রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:২১ অপরাহ্ন

কুরআনের অলঙ্কারপূর্ণ ভাষা ও চিত্রকল্প

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২০
  • ৫৪ জন নিউজটি পড়েছেন

কুরআন ব্যবহার করেছে একটি আশ্চর্যজনক সংক্ষিপ্ত শব্দভাণ্ডার, যা সহজে মুখস্থ করতে সাহায্য করে। একই সাথে, এই সংক্ষিপ্ত শব্দভাণ্ডার বর্ণিল সমৃদ্ধ এবং জটিল অর্থ প্রদান করে। ভিন্ন ভিন্ন ভাষালঙ্কার ব্যবহার করা একটি অন্যতম উপায়, যেমনÑ উপমা, রূপক, বাগবৈশিষ্ট্য এবং বর্ধিত রূপক নীতিগর্ভ-রূপক কাহিনী অথবা রূপকধর্মী রচনা আকারে। একটি মৌখিক নিবন্ধ হিসেবে, আল কুরআন পাঠকের কাছে শুধু অর্থ এবং শব্দের সমাহারে গ্রহণীয় নয় বরং অন্তর্দৃষ্টি সংক্রান্ত কল্পনাও। এই ভাষালঙ্কার এবং উপমা এই ধর্মগ্রন্থটিকে জটিল আর ভাবমূলক ধারণা এবং শিক্ষা বহনেও সুযোগ দেয় যেগুলো হচ্ছেÑ সংক্ষিপ্ত, সংশ্লিষ্ট এবং স্মরণযোগ্য। পাঠকের সর্বদা মনে রাখা উচিত, শব্দের দৃশ্যরূপ কুরআনের সৌন্দর্যের অন্য চূড়ান্ত মাত্রা, যা শুধু আরবি পাঠ করেই উপলব্ধি করা যায়।
মৌলিক উপমা এবং রূপক : আল কুরআন উপমা এবং রূপক অর্থ ব্যবহারে মাত্রা এবং জটিলতায় ভিন্নতা রেখেছে। আমরা প্রথমে উদাহরণস্বরূপ কিছু সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট উপমা উপস্থাপন করব যা সামান্য ব্যাখ্যার দাবি করে। এরপর আল কুরআনে উল্লেøখযোগ্য আয়াতে জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে উদাহরণের দিকে দৃষ্টিপাত করব, বাগবৈশিষ্ট্য এবং শেষে নীতিগর্ভ রূপকথা অথবা রূপকধর্মী রচনার ক্ষেত্রে বেশি সময় দেবো। উল্লেøখযোগ্য উপমা এবং রূপক অর্থের উদাহরণসমূহ সংগ্রহ করা হয়েছে আল কুরআনের বিভিন্ন অংশ থেকে এবং শব্দমূল সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে এক গ্রুপে স্থান দেয়া হয়েছে।
ভাসমান মেঘের মতো : আল কুরআনের একটি অন্যতম বিশিষ্ট উপমার ব্যবহার হচ্ছে এটি, খুব পরিচিত উপমা ‘বিচার দিবস’-এর বাস্তবতা সম্পর্কে বর্ণনা করা, যা খুব সহজেই পাঠকরা উপলব্ধি করতে পারেন। যখন বিচার তাদের হাতে তুলে দেয়া হবে, আল কুরআন বলেÑ ‘যে দিন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, অতঃপর তা রক্তিম গোলাপের ন্যায় লাল চামড়ার মতো হবে।’ (৫৫ : ৩৭)।
আরবরা মনে করে যে, পর্বতমালা তাদের স্থায়িত্ব এবং সক্ষমতার কারণে প্রকৃতপক্ষে হতে পারে ‘চিরস্থায়ী কিছু’ (আল খাওয়ালিদ)। এ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘আর পর্বতরাজি হবে ধুনা রঙিন পশমের মতো।’ (১০১ : ৫) ‘অথচ তা মেঘমালার ন্যায় চলতে থাকবে।’ (২৭ : ৮৮)।
ঠিক এই সময়ে, মানুষরা হয়তো তাদের কবরে পৌঁছে যাবে ‘যেদিন দ্রুতবেগে তারা কবর থেকে বের হয়ে আসবে, যেন তারা কোনো লক্ষ্যের দিকে ছুটছে।’ (৭০ : ৪৩)।
তখন তারা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে ‘মনে হবে যেন তারা বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল।’ (৫৪ : ৭) অথবা ‘যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো।’ (১০১ : ৪) তাদের পুরস্কারের মধ্যে, বেহেশতে পুরুষের জন্য রয়েছে বিশেষভাবে সংরক্ষিত হুর ‘তারা যেন আচ্ছাদিত ডিম’। (৩৭ : ৪৯), যেমন মা অস্টিচ তার ডিমকে সুরক্ষায় আচ্ছাদিত করে রাখে এবং যেন আরবদের সৌন্দর্য, পবিত্রতা এবং আকর্ষণীয়তার সমন্বয়। যাই হোক, অবিশ্বাসীরা কোনো পুরস্কার পাবে না, যেমন তাদের কর্ম হবেÑ ‘তাদের আমলসমূহের দৃষ্টান্ত হলো এমন ছাইয়ের মতো, প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের দিনে বাতাস প্রচণ্ড বেগে যা বহন করে নিয়ে যায়।’ (১৪ : ১৮)।
