ফরাসি বিপ্লবের পটভূমিতে প্যারিস ও লন্ডন শহর নিয়ে চার্লস ডিকেন্স লিখেছিলেন আ টেল অব টু সিটিজ উপন্যাস। এখন প্রয়োজন তাঁর মতো একজন লেখকের, যিনি লিখবেন আ টেল অব টু প্রেসিডেন্টস, অর্থাৎ দুই প্রেসিডেন্টের গল্প। তাঁদের একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি নিজের সৃষ্ট এক ‘বিকল্প জগতে’ বাস করছেন। অন্যজন জো বাইডেন, যিনি ট্রাম্পের সম্পূর্ণ বিপরীত একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে ক্রমে প্রমাণ করছেন। এই দুজনের তফাত প্রতিদিন নানাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবারের কথাই ধরুন। এদিন ২৪ ঘণ্টায় করোনা সংক্রমণে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন হাজারে দাঁড়ায়। প্রায় প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন আমেরিকানের মৃত্যু। ট্রাম্পের মাথায় এ নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি ফের জোর দিয়ে জানালেন, নির্বাচনে তিনিই জিতেছেন। পত্রপত্রিকা থেকে আদালত—সবার প্রতি তাঁর ক্ষোভ। এমনকি অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বারের ওপরও তাঁর কোনো আস্থা নেই।
এক দিন আগে সব ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নস্যাৎ করে উইলিয়াম বার জানিয়েছিলেন, কারচুপির এমন কোনো প্রমাণ তিনি পাননি, যার ফলে নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে যাবে। বারের কথায় ট্রাম্প যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়েছেন। কানাঘুষা হচ্ছে, তিনি উইলিয়াম বারকে পদচ্যুত করতে পারেন। এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নে গম্ভীর মুখে প্রেসিডেন্ট বললেন, কয়েক সপ্তাহ পরে এ প্রশ্নের উত্তর পাবেন।
ট্রাম্পের মুখ গম্ভীর হওয়ার অবশ্য যুক্তিপূর্ণ কারণ রয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশের তিন-তিনটি আদালত থেকে তাঁর আইনজীবীরা বিফল মনোরথে ‘প্যাভিলিয়নে ফিরে গেছেন’। এদিন উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ট্রাম্পের এক মামলা আমলে নিতে অস্বীকার করেন। আদালতের যুক্তি, সর্বোচ্চ আদালতে আসার আগে ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের উচিত নিম্ন আদালতের মতামত শোনা।
অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের এক আদালত রিপাবলিকান নেতৃত্বের আনা অভিযোগ সওয়াল-জবাবের পর খারিজ করে দেন। আদালতের অভিযোগ ছিল, ব্যালটে অনিয়ম হয়েছে। আদালতের নির্দেশে মোট ১ হাজার ৬২৬টি ব্যালট নতুন করে পরীক্ষার পর দেখা গেল ‘ভুল’ ব্যালটের সংখ্যা মাত্র ৯টি। একই দিন পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট ডাক-ভোট বাতিলের প্রশ্নে আরেক মামলা বাতিলের দাবি আক্ষরিক অর্থে একবাক্যে নাকচ করে দেন।
ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাইডেন
অন্যদিকে জো বাইডেন ও তাঁর নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস গত বৃহস্পতিবার কাটান ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়ে। কোভিড-১৯ বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে। এ ব্যাপারে বাইডেন দেশের প্রধান সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসির সঙ্গে কথা বলেন। ৪৭ দিন পরে অভিষেক অনুষ্ঠান, তার প্রস্তুতি নিয়ে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকও করেন বাইডেন–হ্যারিস। মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ চলছে, সে ব্যাপারেও তাঁরা দুজন বিভিন্ন দল ও মতের সঙ্গে সলাপরামর্শ সারেন।
ট্রাম্প জালিয়াতির অভিযোগে যত তর্জন–গর্জন করছেন, ততই ধীরস্থিরভাবে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন বাইডেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর মন্ত্রিসভা আমেরিকার মতোই হবে, অর্থাৎ এতে সাদা-কালো-বাদামি মানুষ সবাই থাকবে। ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভার যে আটজনের নাম তিনি ঘোষণা করেছেন, তার পাঁচজন অশ্বেতকায় ও তিনজন শ্বেতকায়। তাঁদের পাঁচজন নারী, তিনজন পুরুষ। প্রায় সবাই যাঁর যাঁর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, অনেকে হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন অথবা বারাক ওবামা প্রশাসনের সদস্য ছিলেন।
পক্ষান্তরে ট্রাম্প প্রশাসন ছিল শ্বেতকায়, অতি ধনী। নারীদের অংশগ্রহণও ছিল অনেক কম। মার্কিন সাময়িকী পলিটিকোর ভাষায়, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার ৮৭ শতাংশই ছিলেন তাঁর মতো সাদা ও ধনকুবের।
