সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন

দ্রব্যমূল্য টুঁটি চেপে ধরেছে

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২০
  • ৫৩ জন নিউজটি পড়েছেন

লাগামহীন বাজারে দিশাহারা হয়ে পড়েছে মানুষ। সপ্তাহ পেরোলেই বাজারে নতুন করে বাড়ছে কোনো না কোনো পণ্যের দাম। মাস পেরিয়ে সেই সব পণ্যের দাম একপ্রকার টুঁটি চেপে ধরছে ক্রেতা-ভোক্তার। কিছু পণ্যের দাম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ।

দাম বাড়ার এই তালিকায় চাল-ডাল যেমন রয়েছে, তেমনি আলু-পটোলসহ প্রায় সব ধরনের সবজিও রয়েছে। বাদ যায়নি পেঁয়াজ, মরিচসহ মসলাজাতীয় পণ্যও। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে ও তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, দেশে বন্যা দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবার আবাদ প্রায় এক মাস পিছিয়েছে। আগের বছর কিছু পণ্যের উৎপাদনও কিছুটা কম ছিল। ফলে মৌসুম শেষে এর সুযোগ নিয়েছেন মজুদকারী মাধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা। তাঁদের কাছে মজুদ থাকা পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন ইচ্ছামতো। করোনার লকডাউনের পর জুনের শুরু থেকে পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকলে প্রথম দিকে একটি-দুটি পণ্যের দাম এমন লাগামহীনভাবে বেড়েছিল। কিন্তু সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এখন প্রায় সব পণ্যের ব্যবসায়ীরাই এই পথ ধরেছেন। ফলে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও চাল, পেঁয়াজ, আলু ইত্যাদি পণ্যের দাম বেড়েছে লাগামহীন। এতে বিপাকে পড়েছে করোনা পরিস্থিতিতে আয় কমে যাওয়া সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে দ্রব্যমূল্যের এমন ঊর্ধ্বগতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ওপর। মানুষের এমন দুর্ভোগেও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেই সরকারের—এমন অভিযোগ ক্রেতা-ভোক্তাদের।

গত এক মাসে মোটা চালের দাম বেড়েছে কেজিতে পাঁচ টাকা। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, মাসখানেক আগেও মোটা চাল ৪০ থেকে ৪৮ টাকায় পাওয়া যেত। গতকাল সোমবার বাজার ঘুরে দেখা যায়, সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫২ টাকা কেজি। অর্থাৎ যে পরিবারে দৈনিক এক কেজি চাল প্রয়োজন হয়, প্রতিদিন তাদের শুধু চালেই খরচ বেড়েছে পাঁচ টাকা। বেড়েছে চিকন চালের দামও। ৫৪ থেকে ৬০ টাকার চাল এখন ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা কেজি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য বলছে, দৈনিক খাদ্যের জন্য মাথাপিছু ৬০ টাকা খরচ করতে পারে এ দেশের মানুষ। এই টাকায়ই তিন বেলার খাবারের জন্য চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ ও অন্যান্য মসলার সঙ্গে কিনতে হয় সবজিও।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী দেশের প্রতিজন মানুষ প্রতিদিন খায় প্রায় ৪০০ গ্রাম চাল। সেই হিসাবে দুজন মানুষের চাল লাগে ৮০০ গ্রাম। বর্তমান গড় বাজারমূল্য ৫৫ টাকা ধরে ৮০০ গ্রামের দাম পড়ে ৪৪ টাকা। দুজনের খরচ করতে পারা ১২০ টাকার মধ্যে বাকি থাকে ৭৬ টাকা। মানিকনগর বাজারের ক্রেতা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শেখ ফরিদুলের প্রশ্ন, এই বাজারে কী করে এই টাকায় বাকি সব কেনা সম্ভব। ফলে মানুষকে এখন অনেকটা না খেয়েই থাকতে হচ্ছে বলে তাঁর মন্তব্য।

খরচ বেড়েছে অন্যান্য পণ্যেরও। গত এক মাসে ভোজ্য তেল সয়াবিনের দাম বেড়েছে লিটারে ৯ টাকা। ৮৪ টাকা লিটারের খোলা সয়াবিন এখন ৯৩ থেকে ৯৫ টাকা। মাসখানেক আগে পাম তেল (লুজ) ৭০ থেকে ৭৩ টাকায় বিক্রি হলেও এখন ৮০ থেকে ৮৬ টাকা লিটার। মসুর ডালে বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা।

গত এক মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় দেশি পেঁয়াজ পাওয়া যেত। এখন লাগছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা। বাজারে চীনা আদা এখন ২৫০ টাকা কেজি। মাসখানেক আগে ১৬০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত।

