একশ’ দিন পর দেশে দৈনিক করোনা শনাক্তের সংখ্যা ২১শ’ ছাড়িয়েছে। একইসঙ্গে নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় করোনা শনাক্তের হারও ১০ শতাংশ পেরিয়ে গেছে। সংক্রমণ বৃদ্ধির এই প্রবণতায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে স্বাস্থ্য বিভাগে। তাদের দাবি, দেশে করোনার কয়েকটি নতুন ‘ভেরিয়েন্ট’ বা ‘ধরণ’ শনাক্ত হলেও সেগুলোর ‘ট্রান্সমিশন’ (ছড়িয়ে পড়া) হয়নি। কিন্তু মানুষজনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণে করোনার ‘সাধারণ সংক্রমণ’ দ্রুত বাড়ছে।
সুস্থতার চেয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় রোগী সামলাতে চাপ বাড়ছে ‘কোডিভ-১৯’ ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৮ মার্চ বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে দুই হাজার ১৮৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৫৩৪ জন করোনা রোগী।
সুস্থতার চেয়ে শনাক্তের সংখ্যা বেশি হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। গত বেশ কিছুদিন ধরে করোনায় যাদের মৃত্যু হচ্ছে তাদের প্রায় সবাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতালেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, এতদিন সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকায় জনসাধারণের একটি বড় অংশই মাস্ক পরা ছেড়ে দিয়েছিল, অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধিও মানেননি। এ কারণে সংক্রমণ বাড়ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে ছড়িয়ে পড়া করোনার কয়েকটি ‘ভেরিয়েন্ট’ (নতুন ধরণ) বাংলাদেশেও শনাক্ত হয়েছে। সেসব ভাইরাসের ‘ট্রান্সমিশন’ দেশে হয়নি বলে মনে করছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা প্রফেসর ডা. এসএম আলমগীর।
তিনি সংবাদকে বলেন, ‘বিদেশ থেকে কয়েকজন করোনার কয়েকটি ভেরিয়েন্ট বহন করে নিয়ে এসেছেন। এগুলো শনাক্ত হয়েছে। তারা আমাদের মনিটরিংয়ের আওতায় ছিল, তাদের থেকে ট্রান্সমিশনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট না ছড়ালে এখন এত দ্রুত সংক্রমণের কারণ কী এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি…যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল-সবদেশেই একই রকম। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে করোনার সংক্রমণ বাড়বেই। এখন যেভাবে মানুষ চলাফেরা করছে, তাতে সংক্রমণ আরও বাড়বে। মানুষ সচেতন হলে, সাবধান হলে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে তা নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
সংক্রমণ বাড়লেও আপাতত ‘লকডাউন’র চিন্তা-ভাবনা নেই
গত ১ মার্চ থেকে দেশে নিয়মিত করোনা শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে, একইসঙ্গে নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শনাক্তের হারও। ১ মার্চের আগে দৈনিক শনাক্তের হার ২-৩ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও বৃহস্পতিবার এ সংখ্যা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বৃহস্পতিবার রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের জানান, করোনা পরিস্থিতিতে ‘আপাতত লকডাউনে’র চিন্তা-ভাবনা নেই। লকডাউন বাস্তবায়ন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করে না। এটা বাস্তবায়ন করে সরকার।
সরকার ভেবে-চিন্তে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘১৫ দিনে ২০ লাখ লোক কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি ভ্রমণে গেছে। কেউ মাস্ক পরিধান করেননি। যারাই মাস্ক ছাড়া ঘুরেছে তারাই সংক্রমিত হয়েছে। বিয়ে-শাদিতে হাজার হাজার লোক অংশগ্রহণ করে কেউ মাস্ক পরিধান করে না। এই বিষয়গুলো যদি আমরা পরিহার করি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি তাহলে আমাদের লকডাউনের প্রয়োজন হবে না।’
সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, ‘আমরা যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি তা জেলা পর্যায়ে নির্দেশনা দিয়েছি। যাতে করে দেশের জনগণ করোনাভাইরাস রোধে মাস্ক পরিধান করে সামাজিক দূরত্ব বজায় চলবে। যারা মাস্ক পরিধান করবেন না তাদের জরিমানা করা হবে, এসব কার্যক্রম আবারও চালু করেছি এবং প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করেছি।’
ভিড় বাড়ছে হাসপাতালে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের ‘কোভিড-১৯’ ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে মোট সাধারণ শয্যা সংখ্যা ১০ হাজার ৪০৮টি এবং আইসিইউ (নিবির পরিচর্যা কেন্দ্র) শয্যা ৫৫৮টি। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাধারণ শয্যাগুলোতে ভর্তি ছিল দুই হাজার ৪০৭ জন এবং আইসিইউতে ভর্তি ছিল ২৮৬ জন।
এর আগে ১৭ মার্চ পর্যন্ত সাধারণ শয্যায় ভর্তি ছিল দুই হাজার ৩৬৭ জন এবং আইসিইউ’তে ছিল ২৮৭ জন। ১৬ মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালগুলোর সাধারণ শয্যায় ভর্তি ছিল দুই হাজার ২৬৩ জন এবং আইসিইউ’তে ছিল ২৭১ জন।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে দুই হাজার ১৮৭ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত শনাক্ত ‘কোভিড-১৯’ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে হয়েছে পাঁচ লাখ ৬৪ হাজার ৯৩৯ জন।
এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একদিনে এর চেয়ে বেশি দুই হাজার ২০২ জনের করোনা শনাক্তের তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।
২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার তুলনায় সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। একদিনে এর চেয়ে বেশি শনাক্তের হার ছিল গতবছরের ২৭ ডিসেম্বর। ওইদিন নমুনা পরীক্ষার তুলনায় ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল মোট সংখ্যা আট হাজার ৬২৪ জনে।
ওই ২৪ ঘণ্টায় বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও এক হাজার ৫৩৪ জন রোগী সুস্থ হয়েছেন। তাতে এ পর্যন্ত সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৫২৩ জনে।
গতবছরের ৮ মার্চম দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্তের কথা জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এক বছর পর গত ৭ মার্চ শনাক্ত রোগীর সাড়ে পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যায়। গত বছরের ২ জুলাই একদিনে সর্বোচ্চ চার হাজার ১৯ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়।
প্রথম করোনা শনাক্তের ১০ দিন পর গত বছরের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম একজনের মৃত্যুর তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত বছরের ৩০ জুন একদিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জনের মৃত্যুর খবর জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে করোনা শনাক্তের দিক থেকে ৩৩তম এবং মৃত্যুর সংখ্যায় ৪১তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশের সরকারি-বেসরকারি ২১৯টি ল্যাবে ২০ হাজার ৯২৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪৩ লাখ ৪৯ হাজার ১৯৪টি নমুনা।
গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ছিল ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় মোট শনাক্তের হার ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত এক দিনে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ ও নারী ৪ জন। তাদের প্রত্যেকেই হাসপাতালে মারা গেছেন। দেশে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া আট হাজার ৬২৪ জনের মধ্যে ছয় হাজার ৫২১ জন পুরুষ এবং দুই হাজার ১০৩ জন নারী।