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন।

করোনা ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের দুই দফায় বাড়িয়ে প্রণোদনা প্যাকেজের আকার উন্নীত করা হয় ৪০ হাজার কোটিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর শেষে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের এ প্যাকেজের ৯৫ শতাংশ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। যদিও সিএসএমই খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে ব্যাংকগুলো। আবার কৃষিসহ ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষিত প্যাকেজের অর্ধেকও ব্যাংকগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় চলতি মূলধন পাওয়ায় বড় গ্রাহকদের ঋণের পরিমাণ আরো বেড়েছে।

দেশের ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি তিন মাস পর ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনটির জুন সংখ্যায় ব্যাংকগুলোর স্ট্রেস টেস্টিং বা ঝুঁকি সক্ষমতা বিষয়ে বলা হয়, দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৩ শতাংশ বাড়লে পাঁচটি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সক্ষমতা হারাবে। একইভাবে খেলাপি ঋণের হার ৯ শতাংশ বাড়লে মূলধন সক্ষমতা হারাবে ৩০টি ব্যাংক। আর খেলাপি ঋণ ১৫ শতাংশ বাড়লে ৩৬টি ব্যাংক মূলধন সক্ষমতা হারাবে।

বড় গ্রাহকদের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে যাওয়ার বিষয়ে স্ট্রেস টেস্টিং প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর শীর্ষ তিনজন গ্রাহক খেলাপি হলে ২৩টি ব্যাংক মূলধন সক্ষমতা হারাবে। অর্থাৎ শীর্ষ তিনজন গ্রাহকের ভাগ্যের সঙ্গে ২৩টি ব্যাংকের ভাগ্যও অনেকটা ঝুলে গেছে। আর শীর্ষ সাত গ্রাহক খেলাপি হলে প্রয়োজনীয় মূলধন সক্ষমতা হারাবে ৩৫টি ব্যাংক। শীর্ষ ১০ গ্রাহক খেলাপি হলে ৩৮টি ব্যাংক মূলধন সক্ষমতা হারাবে।

এদিকে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধে ছাড় দেয়ায় নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। এ ছাড়া বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালার আওতায় ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরের জন্য ঋণ পরিশোধের সুবিধায় আগের খেলাপি ঋণ ও এখন খেলাপি হতো এমন অনেক ঋণ নিয়মিত হয়েছে। সব মিলে কমেছে খেলাপি ঋণ।

তবে খেলাপি ঋণ কমার এ তথ্য প্রকৃত নয়, কাগজে-কলমে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে যেসব খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে সেটা আসলে রিয়েল না। এটাকে আমরা বলি কার্পেটের তলায় ফাঁকা। আরেকটা হলো, ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন করে ঋণ খেলাপি করতে নিষেধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নিষেধের কারণে নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হচ্ছে না। এটাও জোর করে করা হয়েছে। কাজেই খেলাপি ঋণের কমার পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

জানা গেছে, কোভিডের প্রভাবে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে গেল বছরজুড়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করা ও ঋণ শ্রেণিকরণ বন্ধ রাখার সুবিধা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে নতুন করে খেলাপি বাড়েনি উল্টো গেল বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ৩১ জানুয়ারি এক সার্কুলারে, চলতি বছর থেকে ঋণ শ্রেণিকরণ শুরু এবং মেয়াদি ঋণ (টার্ম লোন) ছাড়া অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রে কিস্তি পরিশোধ না করার সুবিধা বাতিল করা হয়। টার্ম লোনের ক্ষেত্রে কিস্তি পরিশোধে আরো দুই বছর সময় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ অবস্থায় জানুয়ারিতে খেলাপি ঋণের মেয়াদ গণনা শুরু হলেও ঋণ আদায় নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যাংকাররা। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, জানুয়ারি থেকে ব্যাংকারদের জন্য চ্যালেঞ্জিং টাইম শুরু হয়েছে। গ্রাহকরা টাকা না দিলে খেলাপি ঋণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ঋণ শ্রেণিকরণের মেয়াদ আরো বাড়ানো হলে সংকটের ঢেউ হয়তো কিছুটা বিলম্বিত হবে। তবে ব্যাংকগুলোর জন্য বড় ধরনের বিপদ আসছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢালাও সিদ্ধান্ত না নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কিছু বিষয় ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়াই মঙ্গল। শিল্প খাত ও গ্রাহক বেঁধে ব্যাংকগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এজন্য সরেজমিনে গ্রাহকদের পরিস্থিতি দেখা দরকার। আর ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর স্বাধীনতা বাড়ালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও চাপ কমবে।

দেশের ব্যাংকাররা যখন ঋণের কিস্তি আদায় নিয়ে উদ্বিগ্ন ঠিক তখন ঋণের কিস্তি পরিশোধে আরো সময় বাড়ানোর জন্য গত ৪ ফেব্রুয়ারি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। চলমান বা তলবি ঋণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে চিঠিতে বলা হয়, মোট ঋণের ৬৫-৭০ শতাংশই এই ধরনের ঋণ। কোভিডের প্রভাবে এখনো ব্যবসা-বাণিজ্যে আগের মতো গতি আসেনি।

অন্যদিকে, কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ চলায় রপ্তানি বাণিজ্য শ্লথ। এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে যেতে পারে আশঙ্কা করে, চলমান ঋণের যে অংশ পরিশোধ হয়নি তা মেয়াদি ঋণ হিসেবে বিবেচনা করে তিন বছরের জন্য রিসিডিউলের মাধ্যমে পরিশোধের সুবিধা দেয়ার দাবি জানানো হয়। এ বিষয়ে গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন সংগঠনের নেতারা।

এ বিষয়ে বিএবির চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, আমরা বলেছি যাতে পেমেন্টটা আরো শিথিল করা হয়। এমনভাবে শিথিল করতে হবে যাতে ব্যাংকেরও ক্ষতি হবে না, আবার গ্রাহকও চাপে না পড়ে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English