দোয়া বা জিকির মোমিনের কাছে একটি বড় ভরসা ও সান্ত্বনার জায়গা। দোয়া ও জিকির বলতে সাধারণভাবে নিজের মনের বৈধ কামনা-বাসনা, আকাক্সক্ষা আল্লাহর কাছে পেশ করা, আল্লাহর মঞ্জুরি চাওয়া। জীবন ও জগতের সব বিষয়ই এর মধ্যে আসতে পারে বা আসে। দোয়া মানেই হচ্ছেÑ ডাকা, পারিভাষিকভাবে আল্লাহকে স্মরণ করা, আল্লাহর কাছে চাওয়া। আল কুরআন ও হাদিস উভয় জায়গায়ই দোয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ আছে; উল্লেখ আছে জিকিরের কথা। সুন্নতে নববীতেও আমরা বিষয়টির প্রতিফলন দেখতে পাই। প্রিয় নবী সা:-এর জিহ্বা যেমন সর্বদাই দোয়ায় সিক্ত থাকত, তেমনি তাঁর হৃদয়ে সর্বদা জারি থাকত আল্লাহর জিকির বা স্মরণ। উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে, খেতে-পরতে, শয়নে-স্বপনে, সকাল-সন্ধ্যায়Ñ এককথায় প্রতিটি কাজেই আমরা তাঁকে দেখি দোয়ায় নিমগ্ন; প্রতিটি মুহূর্তে দোয়ায় সমর্পিত। কী এক অসাধারণ ও অনুপম দৃষ্টান্ত প্রিয় নবী সা:-এর জীবন!
তবে দোয়া বা চাওয়ার সাথে জিকির বা স্মরণের সংযোগ থাকতে হবে, এটা দোয়া কবুলের একটা শর্ত। কেননা, আত্মবিস্মৃত (অনংবহঃ সরহফবফ) দোয়া আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। আমি কার কাছে চাইলাম, কী চাইলাম, কেনই বা চাইলাম, যার কাছে চাইলাম তিনি কেÑ এ বিষয়গুলো স্মরণে বা অনুভূতিতে না থাকলে দোয়া শুধু মুখের বা জিহ্বার ব্যায়ামে পরিণত হয়। সুতরাং দোয়ার সাথে হৃদয়ের সংস্পর্শ তথা অন্তরের সংযোগ থাকতে হয়। তাহলেই দোয়া হয়ে ওঠে মোমিনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
আমল শব্দটি হচ্ছেÑ কাজ, কর্ম, কোনো কিছু অর্জনে বা বর্জনে সড়াবসবহঃ বা নড়াচড়া, চেষ্টা করা ইত্যাদি। এখানে উপকরণের একটি বিষয়ও থাকে। আমাদের সমাজে অবশ্য একটি ভুল ধারণা আছেÑ দোয়া বা জিকিরকেই আমল মনে করা হয়। অর্থাৎ কাজ না করাকেই কাজ বলা হয়। কিন্তু আমলের সাথে বাস্তব কাজের সম্পর্ক থাকতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো, দোয়া ও আমলের মধ্যে সমন্বয় কিভাবে করতে হবে? সূরা জুমায় আল্লাহ তায়ালা সুন্দর করে বলেছেন, ‘যখন নামাজ শেষ হয়ে যায়, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। আশা করা যায়, তোমরা সফল হবে।’ এখানে কিন্তু চমৎকার একটি সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। একদিকে আল্লাহর অনুগ্রহ তথা হালাল জীবিকার সন্ধানে জমিনে ছড়িয়ে পড়তে বলেছেন, মসজিদে বা নামাজের মুসলায় বসে থাকতে বলেননি; তদ্রƒপ জমিনে নিজের শ্রম ও মেধা নিয়োগ করার সময় আল্লাহর স্মরণ বা জিকির তথা আল্লাহর মঞ্জুরির আবেদনও করতে বলেছেন।
আমরা অনেক সময় বাস্তব কাজ বাদ রেখে দোয়ার মাধ্যমে আমাদের কাক্সিক্ষত জিনিস অর্জন করতে চেষ্টা করি এটি যেমন ভুল; তেমনি শুধু কার্যকারণ বা বস্তুগত উপায়-উপকরণ কাজে লাগিয়েই সব অর্জন করা যায় এটিও ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকে বলেন, ‘মোল্লারা শুধু ইসলাম বলতে এই কালেমা, অমুক দোয়া এতবার পড়Ñ এমন নসিহত করেন, কাজের কথা কিছুই বলেন না। আসলে বাস্তব কাজকে কেউই উপেক্ষা করে না। কেননা, কার্যকারণের (ঈধঁংব ধহফ বভভবপঃ) ক্ষমতা বা ফলাফল আমরা চোখের সামনেই দেখি। কিন্তু দোয়া বা জিকিরের ফলাফল প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায় না বলে আমরা বিস্মৃত হই, যে কারণে ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে তাকিদ বেশি দিয়েছেন। এ দুটো বিষয়ের সমন্বয়ই মোমিনের জীবন। কাজেই দোয়ার বিষয়ে তাচ্ছিল্য করা যাবে নাÑ যেমন তাচ্ছিল্য করা যাবে না কর্মকৌশল ও বাস্তব কাজের প্রয়োজন।