সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩২ অপরাহ্ন

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২০
  • ৮৪ জন নিউজটি পড়েছেন

জীবন কি এখন বেশি কঠিন লাগে? পাঠকদের প্রতি এই প্রশ্ন নিবেদন করার সুস্পষ্ট কারণ আছে। পাল্টা প্রশ্নও শুনতে হতে পারে যে জীবন সহজ ছিল কবে? হ্যাঁ, তেমনটা জিজ্ঞেস করতেই পারেন। কিন্তু মহামারির জীবন তো রকমেসকমে প্রচণ্ড আলাদা। এতটাই যে গত জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসের দিনগুলোর কথা মনে করেও গুনগুনিয়ে উঠতে পারেন ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…’

নতুন করোনাভাইরাস মহামারি পুরো পৃথিবীতেই ওলট-পালট এনেছে। এটা পুরোনো কথা। শুরুতে যে লাইনটা লিখলাম, সেটিও এখন অনেক ক্লিশে হয়ে গেছে। এখন আসলে পরিবর্তন অনুভব হচ্ছে হাড়ে হাড়ে। ধরুন, আগে জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা উদ্‌যাপন করতে হয়তো প্রিয়জনকে নিয়ে হুট করেই চলে যেতেন কাছেপিঠে কোথাও। কোনো রেস্তোরাঁয় বসে হয়তো জম্পেশ পেটপূজা করা হতো। কিন্তু এখন বাইরের খাবার মুখে ঢোকানো হবে কি না, সেটাই ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন যদি কোনো খাদ্যরসিকের অতীতের ভালো-মন্দ খাওয়ার স্মৃতি মনে পড়ে এবং হৃদয় সিক্ত হয়ে ওঠে, তবে কি তা দোষের হবে?

অতীতের ভালো-মন্দ বর্তমানের জীবনে স্মৃতি হিসেবে ফিরে ফিরে আসা এবং মনকে আর্দ্র করে দেওয়ার এই প্রবণতার পোশাকি নামই হলো ‘নস্টালজিয়া’। বিদেশি এই শব্দকে বাংলায় তর্জমা করলে এমন দাঁড়ায় হারিয়ে ফেলা দিনগুলোকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কারণে-অকারণে নানা সময়ে মানুষ নস্টালজিয়ায় সময় কাটাতে পারে। তবে গবেষকেরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারির এই নিদারুণ সময়ে নস্টালজিয়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলার প্রবণতা বিশ্বজুড়েই ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যেকোনো সংকটের সময়ে অতীতের সুখকর অনুভূতি স্মরণ করাও মানুষের জন্য বেশ স্বাভাবিক।

পেশায় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ভ্যালেন্টিনা স্টয়চেভা। তিনি ‘দ্য আনকনশাস: থিওরি, রিসার্চ অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমপ্লিকেশনস’ নামে একটি বইও লিখেছেন। ভ্যালেন্টিনা বলছেন, সংকটে মানুষ ট্রমায় ভুগতে পারে। ট্রমা মানুষের জীবনকে সংকটের আগে ও পরে—এই দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। এমন সময়ে মানুষ নস্টালজিয়ায় ভর করে। উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেতেই মানুষ অতীতের সুখ খোঁজে এবং এতে কাজও হয়। নস্টালজিয়া মানুষকে বর্তমানের সংকট কাটিয়ে উঠতে আবেগপ্রবণ সমর্থন দেয়।

চলতি বছর জার্নাল ফ্রন্টিয়ার্সে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তাতে গবেষকেরা বলেছেন, নস্টালজিয়া একাকিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানুষকে সাহায্য করে। ২০১৩ সালে ‘সোশ্যাল অ্যান্ড পারসোনালিটি সাইকোলজি কম্পাস’ নামের জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, নস্টালজিয়া একজন ব্যক্তির মানসিক সুস্থতার হার দ্বিগুণ করে দিতে সক্ষম।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ট্রমা রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক ও ট্রমা বিশেষজ্ঞ ফ্লোরেন্স সেন্ট-জ্যঁ বলছেন, সংকটের সময়কে সামাল দিতেই মানুষের মস্তিষ্ক ব্যক্তিসত্তাকে একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে চায়। স্বাভাবিকভাবেই এই নিরাপদ গন্তব্য হয় অতীতের কোনো সুখকর স্মৃতি, সেখানেই মানুষ নিতান্ত বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতেও ভালোবাসা খুঁজে পায়।

নস্টালজিয়া একাকিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানুষকে সাহায্য করে। ২০১৩ সালে ‘সোশ্যাল অ্যান্ড পারসোনালিটি সাইকোলজি কম্পাস’ নামের জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, নস্টালজিয়া একজন ব্যক্তির মানসিক সুস্থতার হার দ্বিগুণ করে দিতে সক্ষম।
অথচ মজার বিষয় হলো এই নস্টালজিয়াকে দীর্ঘদিন মানুষ একধরনের অসুখ হিসেবে ভেবে এসেছিল। ১৬ শতকের দিকে নস্টালজিয়াকে মনে করা হতো ‘শয়তান’ ও ‘অশুভ শক্তি’ হিসেবে। দুটি গ্রিক শব্দ ‘Nostos’ (বাড়ি ফেরা) ও ‘Algos’ (যন্ত্রণা) নিয়ে সেই শতকের শেষের দিকে তৈরি হয় নস্টালজিয়া শব্দটি। ১৭ ও ১৮ শতকের দিকে ধারণা করা হতো, নস্টালজিয়া একধরনের স্নায়ুরোগ এবং অশুভ কারণেই এর সৃষ্টি হয়। আবার ১৯ ও ২০ শতকের দিকে যখন প্রচুর অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছিল, তখন বলা হতো অভিবাসীদের কাছ থেকেই নস্টালজিয়ার উদ্ভব। এই প্রবণতা যাদের মধ্যে দেখা যেত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো। এসব ভ্রান্ত ধারণার কারণে নস্টালজিয়ার তথাকথিত চিকিৎসাপদ্ধতিও প্রচলিত ছিল এবং এটি পুরোটাই তৈরি হয়েছিল অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভর করে। শোনা যায়, ১৭৩৩ সালে এক রুশ জেনারেল নাকি নস্টালজিয়ার প্রবণতা দেখা দেওয়া ব্যক্তিকে জীবন্ত অবস্থায় মাটিতে পুঁতে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন। বুঝুন অবস্থা!

তবে বিশ শতকের শেষ দিকে এমন ভাবনায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। নস্টালজিয়া যে একটি মানসিক অবস্থা, সেটি মানুষ বুঝতে শুরু করে। ফলে এর প্রতি সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হতে থাকে। আধুনিক সংজ্ঞা অনুযায়ী নস্টালজিয়া হলো অতীতের প্রতি মানুষের একধরনের আবেগপ্রবণ আকাঙ্ক্ষা। সাধারণত অতীতের এমন কোনো সময় বা স্থানের প্রতি মানুষ নস্টালজিক হয়, যার সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত সুখকর স্মৃতির সম্বন্ধ আছে।

সংকটে মানুষ ট্রমায় ভুগতে পারে। ট্রমা মানুষের জীবনকে সংকটের আগে ও পরে—এই দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। এমন সময়ে মানুষ নস্টালজিয়ায় ভর করে।
ভ্যালেন্টিনা স্টয়চেভা, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট
এতক্ষণ নস্টালজিয়ার ভালো ভালো দিক জানা গেল। তবে এটি শুধুই কুসুমাস্তীর্ণ পথ নয়; অতীতচারী হয়ে সুখ খুঁজতে গিয়ে দুঃখও মাথায় ঢুকে যেতে পারে। আর তখনই বিপদ। দেখা যাবে, বর্তমানের সংকট থেকে উদ্ধার হওয়া দূরে থাক, উল্টো বিষাদের চোরাবালিতে আরও ডুবে যাচ্ছেন। ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অব সোশ্যাল সাইকোলজি’তে ২০১২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, যেসব মানুষের দুশ্চিন্তা করা বা উদ্বেগে ভোগার অভ্যাস রয়েছে, তারা নস্টালজিক হলে অনেক সময় ততোধিক উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। আবার অতীতে ঘুরতে ঘুরতে যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেই ভুলে যান, তাহলেও বিপদ। এ থেকে বাঁচার তরিকাও বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, কেন একজন ব্যক্তি নস্টালজিয়ায় ভর করছেন, সেই প্রশ্ন নিজের কাছেই নিজেকে তুলতে হবে। এতে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবেন যে কেন তিনি অতীতচারী হচ্ছেন। উদ্দেশ্য বুঝতে পারলে মনকে নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হবে।

যেসব মানুষের দুশ্চিন্তা করা বা উদ্বেগে ভোগার অভ্যাস রয়েছে, তারা নস্টালজিক হলে অনেক সময় ততোধিক উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। আবার অতীতে ঘুরতে ঘুরতে যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেই ভুলে যান, তাহলেও বিপদ।
অনেক কথা হলো। হাঁসফাঁস বোধ হলে একটু অতীতচারী তাই হওয়া যেতেই পারে। তবে সাবধান, কাঁটা সরিয়ে পথ চলতে হবে। অতীতকে মনে করে এগিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। হয়তো একদিন এই আজকের কোনো সুখস্মৃতি হয়ে উঠবে আপনার ভবিষ্যতের নস্টালজিয়া!

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English