তারুণ্য মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। তারুণ্য একটি উদ্দীপনার নাম, অদম্য শক্তি, অপ্রতিরোধ্য ঝড়, দৃপ্ত শপথ, দুর্জেয় ঘাঁটি, বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। সব বাধা ছিন্ন করে সম্মুখপানে এগিয়ে চলাই তারুণ্যের বৈশিষ্ট্য।
তারুণ্যের অপর নাম হল অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও সৃষ্টির উন্মাদনা। চেতনাদৃপ্ত তারুণ্য যখন জেগে ওঠে, তখন সব প্রতিবন্ধকতা দু’পায়ে মাড়িয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনে। জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায় ও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তারুণ্য।
এ সময়টিতে মানুষের কাছে অসম্ভব মনে হয় না কোনো কিছুই। তারুণ্যের চিন্তাচেতনা খোলা আকাশের মুক্ত পাখির মতো। এ জন্য ইসলামে তারুণ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।
ইসলামের দৃষ্টিতে তারুণ্য ও যৌবন মাবুদের নেয়ামত এবং আমানতও বটে। যৌবনের যথাযথ মূল্যায়ন, সুষ্ঠু পরিচর্যা ও সঠিক পথনির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারুণ্য তথা জীবন-যৌবন মহিরুহের বিকশিত চারাগাছ। এটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে পৃথিবীতে কল্যাণ ও আখেরাত জীবনে মুক্তির বিশাল বাগিচা মিলবে। এ সময় ইবাদত-বন্দেগি আল্লাহর কাছে সর্বাধিক পছন্দনীয়। ইসলামের দাওয়াতের সময় তরুণদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার কথা বলা হয়েছে।
আমাদের পেয়ারে নবীজি মুহাম্মদ (সা.) যে কোনো ব্যাপারে তরুণদের খুবই মূল্যায়ন করতেন। হাদিস শরিফে নবীজি (সা.) যৌবন বয়সকে গণিমতের মাল তথা ‘মূল্যবান সম্পদ’ বলেছেন। আর এ জন্যই জীবনের শ্রেষ্ঠ এ সময় সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
হজরত আমর ইবনে মায়মুন আল আওদি (রা.) বলেছেন, নবীজি (সা.) এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘পাঁচটি বিষয় আসার আগে মূল্যবান সম্পদ মনে কর। ১. বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকে ২. অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে ৩. দারিদ্র্য হওয়ার আগে সচ্ছলতাকে ৪. ব্যস্ত হওয়ার আগে অবসরকে ৫. মরে যাওয়ার আগে অমূল্য জীবনকে।’ (তিরমিজি)
তরুণ বয়স সম্পর্কে নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, কেয়ামতের দিন মানুষকে ৫টি প্রশ্ন করা হবে। এ প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর দেয়া ছাড়া কোনো বান্দা এক পা-ও নড়তে পারবে না।
এর একটি প্রশ্ন হল- তোমার যৌবনকাল কোন কাজে ব্যয় করেছ? (তিরমিজি) আর যারা যৌবন আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করে তাদের সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষ আরশের নিচে প্রশান্তির সঙ্গে থাকবে। তার মধ্যে এক শ্রেণির মানুষ হল ওই যুবক, যার যৌবন কেটেছে আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে।’ (বুখারি)
ইসলামের ইতিহাসের পাতায় পাতায় সোনালি হরফে লেখা আছে তরুণদের অমর কীর্তি। ইতিহাসে প্রতিটি আন্দোলনে বিজয়ের সাফ্যলের পেছনে আছে তরুণ সমাজের আত্মত্যাগ। এ তরুণদের রক্তের বিনিময়ে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে অসংখ্য সরকারের রাজ্যসীমা। ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে আছে তরুণদের আত্মত্যাগের স্মৃতি।
নবীজি (সা.) যুদ্ধবিধ্বস্ত আরবে মানবতার কল্যাণে তরুণদের নিয়েই গঠন করেছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম মানবতাবাদী সংগঠন ‘হিলফুল ফুজুল’। তরুণ সাহাবিরা পৃথিবীর চারপাশে ছড়িয়ে ইসলামের সত্য-সুন্দর কথা মানুষের কাছে প্রচার করেন। তরুণ সাহাবি হজরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)কে পাঠানো হয়েছিল মদিনায় ইসলামের গুরু দায়িত্ব দিয়ে। অপর তরুণ সাহাবি আলী বিন আবু তালিব (রা.) অসাধারণ বীরত্বের কারণে ‘আসাদুল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
হজরত উসামা বিন যায়েদ (রা.)-কে তরুণ বয়সেই সেনাপতি বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল রোম অভিযানে। স্পেন বিজয়ী সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ (রা.)ও ছিলেন একজন তরুণ। বদরের যুদ্ধে হজরত মুআজ ও মুআওয়িজ (রা.) নামে দু’জন সাহাবি ইসলামের ঘোর দুশমন আবু জাহেলকে তরুণ বয়সে হত্যা করেন। খায়বার বিজয়ী বীর সেনানি শেরে খোদা
হজরত আলী (রা.) তরুণ বয়সে কামুছ দুর্গের লৌহকপাট উপড়িয়ে ফেলে এক মুষ্টিতে নিয়ে এটিকে যুদ্ধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। মুতার যুদ্ধে সেনাপতি ছিলেন হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ, তিনিও ছিলেন তরুণ। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হজরত বেলাল (রা.) ছিলেন তরুণ।
হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে নমরুদের তৈরিকৃত আগুনে নিক্ষিপ্ত হন তখন তিনি ছিলেন তরুণ। হজরত ইউসুফ (আ.) যখন কারাগারে ছিলেন তখন তিনি তরুণ ছিলেন। হজরত ইউনুস (আ.) কে যখন সমুদ্রের মাছ গিলে ফেলে তখন তিনি ছিলেন তরুণ।
হজরত দাউদ (আ.) যখন জালিম শাসক জালুতকে হত্যা করেন তখন তিনিও ছিলেন তরুণ। এমনকি মাত্র সতেরো বছর বয়সের তরুণ মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতবর্ষে ইসলামের পতাকা সমুন্নত করেছিলেন।
এ ধরনের আরও অসংখ্য উপমা পেশ করা যাবে। সবগুলোর পেছনে আছে তরুণদের বলিষ্ঠ ভূমিকা। এখনও তরুণরাই ইসলাম, রাসূল, দেশ ও জাতির মুক্তির জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তরুণদের পদচারণায় আজ মুখরিত। বিশ্বে চলছে তরুণদের জয়জয়কার।