রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৩৫ অপরাহ্ন

কারো মৃত্যুতে উল্লাস

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৫৪ জন নিউজটি পড়েছেন

আবদুর রহমান ইবনে আবি লায়লা থেকে বর্ণিত। সাহল ইবনে হুনাইফ ও কায়েস ইবনে সাদ কাদেসিয়াতে বসা ছিলেন। তখন তাদের পাশ দিয়ে একটি লাশ নিয়ে কিছু লোক অতিক্রম করে। লাশ দেখে তারা দু’জন দাঁড়িয়ে যান। তখন তাদের বলা হলো, মৃত ব্যক্তি তো কাফের। তখন ইবনে হুনাইফ ও ইবনে সাদ বলেন, মহানবী সা:-এর পাশ দিয়ে একসময় একটি লাশ নেয়া হয়েছিল। তখন তিনি দাঁড়িয়ে যান। তাকে বলা হয়, এটা তো এক ইহুদির লাশ। তখন তিনি বললেন, সে কি প্রাণী নয় (মানব নয়)?’ (বুখারি, হাদিস ১২১৩)।
হজরত জাবের রা: বর্ণনা করেন, একদিন আমাদের পাশ দিয়ে একটি লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাঃ দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর দেখাদেখি আমরাও দাঁড়ালাম। আমরা তাঁকে বললাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ তো এক ইহুদির লাশ!’ রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘যখন কোনো লাশ নিতে দেখবে, তখন দাঁড়াবে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩১১)।
আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, ইহুদি এক ছোট বালক রাসূল সা:-এর খেদমত করত। সে অসুস্থ হলে, মহানবী সা: তাকে দেখতে যান। তখন তিনি তার মাথার দিকে বসে তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো! ছেলেটি তার বাবার দিকে তাকিয়ে দেখে। বাবা বললেন, তুমি আবুল কাসেমের (মহানবী সা:-এর উপনাম) অনুসরণ করো, ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। তখন রাসূল সা: এই বলে ঘর থেকে বের হন, ‘আল্লাহর শোকর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন’ (বুখারি, হাদিস ১২৫৬)।
ব্যাখ্যা ও শিক্ষা: ইসলাম ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব জীবন্ত মানুষের প্রতি বিদ্বেষহীনতা, সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার শিক্ষা দেয়। এমনকি ইসলামবিরুদ্ধ ইহুদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধের লাশ দেখেও দাঁড়িয়ে সম্মান করার আদর্শ শেখায়, অসম্মান, বিদ্রূপ কিংবা গালিগালাজ তো দূরে থাক।
অথচ মুসলিম দাবিদার দেওয়ানবাগী পীরের মৃত্যুতে অনেকে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করছে, যা সুস্পষ্ট হারাম এবং রাসূলের সুন্নতের খেলাফ। তিনি অনেকের দৃষ্টিতে মুশরিক ও মুনাফিক ছিলেন। তাই বলে রাসূল সা: আমাদের শিক্ষা দেননি যে, কারো মৃত্যুতে তার জাহান্নাম কামনা করে আনন্দ-উল্লাস করতে হবে। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন এবং তার জাহান্নাম-জান্নাতের ফায়সালার অধিকারীও তিনিই। আল্লাহ যদি তাকে জান্নাত কিংবা জাহান্নাম দেন, তাতে আমাদের কিসের লাভক্ষতি! অথচ রাসূল সা:-এর ওপর চরম নির্যাতনকারী আবু জেহেল ও আবু লাহাবদের মতো কঠোর কাফির-মুশরিকের মৃত্যুতেও রাসূল সা: ও সাহাবারা কখনো আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করেননি। এমনকি আল্লাহ কর্তৃক জাহান্নামের ঘোষণাপ্রাপ্ত বিখ্যাত মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই-এর জানাজাও স্বয়ং রাসূল সা: পড়িয়ে ছিলেন এবং তার কাফনের জন্য নিজের জামাও দিয়েছিলেন, যদিও পরে আয়াত নাজিল করে আল্লাহ মুনাফিকদের জানাজা পড়াতে তাকে নিষেধ করেন। সেই মুনাফিক সম্পর্কিত হাদিসটি নিম্নরূপ: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) বর্ণনা করেন, যখন আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল মারা যায়, তখন তার পুত্র আবদুল্লাহ (তিনি নিষ্ঠাবান সাহাবি ছিলেন) মহানবী সা:-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করে, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার জামাটি দান করুন, যাতে আমি তা আমার পিতার কাফন হিসেবে পরিধান করাতে পারি।’ রহমতের নবী নিজের জামা মুবারক দিয়ে দেন। তারপর আবদুল্লাহ নিবেদন করল, ‘আপনি তার জানাজার নামাজও পড়াবেন।’ সাহাবির সন্তুষ্টির জন্য রাসূলুল্লাহ সা: তা-ও কবুল করেন। জানাজার নামাজ আদায় করার পর আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হয় (মুসলিম শরিফ)।
আব্দুল্লাহ রা:-এর অনুরোধে রাসূল সা:-এর মন নরম হয়ে যায় এবং তিনি তার জামা দিয়ে দেন। এ জামা দিয়ে মুনাফিক সর্দারের কাফন পরানো হয়। রাসূল সা: যখন তার জানাজা পড়ানোর জন্য যাচ্ছিলেন, তখন হজরত ওমর রা: রাসূলের জামা টেনে ধরলেন। হজরত ওমর ফারুক রা: রাসূল সা:কে এ বলে তার জানাজা পড়াতে বারণ করেন যে, সে সারা জীবন ইসলাম ও মুসলমানদের কষ্ট দিয়েছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। এখন তার মৃত্যুর পর জানাজা পড়াবেন, দাফনে শরিক হবেন, তা হতে পারে না।
রাসূল সা: সূরা তাওবার নিচের আয়াতের উল্লেখ করে বললেন, আমাকে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা বা না করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছে। আমি চাইলে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি, আবার না-ও করতে পারি। আর আমি যদি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জন্য সত্তরবারের বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করি আর আল্লাহ পাক তাকে ক্ষমা করে দেন, তা হলে আমি তা-ই করব।
‘হে নবী! তুমি এ ধরনের লোকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো বা না করো, তুমি যদি এদের জন্য সত্তরবারও ক্ষমা প্রার্থনা করো, তাহলেও আল্লাহ তাদের কখনোই ক্ষমা করবেন না। কারণ তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে কুফরি করেছে। আর আল্লাহ ফাসেকদের মুক্তির পথ দেখান না (সূরা তাওবা, আয়াত ৮০)।
এরপর রাসূলুল্লাহ সা: তার জানাজা পড়ালেন। পরক্ষণেই আল্লাহ নতুন আয়াত নাজিল করলেন– ‘তাদের কেউ মারা গেলে আপনি কখনো তার জানাজার সালাত আদায় করবেন না। এমতাবস্থায় যে তারা ফাসিক’ (সূরা তাওবা, আয়াত ৮৪)।
কাজেই পরকালীন জবাবদিহিতার কথা স্মরণ রেখে অনুগত বান্দা এবং রাসূলের উম্মত হিসেবে আমাদেরও উগ্র ও মনগড়া আচরণ বর্জন করা জরুরি, যাতে তুলনাহীন ইসলাম, রাসূল ও সাহাবাদের পথের পথিক হতে পারি। কুরআন-সুন্নাহবর্জিত আচরণে ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে অন্যদের মনে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হলে, সে দায় থেকে কি আল্লাহ আমাদের নিষ্কৃতি দেবেন!

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English