বিশ্বব্যাপী মরণব্যাধিগুলোর মধ্যে স্ট্রোক অন্যতম। বাংলাদেশেও এটি মৃত্যুহারের জন্য দায়ী রোগগুলোর তালিকায় রয়েছে। তাই একে প্রতিরোধের জন্য এর উপসর্গ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখতে হবে। তবে আশার কথা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে স্ট্রোকের কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করলে জটিলতা এড়ানো যায়। এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। আর নিয়মমাফিক চলাফেরার মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসকেএফ নিবেদিত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এ পর্বের প্রধান আলোচক হিসেবে যোগ দেন ডা. শিরাজী শাফিকুল ইসলাম, স্ট্রোক ও ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজিস্ট, সহযোগী অধ্যাপক, ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল; বিশেষ অতিথি ডা. তানজিলা শামস কুলমান, ভাস্কুলার অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজিস্ট, সুবুরবান হসপিটাল, জন হপকিন্স ইউনিভার্সির্টি বেতেসদা, ম্যারিল্যান্ড, আমেরিকা এবং ডা. সুভাষ কান্তি দে, স্ট্রোক ও ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজিস্ট; সহযোগী অধ্যাপক (নিউরোলজি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
এ আয়োজনের আলোচ্য বিষয় ‘স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসায় মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমির ভূমিকা: বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্ব’। অনুষ্ঠানটি সরাসরি ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে সম্প্রচারিত হয়। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ডা. নাদিয়া নিতুল।
ডা. শিরাজী শাফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমি অ্যান্ডোভাস্কুলার পদ্ধতিতে চালু হয়েছে ২০১৮-১৯ সালের দিকে। তবে মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমির মাধ্যমে স্ট্রোকের চিকিৎসা বাংলাদেশে দেরিতে হলেও অন্যান্য পদ্ধতিগুলো অনেক আগেই চালু হয়েছে। কিন্তু মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমির জন্য যেসব ডিভাইস আমাদের দরকার, সেগুলো আমাদের দেশে পর্যাপ্ত নয় বলে এ ক্ষেত্রে আমরা খুব বেশি এগিয়ে যেতে পারিনি। তা ছাড়া এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকের পক্ষেই তা করানো সম্ভব হয় না। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
তবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং অন্যান্য দেশ, যেমন জাপান বা চীন ও আমেরিকা বা ইউরোপে এ ক্ষেত্রে অনেক বেশ অগ্রগতি দেখা যায়। এ পদ্ধতিতে চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইনস্যুরেন্সের মাধ্যমে বা সরকারিভাবে রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কারণে তারা অনেক দূর এগিয়েছে। আমাদের দেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ এটি খুব ব্যয়বহুল। তা ছাড়া আমাদের দেশের চিকিৎসকদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব এবং পাশাপাশি এর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষিত জনবল আমাদের নেই। এ ছাড়া আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এসব বাধার কারণেই আমরা এ পদ্ধতির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি না।
ডা. তানজিলা শামস কুলমান বলেন, আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে কারও স্ট্রোকের উপসর্গ (যেমন, কথা বলতে না পারা, হাত-পা কিংবা অন্যান্য অঙ্গ নাড়াতে না পারা) দেখা দেওয়ামাত্রই হাসপাতালে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালের আগে এর চিকিৎসায় এসপিরিন ও ক্লাভিক্স ব্যবহৃত হতো। এগুলোতে মৃত্যুঝুঁকি থাকায় নব্বইয়ের দশকে আমেরিকা ও ইউরোপে আইভিটিপিএর কিছু ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা হলো।
তবে এ পদ্ধতি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রয়োগ করতে হতো, এ সীমাবদ্ধতার কারণে স্ট্রোকের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা ব্যতীত এটি কোনো কাজেই আসত না। অর্থাৎ, একটু বিলম্ব হলেই এর মাধ্যমে রোগীকে সারিয়ে তোলা সম্ভব হতো না। তবে টিপিএ পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই হ্রাস পায়। কিন্তু তারপরও একটা বড় অংশ এ রোগের চিকিৎসা ঠিকমতো পাচ্ছিল না। পরবর্তী সময়ে মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমি পদ্ধতিতে চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক রোগী স্ট্রোকের মতো মারাত্মক শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি পায়।
ডা. সুভাষ কান্তি দে বলেন, মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমি পদ্ধতিতে চিকিৎসায় আমাদের দেশ পিছিয়ে থাকার একটি অন্যতম কারণ হলো, আমরা থ্রোম্বোলাইসিস শুরু করেছি একটু দেরিতে, ২০১৮ সালের দিকে। থ্রোম্বোলাইসিসের সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে স্ট্রোকের রোগীদের থ্রোম্বোলাইসিসের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে আলাদাভাবে মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমি পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হচ্ছে। মূলত থ্রোম্বোলাইসিস দেরিতে আসার কারণেই মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমিও বেশ দেরিতেই আমাদের দেশে চালু হয়েছে। আশার কথা এই যে আমাদের দেশে স্ট্রোকের প্রায় সব ধরনের চিকিৎসারই সুব্যবস্থা রয়েছে।
তবে এখানে মেকানিক্যাল ডিভাইসগুলোর অপ্রতুলতার কারণে অনেক সময় চিকিৎসায় একটু দেরি হলেই তা অনেক বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উল্লেখ্য, যেখানে মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমি পদ্ধতিতে চিকিৎসার প্রয়োজন, সেখানে অন্য পদ্ধতির ওপর ভরসা করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে। অর্থাৎ, মেকানিক্যাল থ্রোম্বেকটমির কোনো বিকল্প পদ্ধতি নেই। তাই সবাই এক হয়ে এর চিকিৎসায় এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, এতে প্রয়োজনীয় ডিভাইসগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখতে পারলে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এ পদ্ধতিতে স্ট্রোকের চিকিৎসার সুযোগ পাবে।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কিংবা এর পেছনের কারণগুলো জানা থাকলে আমরা সচেতন হতে সক্ষম হব। ফলে এর ঝুঁকি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারব। বলা যেতে পারে, বর্তমানে বাংলাদেশে স্ট্রোকের চিকিৎসার ধরন আগের চেয়ে অনেক উন্নত এবং এখানে বিশ্বমানের চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব।