দ্বীনের প্রচার এবং প্রসারের ক্ষেত্রে ইসলামী দাওয়াত দানের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্যেক নবী রাসূলই দ্বীনের দায়ী হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন। আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:-ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। সূরা আহযাবের ৪৪ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর পথে দাওয়াত দানকারী হিসেবে ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।’
আর অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা:-কে দাওয়াত দানের নির্দেশ প্রদান করেছেন। ‘তুমি তোমার পালনকর্তার দিকে (মানুষকে) আহ্বান করো। আর তুমি অবশ্যই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।’ (সূরা কাসাস-৮৭)
রাসূলে পাক সা: যত দিন পৃথিবীতে ছিলেন তত দিন তিনি দ্বীনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন। এরপর যখন দ্বীন পরিপূর্ণতা লাভ করার ফলে রাসূল সা:-এর ওফাত ঘটে তখন এ দায়িত্ব সাহাবায়ে কেরাম রা: পালন করতে থাকেন। সাহাবায়ে কেরাম রা: যখন একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন তখন এ দায়িত্ব পালন করেছেন তাবেয়িনগণ। তাবেয়িনগণের পর তাবে-তাবেয়িনগণ। দায়িত্ব পালন করতে করতে ইসলাম আজ এ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। আর এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, ‘বলুন, এটাই আমার পথ, আমি জেনে-বুঝে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকি, আমি এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারা। আর আল্লাহ্ কতই না পবিত্র এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ (সূরা ইউসূফ, আয়াত : ১০৮)
আমভাবে সব মুসলমান এবং খাসভাবে আলেম সমাজকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে; আর তারাই সফলকাম।’ (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১০৪)
রাসূল সা: বলেন: ‘আমার কাছ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছিয়ে দাও।’ (সহিহ বুখারি : ৩৪৬১)
তবে দ্বীনের দাওয়াত দানের ক্ষেত্রে দায়ীদের ইলম, আমল, ধৈর্য, সহনশীলতা, কোমলতা, দয়া, জান-মালের ত্যাগ, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও মানুষের আচার-অভ্যাস সম্পর্কে অবগতি ইত্যাদি সর্বোপরি হিকমাত তথা প্রজ্ঞার সাথে দাওয়াত দেয়া আবশ্যক। কেননা এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা নাহলের ১২৫ নাম্বার আয়াতে বলেছেন, ‘আপনি মানুষকে দাওয়াত দিন আপনার রবের পথে হিকমাত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে তর্ক করবেন উত্তম পন্থায়। নিশ্চয় আপনার রব, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়েছে, সে সম্বন্ধে তিনি বেশি জানেন এবং কারা সৎপথে আছে তাও তিনি ভালোভাবেই জানেন।’
আর যারা এই হিকমাত তথা প্রজ্ঞার সাথে মানুষদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করে তারাই সর্বোত্তম কথা বলে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তার কথার চেয়ে আর কার উত্তম হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, নেক আমল করে এবং সে বলে, আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা হা-মীম আস-সিজদা : ৩৩)
আর যারা এই উত্তম কথাগুলো বলে থাকে আল্লাহ তায়ালা তাদের সর্বোত্তম জাতি বলে অভিহিত করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেন- ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে, অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে।’ (সূরা আল ইমরান, আয়াত : ১১০)
সর্বোপরি সর্বোত্তম জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অর্জিত জ্ঞান সমাজের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে যারা যে দিকে পারদর্শী তাদের সেদিকটাতেও পদচারণা করা উচিত। অর্থাৎ যারা বক্তৃতা দিতে পারদর্শী তারা সমাজের মানুষদের কাছে বক্তব্যের মাধ্যমে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেবে। যারা লেখালেখি করতে পারদর্শী তারা লেখালেখির মাধ্যমে ইসলামের বাণী জাতির সামনে তুলে ধরবে। যারা কাজের মধ্যে পারদর্শী তারা সমাজ সংস্কারের বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ মানুষের সামনে উপস্থাপন করবে। এভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে জাতির সামনে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়া আলেমদের ঈমানি দায়িত্ব।