বাজার বিশ্লেষণ ও ক্রেতাদের বক্তব্য থেকে দেখা যায়, বাজারে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকলে পণ্যের দাম এমন লাগামহীন হতো না। ক্রেতারা বলছে, দেশে চাল ও পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে—এই তথ্য খোদ সরকারি সংস্থাগুলোর। অথচ বন্যার কারণে নতুন মৌসুমের ধান ওঠার আগেই চালের দাম বাজারে অস্বাভাবিক বেড়েছে। আমদানিসহ নানা ভয়ভীতি দেখিয়েও চালের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি সরকার। একই অবস্থা হয়েছে পেঁয়াজেও। বেশির ভাগ নিজেদের উৎপাদন হলেও এবং পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও শুধু ভারত বন্ধ করে দিয়েছে—এই খবরেই রাতারাতি পেঁয়াজের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এক মাস পার হলেও দাম নাগালে আনতে পারেনি সরকার। এভাবেই বেড়েছে আলুর দামও।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, ৪০ লাখ টন মজুদ আলুর মধ্যে এখনো ১৮ লাখ টন আলু রয়েছে। দেশে আলুর ঘাটতি নেই। এর পরও দফায় দফায় দাম বেড়ে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ক্রেতাদের বড় প্রশ্ন—বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকলে এমন ঘটনা কী করে ঘটে?

বাজারে সবজির দামে এখন নিম্ন ও মাধ্যবিত্ত তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তরাও চাপে পড়েছে। লাগামহীন দাম বেড়েছে সব ধরনের সবজির। বাজারে শিম, উচ্ছে, টমেটোসহ পাঁচ থেকে সাত ধরনের সবজির দাম শতকের ঘরের ওপরে রয়েছে। মাসখানেক আগেও খুচরা বাজারগুলোতে সবজির দাম গড়ে ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে ছিল। গতকালের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০ টাকা বেড়ে এখন তা ৮০ থেকে ১০০ টাকায় উঠেছে। বাজারগুলোতে সাধারণ মানের বেগুনের কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা হলেও ভালো মানের বেগুন কিনতে লাগছে ১৪০ টাকা পর্যন্ত, হাউব্রিড করলা ৯০ টাকার মধ্যে থাকলেও উচ্ছে কিনতে হচ্ছে ১১০ টাকা কেজি পর্যন্ত দামে।

মাসের ব্যবধানে বাজারে আলুর দামও বেড়েছে কেজিতে ১২ থেকে ১৫ টাকা। ৩৮ থেকে ৪০ টাকার আলু এখন ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে পণ্যটির দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ।

তবে এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোন্তাকিম আশরাফ বলেন, সাময়িক আলুর বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেও দু-এক দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। সরবরাহ বাড়ানোর জন্য শিগগিরই স্টোরেজে থাকা মজুদ আলু বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কাঁচা মরিচের ঝাল বেড়েছে মাস দুয়েক আগে থেকেই। তবে বাড়তে বাড়তে এখন তা লাগামছাড়া। কোনো কোনো দিন খুচরা বাজারগুলোতে কাঁচা মরিচের কেজি ৩০০ টাকায় উঠে যাচ্ছে। যদিও গতকাল ২৫০ গ্রাম মরিচের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা চাইলেন বিক্রেতারা। সে হিসাবে কেজি ২৪০ টাকা। মুগদা বাজারের সবজি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, সবজির দাম বেড়েছে সরবরাহ কম থাকায়। বাজারে এখন বেশির ভাগ মরিচ ভারত থেকে আমদানি হয়ে আসছে। ফলে যেদিন আমদানি ভালো হয় সেদিন দাম কিছুটা কম থাকে।

ভোমরা স্থলবন্দরের তথ্য বলছে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচা মরিচ আমদানি বেড়েছে ৪০ গুণেরও বেশি। আমদানি হয়েছে ১৪ হাজার ২৬৬ টন। এর মধ্যে জুলাইয়ে পাঁচ হাজার ১৩০ টন, আগস্টে চার হাজার ৬৪ টন এবং সেপ্টেম্বরে পাঁচ হাজার ৭২ টন আমদানি হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এই বন্দর দিয়ে কাঁচা মরিচ আমদানি হয়েছিল ৩৮৩ টন।

এর বাইরে আমিষের চাহিদা পূরণে এখন ব্রয়লার মুরগিই ভরসা। কারণ গরুর মাংসের দাম আগে থেকেই বাড়তি। করোনার আগে ৫০০ থেকে ৫২৫ টাকায় মাংস পাওয়া গেলেও এখন ৫৫০ থেকে ৫৮০ টাকা কেজি। তার ওপর ডিমের দাম গত এক মাসে ডজনে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English