সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

কাবা শরিফকে স্ট্যাচু বলা চরম মূর্খতা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০
  • ৫৬ জন নিউজটি পড়েছেন

আমরা জানি, স্ট্যাচু বলতে মূর্তিকে বোঝানো হয়। সুতরাং কাবা শরিফকে স্ট্যাচু বলা মানে মূর্তি বলা। আর কাবা শরিফকে স্ট্যাচু বা মূর্তি বলে মন্তব্য করা এটা পরিষ্কারভাবে ইসলামকে অবমাননা করা, ধর্ম অবমাননা করা। সেটা যিনি করেছেন তিনি জেনে বুঝে করেছেন অথবা না জেনে না বুঝেই করেছেন। স্ট্যাচু দ্বারা তিনি যদি ভাস্কর্যও বুঝিয়ে থাকেন তবুও তার এ কথা গ্রহণযোগ্য নয়। আর এর মাধ্যমে তিনি ইসলামকে অবমাননা করেছেন বলে বিবেচিত হবে।
কাবা শরিফকে স্ট্যাচু বলে মন্তব্য করার মাধ্যমে তিনি তার মূর্খতার ও অজ্ঞানতার পরিচয় দিয়েছেন। ইসলামের একজন প্রথমিক পর্যায়ের সাধারণ পাঠকও জানেন, ইসলামের সবচেয়ে বড় অপরাধ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা। আর আল্লাহর জমিনে কোনো প্রতিমা, কোনো স্ট্যাচু, কোনো মূর্তি বা কোনো ভাস্কর্যের সামনে মাথা নত করার অর্থ হলো এটাকে পূজা করা। এটি শিরকের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এবং দৃষ্টান্ত। যে ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে প্রতিমা পূজা বা স্ট্যাচু পূজা বন্ধ করতে, প্রতিমা পূজার ধারণাকে বিলুপ্ত করতে যে ইসলামের আগমন, যে কুরআনের পাতায় পাতায় পরতে পরতে শিরকের বিরুদ্ধে, প্রতিমার বিরুদ্ধে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যুক্তি তুলে ধরেছেন; রাসূলে কারিম সা: যুক্তি তুলে ধরেছেন সেই ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু কাবা শরিফকে স্ট্যাচু বলে মন্তব্য করা জঘন্য একটি মন্তব্য। এর মাধ্যমে তিনি ইসলাম এবং মুসলমান উভয়কে অপমান করেছেন, অসম্মান করেছেন।

এই উক্তির মাধ্যমে মুসলমানদের ইবাদতকে একটি সাদৃশ্য দেখানোর অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। অথচ আমরা জানি, প্রত্যেক মুসলিম শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের উদ্দেশ্যেই সিজদা নিবেদন করেন; সালাত নিবেদন করেন; সব ইবাদত-বন্দেগি নিবেদন করে থাকেন। আর ইসলাম আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়েছে। কাবার দিকে ফিরে আমরা যে সিজদা করি বা সালাত আদায় করি এটি শুধু শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে। জামাতে যখন আমরা সালাত আদায় করব বা আমরা যখন গোটা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সালাত আদায় করব একটা দিকে ফিরে যেন আমরা সালাত আদায় করি; শুধু দিক নির্ণয় করার জন্য আল্লাহ আমাদের কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করতে বলেছেন। অন্যথায় যেকোনো দিকে ফিরে মানুষ সালাত আদায় করুক না কেন সে সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনের সূরা বাকারার ১১৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘তোমরা যে দিখে ফিরেই