‘কিরামান কাতিবিন’ অর্থাৎ লেখকরা যারা করিম (অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাবান)। এসব ফেরেশতা কোনো রকম শত্রুতা বা ভালোবাসার সম্পর্কের ঊর্ধ্বে থেকে সব রকমের তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত থাকেন। তারা খেয়ানতকারী বা ঘুষখোর না। কাজের কর্তব্য ফাঁকি দিয়ে তাদের খাতায় মিথ্যা রেকর্ড করার কোনো সুযোগ নেই। তারা নিরপেক্ষভাবে মানুষের সব ভালো ও মন্দ কাজ রেকর্ড করে যাচ্ছে। মানুষ অন্ধকারে, একান্ত নির্জনে, জনমানবহীন গভীর জঙ্গলেও যদি কোনো কাজ করে যদি মনে করে সবার দৃষ্টির অগোচরে করেছে, সেটিও ফেরেশতারা লিখে রাখেন। আর এমন একটি ভয়াবহ দিন আসবে যে দিন সমুদ্রগুলোকে ফাটিয়ে ফেলা হবে। মহাভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রের নিচে পানি ভূগর্ভের অভ্যন্তরে নেমে আগ্নেয় লাভায় পরিণত হতে থাকবে এবং অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন উপাদান তৈরি হবে। এটি অব্যাহত প্রতিক্রিয়ায় চলতে থাকবে। আর সেই দিনটিতে আল্লাহ রেকর্ড পেশ করবেন তার বান্দাদের সামনে।
‘তখন প্রত্যেকেই জানতে পারবে সে আগে যা পাঠিয়েছে এবং পশ্চাতে কি ছেড়ে এসেছে।’ (সূরা ইনফিতার-৫)। অর্থাৎ তখন মানুষের কৃত আমল প্রকাশ পেয়ে যাবে; যা কিছু সে ভালো-মন্দ আমল করেছে, তা সামনে উপস্থিত পাবে। পশ্চাতে ছাড়া আমল বলতে উদ্দেশ্য হলোÑ নিজের চাল-চলন এবং আমলের ভালো অথবা মন্দ নমুনা (আদর্শ) যা মানুষ দুনিয়ায় ছেড়ে যায় এবং লোকেরা সেই আদর্শের ওপর আমল করে। এখানে আরবি ‘মা কাদ্দামাত’ ও ‘মা আকখারাত’ শব্দগুলো ইংরেজি শব্দ ঈড়সসরংংরড়হ ও ঙসরংংরড়হ-এর মতো। এবার যদি তার আদর্শ ভালো হয় এবং তার মৃত্যুর পরও লোকেরা তার আদর্শ অনুসারে আমল করে, তা হলে সেই সওয়াবও তার কাছে পৌঁছাতে থাকে। আর যদি সে মন্দ আদর্শ ছেড়ে যায় এবং সেই আদর্শ অনুযায়ী লোকেরা আমল করে, তা হলে সেই পাপের ভাগী সেও হয়।
মহান রাব্বুল আল আমিন শুধু যে করুণাময় ও অনুগ্রহশীল তা নয়, বরং তিনি জাব্বার ও কাহহারÑ মহাপরাক্রমশালী এবং কঠোর শাস্তি দানকারীও। আল্লাহ ভ্রƒণকে যার মতো ইচ্ছা তার রূপ ও আকারে সৃষ্টি করেন; তার চেহারা বাবা-মা, মামা অথবা চাচাদের মতো করেন। তিনি যার আকার ও আকৃতিতে চান, তার ছাঁচে ঢেলে দেন। এমনকি নিকৃষ্টরূপ জন্তুর আকৃতিতেও পয়দা করতে পারেন। কিন্তু তাঁর অনুগ্রহ, দয়া ও মেহেরবানি এই যে, তিনি তা করেন না; বরং তিনি সুন্দর অবয়ব দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করেন। কিন্তু মানুষ বড়ই নাফরমান জীব। এত এত করুণা ও অনুগ্রহ পেয়ে মানুষের উচিত ছিল আল্লাহর শোকরগুজারি হয়ে তাঁর রাজত্বকে মেনে নেয়া। অথচ যে তাকে সুন্দর অবকাঠামো ও অস্তিত্ব দিয়েছে, তা অস্বীকার করে নিজের বড়ত্ব প্রচার করে বেড়ায়। কিন্তু এই বড়ত্বের ধোঁকা যে সবচেয়ে বড় বোকামি তা মানুষ বুঝতে পারে না। বুঝতে পারে না মহাজ্ঞানী ও মহাশক্তিধর আল্লাহ এই পূর্ণাঙ্গ মানবিক আকৃতি দান করেছেন, যা মূলত কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। নিজের এত শ্রেষ্ঠত্ব পাওয়ার পর মানুষের উচিত ধোঁকায় না পড়ে নিজ নিজ দায়িত্ব আদায় করে নেয়া। ঠিক যেমন কেউ যখন কোনো কোম্পানির মালিক হলে চাকরদের থেকে কাজ আদায় করে নেয় কিন্তু চাকরদের নিজস্ব কোনো স্বকীয়তা তারা দাবি করতে পারে না।
