বরিশালের আগৈলঝাড়ায় যুবলীগ নেতা আবু সাঈদের হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বিপুল হাজারীর দাদা ও ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অবনী সরকার বাদী হয়ে অবশেষে শনিবার রাতে আগৈলঝাড়া থানায় আবু সাঈদসহ তাঁর ৪ সহযোগীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছে, মামলা নং-৩ (৭.৮.২১)।
মামলার সত্যতা স্বীকার করে থানা পরিদর্শক মোঃ গোলাম ছরোয়ার জানান, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আলী হোসেন আসামীদের গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে শনিবার রাত থেকেই অভিযান অব্যাহত রেখেছে। রত্নপুর ইউনিয়নের থানেশ্বরকাঠী গ্রামের মৃত শাহজাহান হাওলাদারের ছেলে আবু সাঈদ ও তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে শনিবার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। থানেশ্বরকাঠী গ্রামে আবু সাঈদের হাতে জিম্মি ২শতাধিক পরিবারের শিশু ও নারী পুরুষ সদস্যরা সাঈদ ও তাঁর বাহিনীর সদস্যদের নির্যাতনের বর্নণা দিয়ে তার বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পেতে সাংবাদিকদের কাছে বিভিন্ন আইন শৃংখলা বাহিনীর মাধ্যমে সরকারের কাছে স্বাভাবিকভাবে বসবাসের করুন আর্তি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে তথ্য অনুসন্ধানে রোববার বিকেলে উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা থানেশ্বরকাঠী গ্রামে পৌঁছলে ওই গ্রামের নির্যাতিত নারী-পুরুষ, শিশু বৃদ্ধরা একত্রিত হয়ে অভিযোগে জানান, “সাঈদের নির্যাতনের হাত থেকে হয় আমাদের বাঁচান, না হয় অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিন”। আমরা আর মাদকাসক্ত সন্ত্রাসী আবু সাঈদের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে চাই না। তাদের বর্নণায় সাঈদের হাত থেকে রেহাই পায় না গ্রামের কোন লোক। কারনে-অকারণে, যখন-তখন তাঁর হামলার শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
স্থানীয় মৎস্যজীবি দীপংকর হালদারের বাড়িতে জড়ো হন সাঈদের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়া শতাধিক নারী পুরুষেরা। সাংবাদিকদের সাথে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা ফরহাদ তালুকদার, রত্নপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর আশ্রাফ আলীর উপস্থিতিতে ওই বাড়ির দীপংকর হালদার (৩২), মঞ্জু জয়ধর (৫৪), বিধবা জীবনী মল্লিক (৫০), গৃহবধূ রসনা সরকার (২৫), সরিকা মল্লিক (৫০), দুলি রানী হালদার (৪৮), সত্য রঞ্জন হালদার (৬৫), চা দোকানী অনীল হালদার (৩০), বুদ্ধিশ্বর সরকার (৬৪), ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মোঃ নুর ইসলাম চৌধুরী (৫২), মামলার বাদী ও ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অবনী সরকারসহ (৫৭) গ্রামের ভুক্তভোগী শতাধিক নারী, পুরুষ ও বয়োবৃদ্ধরা আবু সাঈদ ও তার বাহিনীর সদস্যদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনের বর্ননা দেয়ার পাশাপাশি তাদের মতো মোহনকাঠী গ্রামের হিন্দু পাড়ার ৩শতাধিক পরিবারসহ মোট ৫শতাধিক জিম্মি পরিবাররের করুন কাহিনী বর্নণা করেন।
সাঈদের নির্যাতন ও মাদক ব্যবসার কারণে তার স্ত্রী ৫/৬ বছর আগে দুটি সন্তান নিয়ে তাঁর থেকে আলাদা ভাবে বসবাস করছেন। গ্রামের হিন্দু নারী-পুরুষেরা অভিযোগে বলেন, আবু সাঈদ এহেন কাজ নেই যা সে করে না। স্কুল কলেজে যাতায়াতের পথে ছাত্র-ছাত্রীদের পথ রোধ করে তাঁর কথা শুনতে বাধ্য করে। না শুনলে তাকে মারধর করা হয়। উজিরপুরের ভবানীপুর থেকে কয়েক বছর আগে এই গ্রামে নতুন বাড়ি করে বসবাস করা মৃত ফজলুল করিমের ছেলে ভ্যান চালক শাহ আলম তালুকদারের বাড়িতে বসে চলে সাঈদ ও তাঁর লোকজনের মাদক সেবনের আসর। সাইদ যুবলীগ করলেও তার সাঙ্গ পাঙ্গরা সবাই বিএনপি’র সমর্থক। গ্রামবাসীদের মধ্যে যারাই সাঈদের মাদক সেবন, বিক্রিসহ নেতিবাচক কাজের প্রতিবাদ করেছে তারাই তাঁর হামলার শিকার হয়েছে।
৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মোঃ নুর ইসলাম চৌধুরী অভিযোগে বলেন, গ্রামের সবাই আবু সাঈদের হাতে জিম্মি। তিনি নিজেও তাঁর হাত থেকে রেহাই পাননি। তাকেও শনিবার বিপুলকে কোপানোর আগে পা কেটে নেয়ার হুমকি দিয়েছে আবু সাঈদ। শিশু থেকে ছাত্র এমনকি ৬০/৭০ বছর বয়সী গ্রামের সবাই তাঁর হামলার শিকার হয়েছেন জানিয়ে সাঈদের হাত থেকে এলাকার জিম্মি নারী পুরুষকে মুক্ত করতে আইন শৃংখলা বাহিনীর প্রতি আহবান জানান তিনি।
সাধারণ সম্পাদক অবনীও হয়েছেন হামলার শিকার। এর আগে শনিবার দুপুরে ইজিবাইক চালক মোহনকাঠী গ্রামের বিনোদ বিশ্বাসের ছেলে বিপুল বিশ্বাসকে (৩০) রোগী নিয়ে যাবার সময়ে তাঁর গতিরোধ করে দা দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেছে সাঈদ। ছিনিয়ে নেয়া হয় তাঁর সাথে থাকা নগদ অর্থ ও ইজিবাইক। গত বৃহস্পতিবার (৫আগষ্ট) অকারণে থানেশ্বরকাঠী গ্রামের সুশান্ত বৈদ্যর উপর হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে সাঈদ। বিপুল ও সুশান্ত বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছে।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত সাঈদ জানান, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারনে আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে ফাঁসাতে চাচ্ছে একটি পক্ষ। এর আগে গত দুই মাস পূর্বে আমি উল্টো হামলার শিকার হয়েছি তাঁদের হাতে।
ইউনয়ন আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক মীর আশ্রাফ আলী বলেন, আবু সাইদ একজন মাদকাসক্ত। সে যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
থানা পরিদর্শক মোঃ গালাম ছরোয়ার জানান, সাইদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তাকে ও তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সাঈদকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের কথাও জানিয়েছেন তিনি।