নামাজ আদায় করো না কেন সেটা যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই সালাত আদায় হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ সব দিকই আল্লাহর সৃষ্টি। (উল্লেখ্য, এ কথা বলা হয়েছে শুধু বুঝানোর জন্য। অন্যথায় সাধ্য অনুযায়ী কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করা ফরজ)। এখানে আমাদের জন্য কাবাকে শুধু কেবলা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে যেন তার দিকে মুখ করে আমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করতে পারি। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে রাসূল, আপনি আপনার চেহারাকে কাবার দিকে ফেরান।’ (সূরা বাকারা : ১৪৪) অর্থাৎ শুধু কাবার দিকে মুখ করে আমরা ইবাদত করি কিন্তু ইবাদতটা আল্লাহর।
কিন্তু কাবা শরিফকে স্ট্যাচু বলা যেন মুসলিমদের ইবাদতকে মূর্তি পূজার সাথে সাদৃশ্য দেয়া। এটি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মন্তব্যকারী হাজরে আসওয়াদ পাথরকে নিয়েও মন্তব্য করেছেন, মুসলিমরা আমরা হাজরে আসওয়াদ পাথরকেও চুম্বন করে থাকি এটাও নাকি এক প্রকার স্ট্যাচু। অথচ পাথর এটা কখনো স্ট্যাচু হতে পারে না। স্ট্যাচু যদি হয়ে থাকে তাহলে এটা কার স্ট্যাচু? কিসের আকৃতি? কিসের মূর্তি? অথচ এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পাথর সেই সাথে কাবা একটি ঘর। এই ঘরের মধ্যে একসময় ইবাদত করা হতো। জায়গা সঙ্কুলানের কারণে আমরা বাইরে ইবাদত করছি। এই ঘরটিকে যে তিনি স্ট্যাচু বলে মন্তব্য করলেন, এটি তাহলে কার স্ট্যাচু? কার মূর্তি? কার ভাস্কর্য? কিসের ভাস্কর্য? অতএব কাবাকে বা হাজরে আসওয়াদকে স্ট্যাচু বলা বা মূর্তির সাথে তুলনা করা বা ভাস্কর্য বলা একই সাথে মূর্খতা এবং ইসলাম অবমাননা করা।

সেই সাথে আমরা বলতে চাই, হাজরে আসওয়াদ পাথরকে যে আমরা চুম্বন করে থাকি; এটি এই জন্য নয় যে, এ পাথরটি চুম্বন করে আমরা পাথরের কাছে কোনো কল্যাণ কামনা করি। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত, খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত ওমর রা: হাজরে আসওয়াদ পাথরকে সম্বোধন করে অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সাথে বলেছিলেন, ‘হে পাথর! আমি জানি তুমি নিছক একটি পাথর। কোনো কল্যাণ-অকল্যাণের ক্ষমতা তোমার নেই এ বিশ্বাস আমার আছে। যদি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:কে না দেখতাম তোমাকে চুম্বন করতে তাহলে আমি কখনোই তোমাকে চুম্বন করতাম না।’ ইমাম তাবারি রহ: বলেছেন, ‘ওমর ফারুক রা: এই কথার মাধ্যমে মূলত কিছু মানুষের সন্দেহ-সংশয়কে দূর করতে চেয়েছেন। যেহেতু মুসলিমরা সদ্যই প্রতিমা পূজার যুগ পার করে এসেছে; তাই কাবার চারপাশে তাওয়াফ করা, কাবার দিকে ফিরে সিজদা করা বা হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করা এগুলো প্রতিমা পূজারই নতুন কোনো ভার্সন বলে মনে করতে পারে। সেই সন্দেহকে দূর করার জন্য ওমর রা: হাজরে আসওয়াদ পাথরকে সম্বোধন করে এই কথাগুলো বলেছেন। এখান থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, এটা কোনোভাবেই প্রতিমা পূজার যে দৃশ্য আমরা দেখতে পাই তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয় এবং এটা বলা চরম স্পর্ধা। একজন মুসলিম চরম মূর্খ বা ইসলামবিদ্বেষী না হলে কোনো অবস্থাতেই এটা করতে পারেন না।