আল্লাহ মানুষকে এ পৃথিবীতে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেননি। বরং তিনি ‘কিরামান কাতিবিন’ নিয়োগ রেখেছেন। তারা জানে, যা তোমরা করে থাকো। ‘মানুষ তো প্রতিদান ও শাস্তিকে অস্বীকার করে। কিন্তু মানুষের জেনে রাখা উচিত যে, প্রতিটি কথা ও কর্মকে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। আল্লাহর তরফ থেকে ফেরেশতা প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত আছে; যারা প্রতিটি কথাকে জানে, যা মানুষ করছে। এটি হলো মানুষের জন্য সতর্কবার্তা যে, প্রতিটি কর্ম করা ও প্রতিটি কথা বলার আগে চিন্তাভাবনা করে দেখা, এটি ভুল নয় তো।’ এক ফেরেশতা (মানুষের) ডানে ও অন্য এক ফেরেশতা (তার) বামে বসে আছে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই লিপিবদ্ধ করার জন্য তার কাছে তৎপর প্রহরী প্রস্তুত রয়েছে।’ (সূরা কাফ : ১৭-১৮)।
অর্থাৎ তাদের অবস্থা দুনিয়ার সিআইডি ও তথ্য সরবরাহ এজেন্সিগুলোর মতো নয়। অনেক তথ্য এদের কাছে অজানা থাকলেও ফেরেশতাদের তৈরি রেকর্ড একটি পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড। যার বাইরে কোনো মানুষের জীবনের গোপনীয়তার কোনো জায়গা নেই। এটিই আল্লাহর নির্দেশ, এটিই তাঁর কর্তৃত্ব। এবং সে দিন উপস্থিত করা হবে ‘আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে আতঙ্কগ্রস্ত এবং তারা বলবেÑ ‘হায়! দুর্ভোগ আমাদের! এটি কেমন গ্রন্থ! ওটা তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি, বরং ওটা সব হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে; তোমার রবও কারো প্রতি জুুলুম করেন না।’ (সূরা কাহফ-৪৯)। ‘সেদিন কেউই কারোর জন্য কিছু করার সামর্থ্য রাখবে না; আর সেদিন সব কর্তৃত্ব হবে (একমাত্র) আল্লাহর।’ (সূরা ইনফিতার-১৯)।
অর্থাৎ দুনিয়াতে তো আল্লাহ তায়ালা অস্থায়ীভাবে পরীক্ষা করার জন্য মানুষকে কমবেশি কিছু পার্থক্যের সাথে অধিকার বা এখতিয়ার দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু কিয়ামতের দিন সব এখতিয়ার পূর্ণরূপে কেবল আল্লাহরই হাতে থাকবে। যেমন তিনি বলেন, ‘আজ রাজত্ব কার? একক প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর।’ (সূরা মুমিন-১৬)। মহানবী সা: নিজ ফুফুজান সাফিয়া রা: ও স্বীয় কন্যা ফাতেমাকে বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে কোনো প্রকার উপকার করতে পারব না।’ (সহিহ মুসলিম ঈমান অধ্যায়) আর বনি হাশিম ও বনি আবদুল মুত্তালিবকেও সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে কোনো প্রকার উপকার করতে পারব না।’ (মুসলিম, বুখারি)।
একদিন সবাইকে একটি পূর্ণাঙ্গ রেকর্ডবই নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে, যেই রেকর্ডবই হবে নির্ভুল। যে কেউ ভালো কাজ করবে তা সে দেখবে আবার খারাপ কাজ করবে তাও সে দেখবে। ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে তা সে দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ মন্দকাজ করলে তাও সে দেখতে পাবে।’ (সূরা জিলজাল : ০৭-০৮)। ফলে সে তার ওপর খুবই লজ্জিত ও উদ্বিগ্ন হবে। ‘জাররাহ’ কোনো কোনো উলামার কাছে পিঁপড়ে থেকেও ছোট বস্তুকে বোঝায়। কেউ কেউ বলেন, মানুষ মাটিতে হাত মেরে তার পর হাতে যে মাটি অবশিষ্ট থাকে, সেটিকেই ‘জাররাহ’ বলা হয়। ইমাম মুকাতিল রহ: বলেন, এ সূরাটি সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যাদের একজন ভিখারিকে অল্প কিছু সদকা করতে ইতস্ততঃবোধ করত। আর অপরজন ছোট ছোট পাপ করতে কোনো প্রকার ভয় অনুভব করত না।’ (ফাতহুল কাদির)।