রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন

করোনার নমুনা পরীক্ষা নীতিমালা চূড়ান্তে ধীরগতি

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৪৭ জন নিউজটি পড়েছেন

দেশে কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে ধীরে চলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দুই মাসেরও বেশি আগে মন্ত্রণালয়কে নীতিমালার বিষয়ে এক দফায় লিখিতভাবে জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেই লিখিত আবেদনের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত কমিটির তৈরি খসড়া নীতিমালাও যুক্ত করা হয়। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ওই খসড়া পরিমার্জন করে ফের মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু এই নীতিমালাটি চূড়ান্ত না করে ফের চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। নীতিমালার অভাবে করোনার অ্যান্টিজেন টেস্ট আটকে আছে।

৩১ আগস্ট কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি সম্প্রসারণ নীতিমালার সুপারিশ পর্যালোচনাক্রমে একটি চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. বিলকিস বেগম।

খসড়া জমা দেয়ার দুই মাস পর মন্ত্রণালয় থেকে একই বিষয় চাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গঠিত কমিটির সদস্যরা। পাশাপাশি বিস্মিত হয়েছেন অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলেন, মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের কার্যক্রম প্রমাণ করে, হয় তারা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারছে না, অথবা ইচ্ছাকৃত কালক্ষেপণ করছেন।

৫ জুলাই অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে একটি চিঠি দেন। সেখানে তিনি কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালা প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে নতুন ধরনের পরীক্ষা আবিষ্কৃত হয়েছে। দেশব্যাপী মানুষের প্রয়োজন পূরণে নতুন ধরনের পরীক্ষা চালু করা দরকার। স্বাস্থ্য অধিদফতর এক্ষেত্রে একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করেছে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ জরুরি ভিত্তিতে এটি অনুমোদন করা যেতে পারে।

২৪ আগস্ট সরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরিতে অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরু করছে বলে জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। ওইদিন সচিবালয়ে একটি সভা শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনার র‌্যাপিড টেস্ট করার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তবে এখন থেকে অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হবে। অ্যান্টিবডি টেস্ট করা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, পরিমার্জিত খসড়া দেয়ার ২৭ দিন পর আবারও একই বিষয় (খসড়া) চাওয়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। এখন জরুরি অবস্থা চলছে। এই সময়ে একটা জরুরি বিষয় নিয়ে এ ধরনের আচরণ অযৌক্তিক। তিনি বলেন, বিজ্ঞান কোনো নথি বা ফাইল নয়, যে এটা চালাচালি করলেই সব আয়ত্ত করা যাবে। এ বিষয়ে কালক্ষেপণ মন্ত্রণালয়ের অপরিণামদর্শিতা। কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি সম্প্রসারণ নীতিমালা (খসড়া) পরীক্ষা-নিরীক্ষার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সদস্য ও রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এক্ষেত্রে আইসিডিডিআরবি’র সঙ্গে যৌথভাবে আমরা এ কাজ পরিচালনা করব। তিনি বলেন, আমরা এ সংক্রান্ত খসড়া চূড়ান্ত করে দিয়েছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় আবারও খসড়া চেয়ে যে চিঠি দিয়েছে সেটি এখনও পাইনি।

জানা গেছে, ৪ জুলাই কারিগরি পরামর্শক কমিটির ১৪তম সভায় জানানো হয়, ‘অ্যান্টিজেন বেজড কোভিড-১৯ পরীক্ষার অনুমতির জন্য ঔষধ প্রশাসনকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এতে অতিসত্বর কোভিড-১৯ পরীক্ষার সুযোগ প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সম্প্রসারণ নীতিমালায় (খসড়া) অ্যান্টিজেনভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, সার্স কোভ-২ ভাইরাসের নিউক্লিকি এসিডের বদলে জীবাণুসংশ্লিষ্ট কোনো প্রোটিন (অ্যান্টিজেন) নির্ণয়ের মাধ্যমে সম্প্রতি কোভিড-১৯ নির্ণয়ের পদ্ধতি উদ্ভব হয়েছে। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনক্রমে এটি নানা দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইমিউনোয়াসাই নামের একটি প্রযুক্তির নানা ধরন ব্যবহার করা হয়। যা ল্যাবরেটরির বাইরে ‘পয়েন্ট অব কেয়ার টেস্ট’ হিসেবে ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ফলাফল পাওয়া যায়। এজন্য এগুলোকে র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট বলা হয়। নিউক্লিক এসিড অ্যামপ্লিফিকেশন টেস্ট বা ন্যাট পরীক্ষার মতোই এতে নাক-মুখের সোয়াব ব্যবহার করা হয়।

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষার নীতিমালার খসড়া প্রদান করা হয়। ৯ জুলাই তৎকালীন মহাপরিচালক কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্প্রসারণ নীতিমালার খসড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে জাতীয় পরামর্শক কমিটি, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটি, আইইডিসিআর প্রতিনিধি, নিপসম প্রতিনিধি, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের নমুনা পরীক্ষা সংক্রান্ত কমিটির প্রতিনিধির সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে মতামত প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়। এই কমিটি ৪ আগস্ট স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে তাদের মতামতসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকরা বিষয়টি সার্বক্ষণিকভাবে দেখভাল করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারিগরি কমিটি সুপারিশ করলেও অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির হঠাৎ বদলি হওয়ায় এক ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ যারা অনুমোদন করবেন, তারা যদি বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে না পারেন তাহলে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অ্যান্টিজেনভিত্তিক র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ফল পেতে সময় লাগে ১০ থেকে ২০ মিনিট। এটি উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল। সাধারণ নমুনা পরীক্ষাগারেই এই পরীক্ষা করা সম্ভব। এমনকি পয়েন্ট অব কেয়ারেও এ ধরনের পরীক্ষা করা যায়। দেশে এখনও অনুমতি দেয়া না হলেও পার্শ্ববর্তী ভারতে কোভিড-১৯ শনাক্তে এই পরীক্ষা বহুল ব্যবহৃত। তাদের মতে, যত দ্রুত সম্ভব এ ধরনের পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া প্রয়োজন। কারণ রিয়াল টাইম আরটি পিসিআর পরীক্ষা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। একবার পরীক্ষা শেষ করতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। আরটি পিসিআর বিটের দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে। যদিও কোভিড-১৯ শনাক্তে আরটি-পিসিআর পরীক্ষা আমাদের দেশে অনুমোদিত এবং ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষায়িত পরীক্ষাগার ছাড়া এটি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এমনকি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য উচ্চ জ্ঞানসম্পন্ন কারিগরিভাবে দক্ষ শ্রমশক্তির প্রয়োজন।

কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ল্যাবরেটরি এক্সপানশন পলিসি রিভিউ কমিটির আহ্বায়ক ৪ আগস্ট স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেন। সেখানে তিনি এর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন। যাতে এটি দ্রুত অনুমোদন দেয়া হয়। এতকিছু করার পরও মন্ত্রণালয় কালক্ষেপণ করছে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English