জীবন প্রবাহ সময়কেন্দ্রিক; কখনো জীবন প্রহরে বিস্তার করে ধূসর জীর্ণতা, আবার কখনো বা শরতের প্রকৃতির মতো জীবন হয় সবুজ গালিচার সদৃশ্য। পুরো পৃথিবী আজ সমস্যাগ্রস্ত, নানা রকম সমস্যার মধ্যেই জীবন কাটাতে হয়। কারণ রব্বে কারিম চান বান্দা যেন দুনিয়াবি সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জান্নাতের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মানুষকে ক্ষমা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছেন, এর মধ্যে একটি হলো শীত মওসুম। শীতের নেয়ামাতপূর্ণ সময়কে ইবাদতের সৌন্দর্যে সজ্জিত করে সহজেই রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করতে পারি আমরা।
শীতকালে অজুর ফজিলত : রাসূল সা: বলেন, আমি কি তোমাদের এমন বিষয়ের সংবাদ দেবো না, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের গোনাহ মুছে দেবেন এবং তোমাদের সম্মান বৃদ্ধি করবেন? তখন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল! রাসূল সা: বললেন ‘শীত বা অন্য কোনো কষ্টের সময়ে ভালোভাবে অজু করা।’ (মুসলিম : ২৫১)
আল্লাহকে স্মরণ : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি জিন ও মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদত করার জন্য।’ (সূরা আজ জারিয়াত : ৫৬) নামাজ এমন একটি প্রক্রিয়া যার সাহায্যে আরবের ধূসর মরুভূমির মৃতপ্রায় মানুষের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। একান্তে নির্জনে আল্লাহর সাথে কথা বলার জন্য প্রাত্যহিক একটি নির্দিষ্ট সময় থাকা মুমিন বান্দার জন্য অত্যাবশ্যক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেÑ অশ্রু; দোয়ার সাথে অশ্রুর দারুণ একটা সংযোগ রয়েছে; এই দুটি একত্র হলেই কেবল আসমানি দরজা খুলে যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারা যারা তাদের রবের দরবারে সেজদা করে এবং দাঁড়িয়ে থেকেই রাত কাটিয়ে দেয়।’ (সূরা ফুরকান-৬৪)
নৈকট্য অর্জনের অন্যতম পন্থা তাহাজ্জুদ : যখন প্রকৃতি নিশ্চল থাকে, পৃথিবীর মানুষ থাকে ঘুমে বিভোর তখন রব্বে কারিমের প্রতি একান্তে ভালোবাসার আবেশে হৃদয়ের প্রতিটি কোণা পরিপূর্ণতার সাথে যে তৃপ্তি অনুভব করা যায় তা পৃথিবীর আর কিছুতে নেই। অথচ কিছু মানুষ এমনভাবে নামাজ ছেড়ে দেয় তারা বুঝতেই পারে না শয়তানের প্ররোচনায় নামাজ ছেড়ে দিয়ে ইবাদতে এক প্রকার দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেছে, এরপর দুর্বল ঈমানের অধিকারীর কাতারে শামিল হয়ে তারা ফজরের ওয়াক্তে শয়তানি ওয়াসওয়াসায় ঘুমিয়ে থাকে। রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই ঠাণ্ডার সময়ে নামাজ আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (বুখারি-৫৭৪)
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে রোজা : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রোজার ফজিলত বহুগুণে গুণান্বিত করেছেন। রোজায় চারিত্রিক মাহাত্ম্য অর্জিত হয়, রোজা দুনিয়া ও আখিরাতে সুখ শান্তি লাভের উপায়। হজরত আমের ইবন মাসউদ রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূল সা: বলেন, ‘শীতল গণিমত হচ্ছে শীতকালে রোজা রাখা।’ (তিরমিজি-৭৯৫) ওই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম গাজ্জালি রহ. বলেন, ‘আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য শীতকালের চেয়ে প্রিয় কোনো সময় আছে কি না তা আমার জানা নেই, কারণ শীতের দিন ছোট এবং রাত বড় হয় তাই দিনে রোজা রাখা এবং রাতে নামাজে দাঁড়িয়ে থাকা সহজ হয়।
মানবিক দায়িত্ব : শীতের রুক্ষতায় বৃহত্তম এক শ্রেণী জর্জরিত। শীতবস্ত্র নেই অসংখ্য জনমানবের, রাস্তার পাশে কাঁপছে হাজারো শিশু, বৃদ্ধ, নারী। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলো তাদেরও প্রাপ্য; এদেরকে সাহায্য করার উত্তম সুযোগ এসেছে আমাদের কাছে। রাসূল সা: বলেন, ‘কোনো মুসলমান অপর মুসলমানকে বস্ত্রহীনতায় ঢাকতে কাপড় দিলে, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাকে জান্নাতে সবুজ চাদর পরাবেন, খাদ্য দান করলে তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন, পানি পান করালে তাকে জান্নাতের শরবত পান করাবেন।’ (আবু দাউদ)
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইবাদতে আমাদের স্থায়ীভাবে স্থির থাকার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের হৃদয়ে বঞ্চিতদের সাহায্য করার তীব্র ব্যাকুলতা জাগিয়ে দিন। আমিন।