একটি উত্তম ঋণ : বিশ্বের অন্যান্য সময়ের মতো পূর্বের আরব যুগে, বাণিজ্য এবং কৃষিকাজ ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়নের দু’টি প্রধান উৎস। এটি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আল কুরআন এই দু’টি বিষয় নিয়েই রূপক অর্থে ব্যবহার করেছে। যদিও আমরা শেষের অনুচ্ছেদে কৃষি-বিষয়ক একটি নীতিগর্ভমূলক রূপকের ব্যবহার নিয়ে বলেছি, আমরা কিছু বাণিজ্যিক রূপক অর্থও এখানে দেখতে পারব।
আল কুরআন মানুষের কাজ সম্পর্কে বর্ণনা করে এবং তাদের শেষ বিচারের দিনে ফিরে যাওয়াকে একটি ব্যবসার চুক্তির সাথে সংযুক্ত করে বিশ্লেষণ করে। যখন এ বিষয়টি এই গ্রন্থে বিভিন্ন জায়গায় স্থান পায়, এটা বিশেষভাবে দ্বিতীয় সূরায় উল্লেøখযোগ্য। যারা বিশ্বাসীদের দোষারোপ করে মূলত তারাই অবিশ্বাসী, এরাই তারা, যারা হিদায়াতের বিনিময়ে পথভ্রষ্টতা ক্রয় করেছে। কিন্তু তাদের ব্যবসায় লাভজনক হয়নি এবং তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত ছিল না।’ (২ : ১৬)।
যেমনÑ ইসরাইলের বংশোদ্ভূতদেরকে তিনি সতর্ক করেন, ‘আর তোমরা আমার আয়াতসমূহ সামান্যমূল্যে বিক্রি করো না।’ (২ : ৪১, ৩ : ৭৭, ১৮৭, ১৯৯) যারা তাদের রবের সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে, ‘তারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে খরিদ করেছে।’ (২ : ৮৬) এবং ‘নিজেদেরকে বিক্রয় করছে।’ (২ : ৯০) ইসরাইলের কিছু জাদুবিদ্যায় অংশগ্রহণকারী এটা জানা সত্ত্বে¡ও তারা যা অর্জন করেছে তার হিস্যা তাদের রয়েছে।’ (২ : ২০২) ‘নিশ্চয় যারা ঈমানের বিনিময়ে কুফরি ক্রয় করেছে, আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব।’ (২ : ১০৮; ৩ : ১৭৭) ‘নিশ্চয় যারা গোপন করে যে কিতাব আল্লøাহ নাজিল করেছেন, এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে।’ (২ : ১৭৪)। ‘তারাই হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা এবং মাগফিরাতের পরিবর্তে আজাব ক্রয় করেছে।’ (২ : ১৭৫) অন্যথায়, আল্লøাহর পথে যুদ্ধ করাকে বলা হয়েছে ‘উত্তম ঋণ, যা আল্লাহ বহুগুণে বাড়িয়ে দেবেন।’ (২ : ২৪৫) ‘যখন এখানে থাকবে না কোনো বেচাকেনা শেষ বিচারের দিনে।’ (২ : ২৫৪)। অন্য দিকে, আল্লøাহর রাস্তায় জিহাদ করাকে বলা হয়েছে ‘একটি উত্তম ঋণ, যা আল্লাহ দেবেন বহুমাত্রায় বর্ধিত করে।’ (২ : ২৪৫) ‘যখন এখানে কোনো দরকষাকষি থাকবে না বিচার দিনে।’ (২ : ২৫৪) এই অস্বীকৃতির ব্যাকরণের মধ্যে কিছু বিষয় রয়েছে। একটি অন্যতম দিক হচ্ছেÑ অন্যত্র বুঝানো (৯ : ১১১) আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে আল্লøাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের প্রাণ ও তাদের ধন সম্পদসমূহকে এর বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন যে, তাদের জন্য জান্নাত রয়েছে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, যাতে তারা (কখনো) হত্যা করে এবং (কখনো) নিহত হয়, এর কারণে (জান্নাত প্রদানের) সত্য অঙ্গীকার করা হয়েছে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে। নিজের অঙ্গীকার পালনকারী আল্লাহ অপেক্ষা অধিক আর কে আছে? অতএব তোমরা আনন্দ করতে থাকো তোমাদের এই ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর, যা তোমরা সম্পাদন করেছ, আর এটা হচ্ছে বিরাট সফলতা।’
