একটি গান দেশের সংস্কৃতিকেও বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে। একটা সময় ক্যাসেট ও পরবর্তীতে অ্যালবামের মাধ্যমেই দেশের অলিগলি থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যেতো বাংলা গান। কিন্তু এখন আর সেই সময় নেই। সিডি মাধ্যম বিলুপ্ত হয়েছে আগেই। এখন মানুষ গান শুনছে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে। আর ডিজিটালি গান শোনার সবচেয়ে বড় ও সহজ মাধ্যম হলো ইউটিউব। কারণ যে কেউ ইউটিউবে ঢুকে সহজেই ফ্রিতে গান দেখতে ও শুনতে পারে। আর এ কারণেই গানের জনপ্রিয়তা ও মান বিচারে ইউটিউব হয়ে উঠেছে শক্তিশালী মাধ্যম।
আমাদের দেশে গত কয়েক বছর ধরেই গান প্রকাশ হচ্ছে ইউটিউব ও অ্যাপে। অ্যাপে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে গান শুনতে হয়। আর সে কারণে স্বাভাবিকভাবেই ইউটিউবে ফ্রিতে গান শুনতে-দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন শ্রোতারা। এ মাধ্যমটি উন্মুক্ত। যে কেউ যেকোনো কিছুই প্রকাশ করতে পারেন। আর সেটাই ভয়াবহ ব্যাপার হয়ে উঠেছে গানের জন্য। কারণ আগে গান কেবল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশ হতো। সেখানে মান নির্ধারণের একটা ব্যাপার থাকতো। কিন্তু এখন যে কেউ চাইলেই ইউটিউবে প্রকাশ করতে পারছে গান। এখানেই বিপত্তি। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যে কেউই গান প্রকাশ করছে। আর নেতিবাচক, অশ্লীল, ভাইরাল টপিকের দিকেই মানুষের মনোযোগ বেশি। এ কারণ অনেক আনকোড়া কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিত্বও নিজেকে গানে ঝালাই করার মানসিকতা থেকে গান প্রকাশ করছেন। আর এ কারণে গানের মান নিয়ে ভয়াবহ শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কোথায় যাচ্ছে দেশের বাংলা গানের মান? ইউটিউবে সার্চ দিলেই তার প্রমাণ মিলবে। বাংলাদেশের গান সার্চ দিলেই দেখা মিলবে মানহীন, সস্তা, অশ্লীল ও ভাইরাল গান সবার আগে উঠে আসছে। অর্থাৎ দেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশের গান সার্চ দিলে সেরা গানের তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে এই গান! কি ভয়াবহ ব্যাপার। আর এই ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেকেই গানের মান ঠিক রাখতে অনেক আগে থেকেই সেন্সর বোর্ড গঠনের কথা বলে আসছেন। আবার অনেকে বলছেন মানহীন গানকে বয়কটের কথা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। মানহীন কথা, সুর, সংগীত, গায়কের পাশাপাশি অশ্লীল কিংবা সুড়সুড়ি দেয়ার মতো গানেরও অভাব নেই। আর বেশির ভাগ সময় এই গানই থাকছে ট্রেন্ডিংয়ে। বিষয়টি নিয়ে কিংবদন্তি গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বলেন, গানের মান দিন দিন নিচে নামছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক আগেই আমি সেন্সর বোর্ডের কথা বলে আসছি। সেটা করলে হয়তো এসব মানহীন গান আটকানো যেতো। দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হতো। তাছাড়া শ্রোতাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। ভালো গানকে গ্রহণ ও মানহীন গানকে বর্জন করার অপশন তো তাদের হাতেই। বিষয়টি নিয়ে কিংবদন্তি কন্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, এটা খুবই ভয়ের বিষয়। কারণ ইউটিউবে সার্চ দিলে রুচিহীন গানগুলোই আগে চলে আসছে। গান আসলে এখন তরল হয়ে গেছে। আগের টিমওয়ার্ক নেই। কথা-সুরের ঠিক নেই। যে খুশি সেই গায়ক-গায়িকা বনে যাচ্ছেন। যেহেতু সময় এটা ইন্টারনেটের। তাই সব মিলিয়ে আমি মনে করি শ্রোতাদেরই বিষয়টি প্রতিহত করা প্রয়োজন। আর সরকারিভাবে গান প্রকাশের ক্ষেত্রে একটা সেন্সর তো থাকা আবশ্যক। বিষয়টি নিয়ে কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী বলেন, এখন তো ঘরে ঘরে শিল্পী ও কম্পোজার। আর ইউটিউব আসার পর যেন গান প্রকাশের মতো সহজ বিষয় আর নেই। যে যেটা করার কথা না, সে সেটাই বেশি করছে। এ কারণেই আমাদের এই হাল। আমি মনে করি মানহীন কিংবা ভাইরাল যাই বলি এগুলো আসলে টিকে থাকে না। দুদিন পরই হারিয়ে যায়। টিকে থাকে ভালো গানগুলোই। তাই শ্রোতাদের সচেতন হতে হবে গানের ব্যাপারে। পাশাপাশি যারা গাইছেন তাদের নিজেদের বোধোদয় হওয়া উচিত। গান প্রকাশের ক্ষেত্রে সেন্সর বোর্ড গঠনটাও জরুরি।