সেই সাথে তিনি হাজী সাহেবদের পাথর নিক্ষেপের কথাও বলেছেন। আমরা যেখানে পাথর নিক্ষেপ করে থাকি সেটাও নাকি স্ট্যাচু! অথচ সেটা কার আকৃতি? কার স্ট্যাচু? এখানে কারো কোনো আকার-আকৃতি নেই। এটা একা পিলার ছাড়া কিছুই নয়। স্ট্যাচু যদি আমরা বলি তাহলে স্ট্যাচুর যে সংজ্ঞা তার কোনো কিছুই এখানে পাওয়া যাবে না। যদি ভাস্কর্যও বলি তাহলেও তো মিলবে না। কারণ ভাস্কর্য মানে কোনো কিছুতে খোদাই করে একটা আকৃতি তৈরি করা। কিন্তু এখানে তো কোনো আকৃতি নেই। তাহলে তিনি এটাকে কিভাবে স্ট্যাচু বা ভাস্কর্য বলেন। আর আমরা তো সেখানে পাথর নিক্ষেপ করছি কিন্তু তিনি তো স্ট্যাচু বা ভাস্কর্যকে সম্মানবোধের জন্য নির্মাণ এবং সম্মান প্রদর্শন করতে যাচ্ছেন। আমরা জানি, প্রতিমা পূজা করা শিরক আর কোনো মানুষের ছবি অঙ্কন করা বা মূর্তি বা অবয়ব তৈরি করা; সিজদা বা পূজার উদ্দেশ্যে না করলেও সেটি গুনাহের কাজ। একদা রাসূলে কারিম সা:-এর ঘরে তাঁর অজান্তে কোনো প্রাণীর ছবি ছিল বা অঙ্কন করা ছিল। জিবরাইল আ: এমতাবস্থায় রাসূলের গৃহে প্রবেশ না করে ফিরে গেছেন। পরে রাসূল সা:কে জানিয়েছেন, আপনার ঘরে প্রাণীর ছবি আছে তা অপসারণ করুন। সেই প্রাণীর ছবি বা অঙ্কন মুছে ফেলার পর জিবরাইল আ: রাসূলের ঘরে প্রবেশ করেছেন। রাসূল সা: আলী রা:কে বলেছেন, ‘যত ছবি আছে মুছে দাও এবং যত উঁচু কবর আছে এগুলো মাটির সাথে সমান করে দাও।’
এ সব হাদিস থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, ভাস্কর্য নির্মাণ করা, বাসা-বাড়িতে পুতুলকে সম্মানজনকভাবে প্রদর্শন করা বা শোপিসে ইত্যাদি হিসেবে রাখা এগুলো কোনো মুসলমানের জন্য জায়েজ নয়। যারা ভাস্কর্য নির্মাণ করতে চান তারা এটিকে হালাল বানানোর চেষ্টা করবেন না। আল্লাহ যেটাকে হারাম করেছেন, কুরআন ও হাদিস যেটাকে পরিষ্কারভাবে হারাম বলেছে সেটাকে হালাল করার অপচেষ্টা কেন করছেন! কত হারাম কাজই তো আপনারা করছেন। আরো একটি হারাম কাজ করতে যাচ্ছেন। তো সেটাকে হারাম জেনেই করুন। হারাম স্বীকার করেই করুন। হালাল বানানোর চেষ্টা করবেন না। এটা ইসলামের অবমাননা করা।
কাবা শরিফ, হাজরে আসওয়াদ পাথরকে এবং পাথর নিক্ষেপের পিলারকে স্ট্যাচু বলা পরিষ্কারভাবে ইসলামকে এবং মুসলমানদেরকে অবমাননা করা। কাবাকে যিনি স্ট্যাচু বলেছেন আমরা তাকে প্রকাশ্যে তাওবা করে ফিরে আসা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার আহ্বান জানাই। তা না হলে এই মন্তব্যকারী ইসলামের দৃষ্টিতে চরম অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ ধরনের বাজে এবং জঘন্য উক্তি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English