তামাক ও ধূমপান জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি। বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হন ধূমপানকারী। শুধু ধূমপায়ী না, ধূমপানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরোক্ষভাবে অধূমপায়ীরাও; এমনকি শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। দেশে ধূমপানের ব্যাপকতা হ্রাসের লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন এবং নানা ধাপে তা সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতির কারণে আইনের সুফল মেলে কদাচিৎ।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো জানায়, তামাকের ভয়াবহতা হ্রাসে সরকার ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে গৃহীত আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসিতে (ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল) স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু নানা ঘাটতি ও অস্পষ্টতার কারণে আইনটি ততটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই ২০১৩ সালের মে মাসে আইনটি সংশোধিত আকারে পাস হয়।
সর্বশেষ গত ১২ই মার্চ পাস হয় সংশোধিত আইনের আলোকে তামাক নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০১৫।
সংশোধিত আইন ২০১৩ ও বিধিমালা ২০১৫-তে নারী-শিশুসহ সব অধূমপায়ীকে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার থেকে রক্ষায় কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।
তামাকবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের ভাষ্য, বারবার আইন পরিবর্তনের তুলনায় বেশি প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ। বিদ্যমান আইনে যে যে বিধানগুলো রয়েছে তা প্রয়োগে উদাসিনতা দেখা যায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর।
২০০৫ ও ২০১৩ সালের ধূমপানবিরোধী আইনের বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ইকবাল মাসুদ । তিনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫-এর তুলনায় ২০১৩ এর সংশোধনে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। ধূমপানমুক্ত এলাকার পরিধি বেড়েছে। ২০১৩ সালের সংশোধনীতে শিশুপার্ক এবং রেস্তোঁরাকে ধূমপানমুক্ত এলাকা হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। ২০০৫ এ শিশুদের কাছে সিগারেট, বিড়ি, তামাক দ্রব্য বিক্রির নিষেধাজ্ঞা ছিল না, তবে সংশোধনে তা সম্পৃক্ত করা হয়েছে।’
ইকবাল মাসুদের মতে, সংশোধিত আইনে বেশ কিছু বিষয় সংযুক্ত করা হলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ হয়নি। ফলে আইনের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশোধিত আইনে, ১৮ বছরের নিচে কারো কাছে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার সুযোগ রয়েছে। আর একবারের বেশি এই অমান্যের জন্য জরিমানার হার পর্যায়ক্রমিকভাবে দ্বিগুণ হবে। তবে আইন থাকলেও এই প্রয়োগ হয় সামান্যই।
২০১৮ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে জুড়ে বসা সিগারেটের দোকান নিয়ে একটি গবেষণায় করেছিল তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞা। প্রতিষ্ঠানটির তামাক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক কর্মসূচি প্রধান মো. হাসান শাহরিয়ার জানান, ওই গবেষণায় তারা দেখেছিলেন বাংলাদেশের স্কুলের আশপাশের ৯০ শতাংশ দোকানে সিগারেটসহ বিভিন্ন তামাক ও তামাকজাত পণ্য বিক্রি করা হয়।
ওয়ার্ক ফর অ্যা বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সৈয়দা অনন্যা রহমান বলেন, ২০০৫ এর আইনের নানান অস্পষ্টতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে ২০১৩ সালের সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে। সংশোধনীর কিছু প্রয়োগ হচ্ছে, যেমন বিজ্ঞাপন না দেয়া, সতর্কবার্তা বড় করে লেখা, তবে বিভিন্ন সিগারেটের দোকানে কৌশলে পণ্যের প্রদর্শন অব্যাহত রয়েছে।
তামাকবিরোধী আন্দোলনকারীরা জানান, ধূমপান নিয়ন্ত্রণে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের অভাবে ধূমপায়ীরা স্থান কাল মানেন না। শহরের যেখানে সেখানে লোকসমাগমের জায়গায় সিগারেটের দোকান, ভ্রাম্যমাণ দোকানে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পাওয়া যায়। ধূমপানের কুফল সম্পর্কে ব্যাপক ভিত্তিতে প্রচারণা চালাতে হবে। এর পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থানে ধূমপান করলে শাস্তির বিধান রেখে সরকার যে আইন করেছিল, তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগের শিথিলতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে বসা স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ দোকানে সিগারেট বিক্রি হয়। দেশকে তামাকমুক্ত করতে হলে এখনই জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, ধূমপায়ীদের সতর্ক করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সমন্বয়ক অতিরিক্ত সচিব হোসেন আলী খোন্দকার জানান, তাঁরা তামাকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখছেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনের আরও দৃঢ় প্রয়োগ করা হবে। জেলা পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আইনের প্রয়োগের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয় যাতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে সিগারেট বিক্রি করা না হয় এবং জনপরিসরে ধূমপান বন্ধ করা যায়।