অন্যথায়, ‘এই বিরাট সফল ব্যাখ্যা করা হয়েছে আরো বিস্তারিতভাবে একই সাদৃশ্যে। যারা এই কুরআন তিলাওয়াত করবে, ইবাদতে মনোনিবেশ করবে এবং যারা দান করে তাদেরকে এভাবে বলা হয়েছেÑ একটি মুনাফা যা কখনো বিফলে যাবে না।’ (৩৫ : ২৯) এই বিষয়টি সর্বোচ্চ পর্যায়ে বলা হয়েছে ৬১:১০-১২ আয়াতেÑ ‘হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদের এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেবো যা তোমাদের রক্ষা করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে? তা এই যে, তোমরা আল্লøাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধনসম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লøাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে। আল্লøাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহ। এটাই মহা সাফল্য।’
আমরা নতজানুভাবে আসি : অধিকন্তু মৌলিক উপমা এবং রূপকের, কুরআন তৈরি করেছে নব আত্মারূপ ব্যবহার, অলঙ্কারপূর্ণ ভাষা যেখানে অ-মানব বিষয়সমূহ মানব বিষয়ক গুণাগুণ দেয়। বিষয় বৈচিত্র্যময়ের জন্য, নব আত্মারূপ ব্যবহার করা হয় জোরদার সংবাদটি দিতে যে, সব সৃষ্টিই ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট, আল্লøাহর ইচ্ছায় নত হওয়া এবং এটা মনুষ্যত্বের জন্যই হওয়া উচিত। অনুসরণীয় প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণের ছবি তুলে ধরা হলোÑ ‘অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অতঃপর তিনি ওটাকে এবং পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে এসো স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা এলাম অনুগত হয়ে।’ (৪১ : ১১)।
‘সব সৃষ্টি একসাথে গাইতে থাকবে স্বর্গীয় সমুজ্জ্বলতায়Ñ সপ্ত আকাশ, পৃথিবী এবং ওদের অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংসা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু ওদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পারো না।’ (১৭ : ৪৪) ‘এমনকি মহাবিশ্বকে উপস্থাপন করা হয়েছে মানব ইতিহাসের নৈতিক নাটকের দর্শক হিসেবে, মন্দের ওপরে ভালোর জায়গা নেয়া। যখন ফেরাউন এবং তার সৈন্যরা ডুবে গেল, কুরআন বলে, আকাশ এবং পৃথিবীর কেহই তাদের জন্য অশ্রুপাত করেনি।’ (৪৪ : ২৯)। ‘যাদের অন্তর উদ্ঘাটনের চিন্তাভাবনা করে না তারা উপত্যকার চেয়েও কঠিন, তাদের জন্য আল্লøাহ বলেনÑ ‘যদি আমি এই কুরআন পর্বতের ওপর অবতীর্ণ করতাম তাহলে তুমি দেখতে যে, ওটা আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে।’ (৫৯ : ২১)
লেখকদ্বয়ের লেখা ‘ডিভাইন স্পিচ এক্সফ্লোরিং দ্য কুরআন এজ লিটারেচার’ শীর্ষক বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English