অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে রূপালী ব্যাংকের রাইট শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এই ব্যাংকটি অনুমোদিত মূলধন ৭০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সময়ক্ষেপণের কারণে বিষয়টির দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সুরাহা হচ্ছে না। এই ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ করতে না পারায় ঋণপত্র (এলসি) খোলাসহ আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনা এবং ‘সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট’ কম হওয়ায় দেশ-বিদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে বলে দাবি করেছে ব্যাংকটি। এই পর্যায়ে রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে গেল জুলাই মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে এ বিষয়ে দ্বিতীয় দফা চিঠি পাঠিয়ে সহায়তা কামনা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
জানা যায়, প্রতিটি রাইট শেয়ারে প্রিমিয়ামের হার ২০ টাকা নির্ধারণ করেছে রূপালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। গত ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের বর্তমান পরিশোধিত মূলধন হিসাব করা হয়েছে ৪৩৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রস্তাবিত রাইট শেয়ারের সাবস্ক্রিপশন মূল্য বাবদ সরকারের কাছে অতিরিক্ত ১ হাজার ৬৭৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা চেয়েছে ব্যাংকটি। ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ইতঃপূর্বে সরকার রূপালী ব্যাংককে ৬৮০ কোটি টাকা দিয়েছে।
জানা গেছে, রাইট শেয়ার অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ। সেই তখন ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৭০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়। একই সাথে ২ঃ১ অনুপাতে (১টি শেয়ারের বিপরীতে ২টি) রাইট শেয়ার ছেড়ে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ বিষয়ে অনুমতির লক্ষ্যে একই বছর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে ব্যাংকের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়।
চিঠির জবাবে ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মতামত গ্রহণের জন্য রূপালী ব্যাংককে নির্দেশ দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সে নির্দেশ মোতাবেক ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। এ বিষয়ে বিএসইসির মতামত পাওয়া গেলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো মতামত পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র মতে, রূপালী ব্যাংকের প্রস্তাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি নেই। বিষয়টি অনুমোদনের জন্য সর্বশেষ চলতি বছরের ৬ জুলাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পুনরায় চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ করতে নাÑ পারায় ঋণপত্র (এলসি) খোলাসহ আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনা এবং ‘সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট’ কম হওয়ায় দেশ-বিদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় রূপালী ব্যাংক ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ মনে করে, মোট রেগুলেটরি ক্যাপিটাল, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সংরক্ষিতব্য ন্যূনতম মূলধন ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের শতকরা ১২ দশমিক ৫০ ভাগ বিবেচনায় অবিলম্বে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো প্রয়োজন।
চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন সময় সরকার কর্তৃক পুনঃঅর্থায়ন করা হলেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক যেভাবে সরকার থেকে প্রাপ্ত অর্থ মূলধন হিসেবে সরাসরি গ্রহণ ও হিসাবায়ন করতে পারে রূপালী ব্যাংকের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বিএসইসির অনুমোদন ছাড়া রূপালী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, অনুমোদিত মূলধন না বাড়িয়ে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে রূপালী ব্যাংকের অনুমোদিত ও পরিশোধিত উভয় মূলধনই বাড়াতে হবে। অন্য দিকে রাইট শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে হলে বিএসইসি কর্তৃক প্রণীত ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রাইট শেয়ার) রূলস ২০০৬’ মোতাবেক তা করতে হবে। এ জন্য ৯টি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। এ আইনের আওতায় বিশেষ সাধারণ সভার মাধ্যমে ব্যাংকের সংঘস্মারক ও সংঘবিধির সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ পরিবর্তন (ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ১১৭ ধারা অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হবে), প্রিমিয়ামসহ ২ঃ১ অনুপাতে রাইট শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন, ইস্যু ম্যানেজার-এক বা একাধিক আন্ডার রাইটার ও ব্যাংকার টু দ্য ইস্যু নিয়োগ, দুই স্টক একচেঞ্জকে অবহিত করা এবং বিএসইসির অনুমোদন নিতে হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।