বৃহস্পতিবার বাইডেন ও হ্যারিস আরও একটি কাজ করেন। ট্রাম্পের তুলনায় তাঁরা কতটা কীভাবে ভিন্ন, সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সে কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। গত ৯ মাস ট্রাম্প শুধু যে করোনাভাইরাসের হুমকি খাটো করে দেখেছেন তা-ই নয়, মাস্ক পরার ব্যাপারেও হাসিঠাট্টা করেছেন। তাঁর কথার প্রতিবাদ করায় তিনি ড. ফাউসির বুদ্ধিশুদ্ধি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বাইডেন জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁদের প্রথম কাজই হবে প্রথম ১০০ দিনের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরার বিধান জারি করা।
ড. ফাউসিকে বাইডেন করোনাভাইরাস টাস্কফোর্সের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করতে চান, এই প্রশ্নে তাঁদের কথা হয়ে গেছে বলে তিনি জানান। বাইডেন এ কথাও জানান, যে টিকা আসছে তা যে নিরাপদ, সে ব্যাপারে দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করতে তিনি নিজে তা গ্রহণ করবেন।
‘দুই জগতের বাসিন্দা’
ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, সিএনএনের সাক্ষাৎকারে আরও একটি ক্ষেত্রে তা স্পষ্ট হয়। বাইডেন বলেন, তিনি কিছুতেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন না। এমনকি ট্রাম্পের বিচার প্রশ্নেও তিনি কোনো রকম নাক গলাবেন না। বাইডেন বলেন, ‘এটা আমার ব্যক্তিগত বিচার বিভাগ নয়, এটা জনগণের বিচার বিভাগ।’
বলাই বাহুল্য, ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প বিচার বিভাগকে তাঁর ব্যক্তিগত পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। যাঁরা বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের ক্ষমতা থেকে বহিষ্কারে ইতস্তত করেননি। এফবিআইয়ের প্রধান জেমস কোমিকে পদচ্যুত করেছিলেন শুধু এই কারণে যে কোমিকে তাঁর প্রতি যথেষ্ট অনুগত মনে হয়নি। প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্সকেও একই কারণে পদচ্যুত করেছিলেন। বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বারের ভাগ্যেও হয়তো একই ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।
মানুষ হিসেবে ট্রাম্প ও বাইডেন কতটা আলাদা, সিএনএনের এই সাক্ষাৎকারে সে কথা আরও একবার ধরা পড়ে। বুধবার এক ভিডিও ভাষণে ট্রাম্প শুধু যে নিজের বিজয়ের ব্যাপারে আস্থা ব্যক্ত করেন তা-ই নয়, পুরো মার্কিন নির্বাচনব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দেশের গণতন্ত্রের ওপর প্রবল হুমকি এসেছে এ দাবি করে ট্রাম্প বলেন, সবাই এ ষড়যন্ত্রে জড়িত। এমনকি বিচার বিভাগ ও এফবিআই-ও এর সঙ্গে জড়িত।
ট্রাম্প বলেন, ‘এটি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ, কারণ আমি আমেরিকার গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়াই করছি।’ এই ভাষণ এতটা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যে পূর্ণ ছিল যে সিএনএন এই ভাষণ প্রচারে অসম্মত হয়। টুইটার ও ফেসবুক তা প্রচার করলেও বিশেষ সম্পাদকীয় মন্তব্যে জানায়, ভাষণটি ‘বিতর্কিত’।
অন্যদিকে বাইডেন-হ্যারিসের সাক্ষাৎকারটি ছিল ধীরস্থির ও সুচিন্তিত উত্তরে পূর্ণ। সিএনএনের জেইক ট্যাপার, যিনি সাক্ষাৎকারটি নেন, মন্তব্য করেন, বাইডেন বা হ্যারিস কেউ একবারের জন্য সংবাদমাধ্যমকে ‘গণশত্রু’ অভিহিত করেননি, অথবা তাদের ‘ফেক নিউজ’ বলে বিষোদ্গার করেননি। জেইক ট্যাপারের কথায়, হোয়াইট হাউসের বর্তমান ও পরবর্তী বাসিন্দার মধ্যে বিস্তর তফাত, ‘মনে হয় তাঁরা দুই জগতের বাসিন্দা।’
শোনা যাচ্ছে ট্রাম্প ২০ জানুয়ারি বাইডেন-হ্যারিসের অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না। সেদিন হয়তো তিনি ২০২৪ সালে পুনর্নির্বাচনের জন্য নিজের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করবেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বাইডেন জানান, তাঁর জন্য নয়, দেশের স্বার্থে ট্রাম্পের উচিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা। ইতিমধ্যে যে বিভক্তি ও তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে, একে অপরের সঙ্গে করমর্দনের মাধ্যমে তা অবসান সম্ভব। এটা দেশকে সামনে এগোতে সাহায্য করবে।
এ মুহূর্তে ট্রাম্প দেশের কথা নয়, নিজের কথাই ভাবছেন। নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ও আইনি লড়াইয়ে নেমে তিনি শুধু নিজের অনুগত সমর্থকদের খেপিয়ে তুলেছেন তা-ই নয়, নিজের পকেটে দেদার চাঁদা ঢোকাতেও সক্ষম হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে চাঁদা উঠেছে ১৯৫ মিলিয়ন ডলার! যেহেতু দেদার অর্থ উঠছে, সে কারণে নিজের রণকৌশল পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন তিনি দেখছেন না। ২০২৪ সালে তিনি বা তাঁর সন্তানদের কেউ প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে শুধু অর্থ নয়, এসব অনুগত সমর্থকেরও প্রয়োজন পড়বে।